স্পেনের কাতালোনিয়া নামক প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতা চাচ্ছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেখানে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার ফলাফল কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে। তবে কি স্পেন থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে কাতালোনিয়া? কাতালোনিয়া কি পত্তনের লগ্ন থেকেই স্পেনের হিস্যা? স্পেনের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় সেখানেই কেন বিচ্ছিন্নতাবাদী জাতীয়তাবাদ এতটা প্রবল? জগতসেরা ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনারই বা কী হতে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতেই আজকের এ লেখা।

কাতালোনিয়ার পরাধীনতা- স্বাধীনতা ও একটি রোলার কোস্টার যাত্রা

৮ম শতকে ইবেরিয়ান উপসাগরীয় পাইরিনেস উপত্যকার গোথিয়া ও হিস্পানিক অংশের সমস্ত অঞ্চল নিয়ে ফ্রান্স সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এসব অঞ্চলে মুসলিম শাসকদের আগ্রাসন ঠেকাতেই পুরো জনপদ এক হয়েছিল একই ছাতার নিচে। পূর্ব পাইরিনেসের মিলিত অংশটিকে বলা হতো কাউন্ট অব বার্সেলোনা, পরবর্তীতে কাতালোনিয়া। প্রাচীন কাতালোনিয়া ভূখণ্ডের রাজনৈতিক নাম ছিল ‘প্রিন্সিপালিটি অব কাতালোনিয়া’। এর প্রধান চারটি দ্বীপ– বার্সেলোনা, গিরোনা, অসোনা ও আর্জেল। দ্বিতীয় বোরেল ছিলেন এ অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি। অলিখিত এই অধিপতি ফরাসি রাজা হিউ কপের অধীনস্থ ছিলেন, সে হিসেবে কাতালোনিয়া ছিল ফরাসি-রাজের উপনিবেশ। ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বোরেল ফরাসি-রাজ থেকে কাতালোনিয়াকে নিয়ে সদর্পে বেরিয়ে আসেন।

প্রিন্সিপালিটি অব কাতালোনিয়ার মানচিত্র; source: theculturetrip.com

১১৫০ সালে “কাউন্ট অব বার্সেলোনা” উপাধিধারী কাতালোনিয়া অধিপতি র‍্যামন বেরেনগুয়ের এবং পার্শ্ববর্তী জলদস্যু অধ্যুষিত শক্তিশালী অ্যারাগন দ্বীপের রাণী পেট্রোনিলিয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গঠন করেন নয়া মিলিত সাম্রাজ্য।

১৬৪১ সালের ১৭ জানুয়ারি কাতালান বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তৎকালীন আঞ্চলিক কর্তা পাউ ক্লারিস কাতালোনিয়াকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র (একই সাথে ফ্রান্সের একটি করদ রাজ্য) হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু এ ঘটনায় স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপ ভীষণ চটে গেলেন। রাগের বশে তড়িঘড়ি করে একদল সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন কাতালোনিয়া আক্রমণ করতে। কিন্তু তিনি ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইসের ভয়ে সৈন্যদল নিয়ে পিছু হটলেন এবং আত্মরক্ষার্থে স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে পুরোপুরি ফরাসি-রাজের কাছে সঁপে দেন। অতঃপর রাজা পঞ্চদশ লুইসকেই বার্সেলোনার অধিশ্বর ঘোষণা দেন। আবার ১৭১২ সালে ব্রিটিশ রাজের অধিভুক্ত করার শোর উঠেছিল কাতালোনিয়ায়।

যা-ই হোক, স্পেনীয় উত্তরাধিকার যুদ্ধের মাধ্যমে ১৭০৭ সালে ভ্যালেন্সিয়া এবং ১৭১৪ সালে কাতালোনিয়া স্পেনের  অধিভূক্ত হয় এবং ১৭১৫ থেকে বর্তমান মানচিত্রে আমরা যেই স্পেনকে দেখি, সেই স্পেন নবরূপে যাত্রা শুরু করে। ১৮৭৩ সালে বার্সেলোনা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বলদোমার লস্তউ কাতালোনিয়াকে পুনরায় স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন।

এরপর আবার এলো স্পেনের পালা। ১৯৩১ সালের এপ্রিলে কাতালান শাসক ফ্রান্সেস্ক ম্যাসিয়ে কাতালান প্রজাতন্ত্রকে স্পেন-যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্রের একটি প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন, যেখানে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন থাকবে।

লুইস কম্প্যানিস; source: abp.bzh

১৯৩৪ সালের ৬ অক্টোবর পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নেয়। তৎকালীন কাতালান ক্ষমতাসীন নেতা লুইস কম্প্যানিস উগ্র-ডানপন্থী ফ্যাসিবাদী সরকারের সাথে একপ্রকার বিদ্রোহ করেই কাতালোনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে বসেন। বলা বাহুল্য, তিনি ছিলেন একজন বামপন্থী, রিপাবলিকান লেফট অব কাতালোনিয়া নামক দলের নেতা। এরপর কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কাতালোনিয়াকে পুনরায় কবজা করে এবং লুইসকে জেলে পাঠানো হয়। স্বায়ত্তশাসিত সরকারের ক্ষমতা খর্ব করে কাতালোনিয়ার সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি স্পেনের হস্তগত হয়। ঠিক তার দু’বছর পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে কাতালান প্রদেশে পুনরায় বামপন্থী সরকার ফিরে আসে। নির্বাচনের এই ফলাফলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার নমনীয় হয়। এ নমনীয়তার ফলস্বরূপ সাংবিধানিকভাবে কিছু বাড়তি স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়া হয়।

১৯৩৮ সালে ইবোরো যুদ্ধের মাধ্যমে জেনারেল ফ্র‍্যান্সিস্কো ফ্রাঙ্কো এসে কাতালোনিয়ায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েমের লক্ষ্যে দমন-নীতি গ্রহণ করেন। কাতালোনিয়ার রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে একে কেন্দ্রের অধীনে আনার সাথে সাথে প্রাণ যায় ৩৫০০ কাতালানের।

এ দমবন্ধকারী পরিস্থিতির অবসান ঘটে ফ্রাঙ্কোর চিরবিদায়ের পরেই। ১৯৭৭ সালে কাতালোনিয়া পুণরায় রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকায় ফিরে পায় এবং ১৯৭৮ সালের সংবিধান কর্তৃক এ বিশেষ ক্ষমতাবল অনুমোদিতও হয়। এই জায়গা থেকে কাতালোনিয়ার অবস্থা ২০১৭-তে এসে তেমন একটা বদলায়নি।

 

কাতালোনিয়ায় ঐতিহাসিক গণভোট ও তার সর্বশেষ খবরাখবর

স্বাধীনতার দাবি সময়ের ব্যবধানে প্রগাঢ় থেকে কখনো ম্রিয়মাণ হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার স্পৃহা যে কাতালান জনগণের মাঝ থেকে কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তার প্রমাণ ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের প্রাদেশিক নির্বাচন। স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দলটি বিপুল জনসমর্থন আদায় করে ক্ষমতায় আসীন হয়। ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর সরকার এক ঘোষণাপত্র জারির মাধ্যমে ২০১৭ সালের মধ্যেই স্বাধীন কাতালোনিয়া প্রজাতন্ত্র ও তার সংবিধান কায়েমে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় এবং তদনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণেরও জানান দেয়। কাতালোনিয়ার পার্লামেন্টে ৭২-৬৩ ভোটের ব্যবধানে ঘোষণাপত্রটি পাশ হয়েছিল।

স্বাধীনতার স্পৃহা কখনোই হারায়নি কাতালানরা; source: euobserver.com

এরপর এ বছরের ৯ জুন কাতালোনিয়ার পার্লামেন্ট কর্তৃক স্বাধীনতা ইস্যুতে গণভোটের তারিখ হিসেবে ১ অক্টোবরকে চূড়ান্ত করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর এই নির্বাচনের বৈধতা প্রদানে অনুকূল আইনও পাশ হয় তাদের পার্লামেন্টে। সেখানে বলা হয়- ন্যূনতম ভোটার যদি ভোট না-ও দেয়, তবুও কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে কাতালোনিয়ার ভাগ্য, যেখানে একটি ভোট ‘হ্যাঁ’-তে বেশি পড়লে কোনো রকম শতাংশের সমীকরণ ছাড়াই কাতালোনিয়া স্বাধীনতার পক্ষে ফলাফল নির্ধারিত হবে।

ওদিকে এ নির্বাচনকে আগাম অবৈধ ঘোষণা করতে স্পেনের সাংবিধানিক আদালতও সময় নেয়নি। কারণ, প্রথমত, ১৯৭৮ সালের স্পেনের সংবিধান মতে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে কোনো অঞ্চলে গণভোটের অনুমোদন নেই। দ্বিতীয়ত, কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ আইনেও বলা হয়েছে, যেকোনো ভোটে ফলাফল নির্ধারণের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যতীত কাতালোনিয়ায় কোনো সাংবিধানিক/রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা যাবে না।

স্পেনের আদালতের সিদ্ধান্তে অনাস্থা জানিয়ে ঠিক তার একদিন পর কাতালোনিয়ার সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা এর বিপক্ষে কাতালোনিয়ার ৯৪২টি পৌরসভার ভেতর ৭১২টি থেকে জনসমর্থন আদায়ের প্রস্তুতি নেবেন।

২০১৬ সালে স্বাধীনতার দাবিতে কাতালানদের মিছিল; source: cataloniavotes.eu

যথারীতি ১ অক্টোবর ভোট গ্রহণ শুরু হয়। মাত্র ৪৩.০৩ ভাগ ভোটার এতে অংশ নিলেও ভোটারদের ৯২.০১% (২০,৪৪,০৩৮ জন) স্বাধীনতার পক্ষে এবং মাত্র ৭.৯৮% (১,৭৭,৫৪৭ জন) এর বিপক্ষে ভোট দেয়।

যেহেতু ভোট গ্রহণের এক মাস আগেই স্পেন সরকার একে অবৈধ ঘোষণা করেছে, তাই অনুমিতভাবেই সরকারের তরফ থেকে সর্বাত্মক দমননীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো ভোটগ্রহণের বিরুদ্ধে। এর ফলে পুলিশের সাথে স্বাধীনতাপন্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে ভোটগ্রহণ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্নতাপন্থীদের অভিযোগ, প্রায় সত্তর হাজারেরও বেশি ভোট গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি সরকারী বাধার কারণে। পোলিং স্টেশন বন্ধ করে দেবার অভিযোগও ওঠে। তাদের আরও দাবি, দমন-পীড়ন চালানো না হলে ভোট গ্রহণের হার ৫৫% এর উপরে থাকতো। কাতালোনিয়া সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রায় আট শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এ সংঘর্ষে, অন্যদিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে হতাহতের সংখ্যা মাত্র এর অর্ধেক। পুলিশ কর্তৃক আন্দোলনকারীদের ওপর যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগও উঠেছে, যার তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলকে।

তবুও তারা স্বাধীনতাই চায়; source: resumenlatinoamericano.org

স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এই গণভোটকে স্বীকৃতি দেননি। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহইও গণভোটকে অবৈধ বলে জানিয়েছেন, “ভোটে অংশ নিয়ে কাতালানরা বোকামি করেছে। কারণ এটি ছিল গণতন্ত্রের তামাশা”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া সহ সকল পরাশক্তি ও স্পেনের পড়শিরা পুরো ইস্যুকে স্পেনের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন নতুবা সংহতি জানিয়েছেন স্পেনের অখণ্ডতার প্রতি। কেবল বেলজিয়াম আর ক্রোয়েশিয়া কাতালোনিয়ার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে স্পেনকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহবান জানিয়েছেন।

গণভোটের দিন পুলিশের অ্যাকশন; source: noroeste.com.mx

এই নির্বাচনের পর ৩ অক্টোবর কাতালোনিয়ার সরকার প্রধান কার্লোস পুজডেমন্ড ৯ অক্টোবর পার্লামেন্ট অধিবেশনে অন্যান্য দলের সাথে আলোচনার করে সেদিনই নির্বাচনের ফলাফল কার্যকর ঘোষণা করেন এবং কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণার আগাম ইঙ্গিত দেন। তার ঠিক দু’দিনের মাথায় স্পেনের সাংবিধানিক আদালত ক্ষমতাসীন কাতালান সোশালিস্ট পার্টিকে ৯ অক্টোবরে প্রাদেশিক পার্লামেন্টারি অধিবেশন থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে নতুন করে অনিশ্চয়তা বাড়লো কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নে।

 

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাবোধের ভিত্তি

কাতালান সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা

কাতালোনিয়া চারটি বিভাগ নিয়ে গঠিত- বার্সেলোনা, গিরোনা, লেইদা ও তারাগোনা। ভৌগোলিকভাবে স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন না হলেও ফ্রান্সের সাথে কাতালোনিয়ার দূরত্ব তুলনামূলক কম। হয়তোবা এ কারণেই দেখা গেছে, স্বাধীনতার ফাঁকে ফাঁকে কাতালোনিয়া যে কয়বার পরাধীনতার শিকলে বাঁধা পড়েছে, তার বেশিরভাগ সময়টাই ছিলো ফ্রান্সের অধীনে। সাংস্কৃতিকভাবে বরাবরই তাই মূলধারার স্প্যানিশ বলয় থেকে কাতালোনিয়া দূরত্ব বজায় রেখেছে। অন্যদিকে সবলের ওপর দুর্বলের অত্যাচারের চিরাচরিত ব্যাকরণ মেনে স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতি বরাবরই আগ্রাসী ছিল কাতালান সংস্কৃতির ওপর। তাই বলে যে কাতালান সংস্কৃতি সমৃদ্ধ নয়, মোটেও তা নয়। বরং কাতালানদের সংস্কৃতি উঁচুদরের বলেই স্প্যানিশ বনাম কাতালান লড়াইটা একতরফা নয়।

কাতালান সামুদ্রিক খাবার জিভে জল আনবেই; source: barcelonacheckin.com

ভৌগোলিক অবস্থানের মতোই ভাষাগত দিক থেকে কাতালানরা স্প্যানিশদের চেয়ে অনেক বেশি ফরাসী বা ইতালীয় ধাঁচ ঘেঁষা। একই দৃশ্য দেখা যায় খাদ্যাভ্যাসেও। স্প্যানিশ কুইজিনের বিশ্বজুড়ে যে এত সমাদর, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের লোভনীয় সামুদ্রিক মাছ ও পাহাড়ি শূকরের পদগুলো। কাতালোনিয়া সামুদ্রিক এবং পার্বত্য এলাকা বলে কেবল এখানেই পর্যটকেরা এসব জিভে জল আনা পদের স্বাদ নিতে আসেন। কারণ মাদ্রিদ তথা ‘মূলধারার স্পেনে’ এসব খাবার অতটা বিখ্যাত বা প্রচলিত নয়। এর পাশাপাশি টাপাস, পান আম্ব তামাতে, এস্কুদেলা, বতিফারা, ফিদেউয়া ইত্যাদি খেতে হলে আপনাকে কাতালোনিয়াতেই যেতে হবে।

শুধু খাদ্যাভাসে বৈচিত্র্য নয়, উৎসবের দিক থেকেও এখানে আছে বৈচিত্র্য। দিয়া দে সান্ত জোর্দি, লা মার্কে এর মতো বড় বড় উৎসব বার্সেলোনা তথা কাতালোনিয়াতে লেগেই আছে, যেগুলো কেবলই কাতালানদের একক উত্তরাধিকার। স্প্যানিশদের সাথে তাদের আচরণেও আছে চোখে পড়ার মতো তফাত। স্প্যানিশরা ভীষণ আমুদে, বাচাল ও বহির্মুখী। অন্যদিকে কাতালানরা ভীষণরকম আত্মসচেতন, ব্যবসায়িক মানসধারী এবং চটপটে। স্প্যানিশরা যদি বলে শিল্পে তাদের আছে পাবলো পিকাসো, ফ্রান্সিসকো গয়া, তবে কাতালানরাও বুক ফুলিয়ে বলতে পারে এন্তোনি গডি কিংবা পরাবাস্তববাদী চিত্রের কিংবদন্তী সালভাদর দালির কথা। স্প্যানিশরা যদি বলে তাদের আছে রিয়াল মাদ্রিদের মতো শক্তিধর ক্লাব, কাতালানরা তখন জবাব দেবে বার্সেলোনার কথা বলে। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রেখে স্পেনের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি আবহ তৈরি করে রেখেছে কাতালোনিয়া।

উৎসবে তৈরি হয় কাতালানদের বিখ্যাত ‘মানব টাওয়ার’; source: festival.si.edu

স্প্যানিশ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসন

এই আলোচনাটি বেশ স্পর্শকাতর। আলোচনার শেষভাগে এসে পাঠক বাঙালি সংস্কৃতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সংস্কৃতি চাপিয়ে ‘সাচ্চা পাকিস্তানি/মুসলিম’ বানানোর সেই মুর্খ প্রক্রিয়াটির কথা স্মরণ করতে পারেন। সেটা করাই স্বাভাবিক, কেননা যুগে যুগে স্বজাত্যবোধে উদ্দীপ্ত জাতিগোষ্ঠীকে এভাবেই নিষ্পেষক ক্ষমতাসীন সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠী একই কায়দায় দমন করবার চেষ্টা করে গেছে। ইউরোপিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ ইকুইলিটি নেটওয়ার্ক (এলেন) এর ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ফেরেন সুয়ে ও ‘এলেন ব্রাসেলস’ এর মহাসচিব ডেভিথ হিক্স ২০১৫ সালের জুনে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম– ‘এলেন-এবলুল স্টেটমেন্ট টু দ্য ইউএন হিউম্যান রাইটস কমিটি অন দ্য ডেস্ক্রিমিনেশিন এন্ড এট্যাক্স অন নন-ক্যাস্টিলিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ স্পিকার্স ইন দ্য স্প্যানিশ স্টেট’। নামেই বোঝা যাচ্ছে প্রবন্ধের গভীরে গেলে কাতালানদের প্রতি বৈষম্য আর স্প্যানিশ আগ্রাসনের সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে।

প্রবন্ধটিতে ‘প্রো-ক্যাটালান ল্যাঙ্গুয়েজ প্ল্যাটফর্ম’ এর তৈরিকৃত একটি রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, যেখানে সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কাতালানভাষী অঞ্চলগুলোতে কেবলমাত্র ভাষার কারণে ভয়াবহ বৈষম্যের স্বীকার হবার ৪০টি ঘটনা নথিভূক্ত আছে, যেগুলোর সংঘটন কাল ২০০৭ থেকে ২০১৩ প্রতি বছরের প্রথম চার মাস। এই ৪০টি ঘটনার ভেতর জেনোফোবিয়া বা জাতিভীতিমূলক আচরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনা, শারীরিক লাঞ্ছনা, মানসিক অপদস্থ ও হয়রানি, বৈধ চুক্তি ভঙ্গের মতো ঘটনাও রয়েছে।

বৈষম্য থেকে মুক্তি চায় কাতালানরা; source: nbcnews.com

শারীরিক লাঞ্ছনার সবচেয়ে বাজে ঘটনাটি ঘটেছিলো এক এয়ারপোর্টে সরকারী কর্মকর্তার দু’জন ব্যক্তিকে পেটানোর মাধ্যমে। কারণ তারা কাতালান ভাষায় কথা বলছিলেন। এছাড়া একজন বৃদ্ধা ও যুবক হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেও চিকিৎসা সেবা পাননি, বরং কাতালান হবার কারণে হাসপাতাল কর্মীরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন। এক বিচারক একবার মায়ের কাছ থেকে সন্তানের জিম্মা কেড়ে নেবার রায় দিয়েছিলেন। কারণ মা তার সন্তানকে নিয়ে কাতালোনিয়া পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। বিচারকের মতে, শিশুটির জন্য দুইটি ভাষা প্রধান প্রচলিত আছে – এমন কোনো স্থান ‘বিপজ্জনক’! কাতালানভাষী অধ্যুষিত ভ্যালেন্সিয়াতে মাত্র তিনভাগের একভাগ শিক্ষার্থী কাতালান মাধ্যমে পড়ার সুযোগ পায়। ২০১৪ সালে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৫১টি কাতালান মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ওদিকে মাত্র ৪ জন স্প্যানিশভাষী শিক্ষার্থীর জন্য ভ্যালেন্সিয়াতে স্কুল গড়ে দেবার নজিরও আছে। এমন একচোখা শিক্ষানীতি নিয়েও সে দেশের শিক্ষামন্ত্রী মি. ওয়ার্ট নিঃস্পৃহভাবে জনসমক্ষে বলেছিলেন তাদের এমন পদক্ষেপের উদ্দেশ্য কাতালানদের ‘সত্যিকারের স্প্যানিয়ার্ড’ বানানো।” নগ্ন আগ্রাসন একেই বলে বোধ হয়।

 

কী হতে যাচ্ছে বার্সেলোনা ক্লাবের ভবিষ্যৎ?

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার আলোচনায় সাধারণ জনতার আগ্রহের একটি বিশাল বড় জায়গা হলো – কাতালোনিয়ার সবথেকে বড়, বিশ্বখ্যাত ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার কী হবে, যদি বার্সেলোনা তথা কাতালোনিয়া স্পেন থেকে আলাদা হয়ে যায়? এর আগে আমাদের একটি লেখায় আলোচিত হয়েছিল বিষয়টি, এ ব্যাপারে প্রাসঙ্গিক কিছু বক্তব্য দিয়েই শেষ হচ্ছে আজকের লেখাটি।

রিয়াল মাদ্রিদের ভেন্যু এল বার্নাব্যুতে খেলা হলে বার্সেলোনা অধিনায়ক জেরার্ড পিকেকে গ্যালারি থেকে অনেক বাজে মন্তব্য শুনতে হয়, কারণ পিকে কাতালান জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। শুধু পিকে নন, বার্সেলোনার বেশিরভাগ স্পেনীয় খেলোয়াড় কাতালান জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ভিসেন্তে দেল বক্সদের মতো স্পেন কোচদের তাই একরকম সংগ্রাম করতে হয় রামোস-পিকেদের মতো দুই মেরুর জাতীয়তাবাদ অন্তরে ধারণকারী খেলোয়াড়দের একটি জাতীয় দলে খেলাতে।

বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের চিন্তা বার্সাকে ঘিরে; source: nigeriacircle.com

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্পেনের অংশ না থাকলে বার্সেলোনা কি স্পেনের ঘরোয়া লীগ ‘লা-লিগা’তে খেলতে পারবে? স্প্যানিশ লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবেস জানিয়েছেন, কাতালোনিয়া স্বাধীন হয়ে গেলে লা লিগায় বার্সেলোনা খেলতে পারবে না। বার্সাকে যদি লিগে খেলতেই হয়, তাহলে অবশ্যই স্প্যানিশ পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত আইন সংস্কার করতে হবে। ওদিকে বার্সেলোনার সাবেক ও বর্তমান দুই কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজ আর জেরার্ড পিকে প্রকাশ্যে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক সমাবেশে পর্যন্ত যোগ দিয়েছেন। ক্লাব সভাপতি জোসেফ বার্তমেউ-ও বিবৃতি দিয়েছেন স্বাধীনতার দাবির পক্ষে ও গণভোট আয়োজনের সমর্থনে। কাতালোনিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী জেরার্ড ফিগুইরাস জানিয়েছেন, কাতালোনিয়া স্বাধীন হলে বার্সেলোনা স্পেনের বাইরের যেকোনো লিগে খেলতে পারবে। সেটা হতে পারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ কিংবা ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান অথবা ইতালিয়ান সিরি’আ লিগ। তবে স্বাধীন হলেও লা লিগায় খেলার জন্য বার্সেলোনার অনুপ্রেরণা হতে পারে ফ্রেঞ্চ লিগের ক্লাব মোনাকো। ফ্রান্স থেকে স্বাধীন হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম এই ছোট্ট দেশের একমাত্র ক্লাবটি যে খেলছে ফ্রান্সের লিগেই।

ফিচার ইমেজ © LLUIS GENE/AFP/Getty Images