একটা সময় ছিল, যখন আমরা শুধু হাতে-কলমেই চিঠি এবং দরখাস্ত লিখতাম এবং স্কুলে শেখা চিঠি-দরখাস্ত লেখার নিয়ম-কানুনগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করতাম। ইমেইল অবশ্য চিঠি বা দরখাস্তের মতো নয়। এখানে তাই গৎবাঁধা কাঠামো অনুসরণ না করে খুবই সংক্ষেপে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান করাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা কোনো প্রকার নিয়ম না মেনেই যথেচ্ছভাবে ইমেইল রচনা করব। বিশেষ করে সে ইমেইল যদি পড়াশোনা, চাকরি অথবা ব্যবসায়িক কাজের জন্য হয়।

ভুল ইমেইল পাঠানোর পরে আর কিছু করার থাকে না; Source: imgflip.com

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেকেই ইমেইলকে এমনভাবে ব্যবহার করি যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ম্যাসেঞ্জার বা বিভিন্ন টেক্সট ম্যাসেজ সার্ভিসের সাথে ইমেইলের আর কোনো পার্থক্য থাকে না। আমরা ভুলে যাই, ম্যাসেঞ্জারে বা টেক্সট ম্যাসেজে বন্ধুদের সাথে আলাপ করা আর ইমেইলে জরুরী কোনো তথ্য আদান-প্রদান করা এক বিষয় না।

ভাষা এবং ব্যাকরণগত ভুল সংশোধনের জন্য অনেকেই গ্রামারলি (Grammarly) সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে থাকেন। সফটওয়্যারটির বিভিন্ন ব্রাউজার এক্সটেনশন ব্যবহার করলে ইমেইল করার সময়ও এটি বানান এবং ব্যাকরণগত ভুল ধরিয়ে দিতে পারে। গ্রামারলি তাদের ব্যবহারকারীদের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে ইমেইল করার সময় ২০১৭ সালে তাদের ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে বেশি করা ভুলগুলো স্থান পেয়েছে। মিলিয়ে নিন, আপনিও এ ধরনের ভুল করছেন না তো!

১। ভুল বানানের ব্যবহার

গ্রামারলির মাধ্যমে ভুল বানান শুদ্ধ করা যায়; Source: grammarly.com

এ বছর মানুষ ইমেইলে সবচেয়ে বেশি ভুল করেছে বানানে। সঠিক বানান সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা যদিও বানান ভুলের অন্যতম প্রধান কারণ, কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ না। টাইপ করার সময় ভুল কি-তে চাপ পড়াও এর বড় একটি কারণ। অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর স্মার্টফোন থেকে ইমেইল পাঠানোর পরিমাণ বেশি হওয়ার ফলেও ইমেইলে বানান ভুলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্মার্টফোনের ছোট স্ক্রিনে টাইপ করার সময় অনেক সময়ই ভুল অক্ষরের ওপর চাপ পড়ে যেতে পারে।

বানান ভুল হ্রাস করার জন্য কম্পিউটারের ব্রাউজারের পাশাপাশি আইফোনেও গ্রামারলি অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া অ্যান্ড্রয়েডের জন্যও গ্রামারলি কীবোর্ড আছে, সেটাও ব্যবহার করা যেতে পারে।

২। একই শব্দের একাধিকবার ব্যবহার

প্রয়োজনে বিকল্প শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ; Source: grammarly.com

এটিকে অবশ্য ব্যাকরণগত ভুল বলা যায় না, কিন্তু পরপর কয়েকটি বাক্যে একই শব্দ বার বার ব্যবহার করাকে গ্রামারলি ভাষাগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে। কোনো লেখায় যদি একই শব্দ ঘুরে ঘুরে বার বার চোখের সামনে আসতে থাকে, তাহলে তা পাঠকের মনে একঘেঁয়েমি এবং বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। ফলে পাঠক লেখাটি পড়তে অনাগ্রহী হতে পারে, অথবা আংশিক পড়ার পর বিরক্ত হয়ে পড়া বাদ দিয়ে দিতে পারে। এ বছর ইমেইলে এই দুর্বলতাটি ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।

শব্দ ভাণ্ডারের ওপর কম দখল থাকলে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। কিন্তু যথেষ্ট শব্দ জানা থাকলেও শব্দচয়নের ক্ষেত্রে সাবধানী না হওয়াও এর একটি বড় কারণ। উপযুক্ত ক্ষেত্রে সর্বনাম ব্যবহার করা এবং বিকল্প প্রতিশব্দ ব্যবহার করার মাধ্যমে এ ত্রুটি দূর করা যেতে পারে। এছাড়া নতুন কোনো শব্দ শেখার সাথে সাথে গ্রামারলি অথবা এ জাতীয় অন্য যেকোনো সফটওয়্যার থেকে একটিমাত্র রাইট ক্লিক করে তার প্রতিশব্দগুলো জেনে রাখার অভ্যাস করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বেশ উপকারে আসবে।

৩। অস্পষ্ট শব্দের ব্যবহার

এ বছর অস্পষ্ট শব্দের ব্যবহার ছিল ইমেইলের তৃতীয় ত্রুটি। গ্রামারলি শুধু ব্যাকরণ এবং বানান ভুলই সংশোধন করে না, একইসাথে কীভাবে লেখাকে সমৃদ্ধ করা যায়, সে ব্যাপারেও পরামর্শ দেয়। একটি বাক্য হয়তো ব্যাকরণগতভাবে সম্পূর্ণ সঠিক, কিন্তু দুর্বল শব্দচয়নের কারণে বাক্যটির মাধ্যমে সঠিক ভাব প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। এরকম ক্ষেত্রে গ্রামারলি কিছু কিছু অস্পষ্ট অর্থবোধক শব্দের পরিবর্তে তাদের প্রতিশব্দ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো খাবারের প্রশংসা করতে হলে ‘good meal’ বা ‘nice meal’ এর পরিবর্তে ‘delicious meal’ বা ‘lovely meal’ ব্যবহার করলে তা আরো পরিষ্কারভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।

অস্পষ্ট শব্দের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ; Source: grammarly.com

৪. নামের ভুল বানান

এটি একটি মারাত্মক ভুল। বিশেষ করে যার কাছে ইমেইল পাঠানো হচ্ছে, তার নামটিই যদি ভুল হয়, তাহলে তা প্রাপকের মনে প্রেরক সম্পর্কে ঋণাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে। আর যদি ইমেইলটি হয় চাকরির জন্য আবেদনপত্র, তাহলে এরকম একটি ভুলের কারণে শুরুতেই আবেদনটি চলে যেতে পারে বাতিলের খাতায়। যদিও আমরা প্রচলিত ভাবে বলে থাকি, নামের বানানে কোনো ভুল নেই, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ নামের বানানেরই সঠিক রূপ আছে। যেমন মা্ইকেল নামটির বানান Mikel না, বরং Michael। জনসন নামটির বানান Jonson না, বরং Johnson। ক্যাথারিন নামটির বানান Katharine নয়, বরং Kathryn। এছাড়াও বিখ্যাত ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের নামের বানান যেভাবে ব্যবহার করেন, আমাদেরও সেরকমই ব্যবহার করা উচিত। শুধু মানুষের নাম না, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম, স্থানের নামের ব্যাপারেও সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

৫. বাক্যের শুরুতে ছোট হাতের অক্ষর

প্রতিটি বাক্যের প্রথম অক্ষর যে ক্যাপিটাল লেটারে তথা ‘বড় হাতের অক্ষরে’ হতে হয়, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বন্ধুদের সাথে টেক্সট ম্যাসেজ আদান-প্রদানের সময় অতিরিক্ত Shift কি চাপ দেওয়ার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আমরা বাক্যের শুরুতেও ছোট হাতের অক্ষরে টাইপ করার যে ভয়াবহ অভ্যাস তৈরি করেছি, তারই প্রমাণ এই ভুলটি। টেক্সট ম্যাসেজ এবং ইমেইল সমান গুরুত্বপূর্ণ না। টেক্সট ম্যাসেজে এ ধরনের ব্যাকরণগত ভুল করলে বন্ধুরা কিছু মনে করবে না। কিন্তু এই অভ্যাসটি যদি প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যবসায়িক ইমেইল করার সময়ও রয়ে যায়, তা নিঃসন্দেহে ভালো কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না।

৬। প্যাসিভ ভয়েসের ব্যবহার

প্যাসিভ ভয়েস বা ভাববাচ্যের ব্যবহার ব্যাকরণগতভাবে ভুল না। বরং মাঝে মাঝে প্যাসিভ ভয়েসের ব্যবহারই পারে কোনো বক্তব্যকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে। কিন্তু বিশেষ কোনো প্রয়োজন না হলে সাধারণভাবে অ্যাকটিভ ভয়েস ব্যবহার করাই শ্রেয়। অতিরিক্ত প্যাসিভ ভয়েসের ব্যবহার লেখাকে অসুন্দর করে তোলে এবং লেখার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু গ্রামারলির মতে, মানুষ এ বছর ইমেইলে অতিরিক্ত পরিমাণে প্যাসিভ ভয়েস ব্যবহার করেছে।

৭। অক্সফোর্ড কমার ব্যবহার

অক্সফোর্ড কমার ব্যবহার ইংরেজিতে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এটি হচ্ছে তিন বা ততোধিক শব্দ কমা দিয়ে লেখার সময় শেষ শব্দটির আগে ব্যবহৃত কমা। বাংলায় আমরা এ ধরনের কমা ব্যবহার করি না। কিন্তু ইংরেজিতে যেখানে অর্থের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানে এরকম ক্ষেত্রে কমা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আছে।

যেমন, “আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাহসান ও মিথিলা গতকাল আমাদের বাসায় এসেছিল” এবং “আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাহসান, ও মিথিলা গতকাল আমাদের বাসায় এসেছিল” বাক্য দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। প্রথমটির অর্থ হচ্ছে, তাহসান ও মিথিলা বক্তার বাসায় গিয়েছিল, যারা দুজন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অন্যদিকে দ্বিতীয় বাক্যে বোঝানো হচ্ছে, তিনজন ব্যক্তি বক্তার বাসায় গিয়েছিল- তাহসান, মিথিলা এবং বক্তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এ ধরনের কমার সঠিক ব্যবহার না করা ইমেইলের একটি সাধারণ ত্রুটি।

৮। বাক্যের শেষে যতি চিহ্নের ব্যবহার

বাক্যের সমাপ্তি বোঝানোর জন্য বাক্যের শেষে দাড়ি বা ফুলস্টপ (অথবা প্রয়োজনে প্রশ্নবোধক বা বিস্ময়বোধক চিহ্ন) ব্যবহার বাধ্যতামূলক। টেক্সট ম্যাসেজে আমরা প্রতিটি বাক্য পৃথক পৃথক ম্যাসেজে, অথবা পৃথক পৃথক অনুচ্ছেদে টাইপ করি বলি; সেখানে সাধারণত বাক্যের শেষে কোনো যতিচিহ্ন ব্যবহার করি না। কিন্তু এই অভ্যাসটিও টেক্সট ম্যাসেজ থেকে ধীরে ধীরে ইমেইলে চলে আসছে। অনেকেই ইমেইলে ছোট ছোট বাক্য পৃথক পৃথক অনুচ্ছেদে লেখার সময় তার শেষে ফুলস্টপ ব্যবহার করে না, যা খুবই মারাত্মক একটি ভুল।

৯। নামবাচক বিশেষ্যে ছোট হাতের অক্ষর

ইংরেজিতে প্রপার নাউন অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি, স্থান, প্রতিষ্ঠান প্রভৃতির নাম বড় হাতের অক্ষরে লিখতে হয়। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ ইমেইলে নামবাচক বিশেষ্য তথা Proper Noun এর ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল লেটার তথা বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করে না। অজ্ঞানতার কারণেই হোক, শিফট কি ব্যবহার করতে আলসেমির কারণেই হোক, অথবা টেক্সট ম্যাসেজিং এর প্রভাবের কারণেই হোক, নিঃসন্দেহে এটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুল।

১০। অপ্রয়োজনীয় শব্দগুচ্ছের ব্যবহার

কিছু কিছু শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আছে, যেগুলো বাক্যে নতুন কোনো অর্থ যোগ করে না, অহেতুক বাক্যকে দীর্ঘায়িত করে। এগুলোকে গ্রামারলি এম্পটি ফ্রেজ বা ফাঁকা শব্দগুচ্ছ হিসেবে চিহ্নিত করে। যেমন ‘basically’, ‘clearly’, ‘in a manner of speaking’, ‘for all intents and purpose’, ‘as a matter of fact’ এই শব্দগুলো বাক্যের অর্থের কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধন না ঘটিয়েই লেখার আকারে বৃদ্ধি করে। এ বছর মানুষকে এ ধরনের শব্দও প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

কমার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধান হওয়া উচিৎ; Source: grammarly.com

এই ১০টি ত্রুটি ছাড়াও গ্রামারলি আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুলের কথা উল্লেখ করেছে, যেগুলো মানুষ নিয়মিত করে থাকে। যেমন বাক্যের মধ্যে সংখ্যার ব্যবহারে ভুল করা, অস্পষ্টভাবে সর্বনাম ব্যবহার করা, যৌগিক বাক্যে ভুলভাবে কমা ব্যবহার করা, অথবা কমা ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত জটিল বাক্য এবং অপরিচিত শব্দ ব্যবহার করা ইত্যাদি।

ফিচার ইমেজ-  fusemachines.com