ছদ্মবেশী গোয়েন্দা কার্যক্রম বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আছে, যেখানে গোয়েন্দারা শত্রু দেশের নাগরিকের মতো ছদ্মবেশ ধরে তাদের সাথে মিশে যায়, তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে নিজ দেশে পাচার করে, অথবা তাদের বিভিন্ন অপারেশনে যোগ দিয়ে সেসব অপারেশন ব্যর্থ করে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতেও এ ধরনের গোয়েন্দা কার্যক্রম চালু আছে। এই গোয়েন্দারা দেখতে ফিলিস্তিনিদের মতো, তাদের আচার-আচরণ, পোশাক-আশাকও ফিলিস্তিনিদের মতো, এমনকি তারা কথাও বলে ফিলিস্তিনের আঞ্চলিক টান বিশিষ্ট আরবিতে।

রামাল্লাতে ফিলিস্তিনির ছদ্মবেশী এক ইসরায়েলি এজেন্ট, গ্রেপ্তার করছে এক ফিলিস্তিনিকে @ ABBAS MOMANI / AFP

ইসরায়েলের প্রধান এবং সবচেয়ে কুখ্যাত গোয়েন্দা বাহিনী হচ্ছে মোসাদ, যাদের কাজ বিশেষ অপারেশন পরিচালনা করা। এছাড়াও আছে সামরিক সামরিক গোয়েন্দা গোয়েন্দা সংস্থা আমান এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত বা শাবাক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা, সেসব দেশে জটিল কোনো অভিযান পরিচালনা করা, তাদের সামরিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নস্যাৎ করে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা প্রভৃতি দায়িত্ব সাধারণত মোসাদের উপর বর্তায়। আর এ কাজ করতে গিয়ে তাদেরকে মাঝেমাঝেই আন্ডার কভার বা ছদ্মবেশী গোয়েন্দা নিয়োগ করতে হয়।

তবে মোসাদ ছাড়াও ইসরায়েলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা আছে, যাদের কাজ বহির্বিশ্বে না, বরং শুধু ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের কাছে এরা মুস্তারেবিন নামে পরিচিত। মুস্তারেবিন (مستعربين) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ যারা দেখতে আরবদের মতো অথবা যারা আরবদের মতো জীবন যাপন করে। হিব্রুতে এদের পরিচয় মুস্তারেভিম নামে। এরা পৃথক কোনো গোয়েন্দা বাহিনী না, বরং ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ), ইসরায়েলি বর্ডার পুলিশ এবং ইসরায়েলি পুলিশের অধীনে কর্মরত বিশেষ ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ ইউনিট, যাদের মূল কাজ ফিলিস্তিনি সেজে ফিলিস্তিনিদের সাথে মিশে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা।

মুস্তারেবিনরা ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা এখনও পুরাপুরি জানা যায় না। যেহেতু তারা আন্ডার কভার এজেন্ট, তাই তাদের কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত গোপনীয়। কিন্তু বিভিন্ন সময় সাবেক গোয়েন্দাদের এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে তাদের সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। মুস্তারেবিনরা ছদ্মবেশে ফিলিস্তিনিদের সাথে মিশে যায় এবং তাদের বিভিন্ন আন্দোলন, মিছিলে অংশ নিয়ে সেগুলোর গতিপ্রকৃতি, পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে অবহিত করে।

রামাল্লাতে মুস্তারেবিন এজেন্টরা ফিলিস্তিনিদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে @ Mohammed Torokman / AFP

মুস্তারেবিনরা আন্দোলনকারীদের ছদ্মবেশে মিছিলে অনুপ্রবেশ করে। অনেক ফিলিস্তিনি যুবকের মতোই তাদের মুখ থাকে কালো কাপড় অথবা সাদাকালো চৌকোনা নকশা বিশিষ্ট কেফায়া দ্বারা পেঁচানো। তারা মিছিল থেকে ইসরায়েল বিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে, মাঝে মাঝে ইসরায়েলি সেনাদের উপর পাথরও নিক্ষেপ করে। মিছিল যখন যথেষ্ট বড় আকার ধারণ করে এবং কিছু মিছিলকারী যখন পাথর নিক্ষেপ করার জন্য ইসরায়েলি সেনাদের কাছাকাছি এগিয়ে যায়, ঠিক তখনই এই মুস্তারেবিনদের আসল রূপ প্রকাশিত হয়।

তারা দল বেঁধে মিছিলকারীদের কয়েকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পকেটে লুকিয়ে রাখা পিস্তল বের করে আকাশের দিকে গুলি ছুঁড়ে অন্য মিছিলকারীদেরকে দূরে সরিয়ে দেয়, প্রয়োজনে তাদের উপর গুলিও করে। মুস্তারেবিনদের পিস্তল থেকে গুলির আওয়াজ আসামাত্র ইসরায়েলি সেনারাও আক্রমণ শুরু করে। তারা এগিয়ে এসে মুস্তারেবিনদের হাতে আটক হওয়া ফিলিস্তিনিদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পলায়নরত মিছিলকারীরা একে অপরকে চিৎকার করে সতর্ক করে দিতে থাকে, মুস্তারেবিন এসেছে! মুস্তারেবিন এসেছে!

ফিলিস্তিনিদের চোখকে ধোঁকা দিয়ে, তাদের সন্দেহের উদ্রেক না করে, তাদের সাথে পরিপূর্ণভাবে মিশে যাওয়ার জন্য মুস্তারেবিনদেরকে বেশ কঠোর ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে অপারেশন চালানোর জন্য তাদেরকে ফিলিস্তিনিদের মতো আচরণ করতে, তাদের মতো করে চিন্তা করতে শেখানো হয়।

রামাল্লাতে মুস্তারেবিন এজেন্ট এক ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করছে @ Mohammed Torokman / AFP

ফিলিস্তিনিদের মাতৃভাষা আরবি। কিন্তু বিশ্বের সব ভাষার মতোই আরবি ভাষারও বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপভেদ আছে। বিভিন্ন আরব দেশে ব্যবহৃত আরবি ভাষার টান এবং শব্দের মধ্যে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। আবার একই দেশের বিভিন্ন শহরেও ভাষার ভিন্নতা আছে। মুস্তারেবিন এজেন্টদেরকে এমনভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়, যেন তারা ফিলিস্তিনের নির্দিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক আরবি নিজেদের মাতৃভাষার মতো করে সাবলীলভাবে আয়ত্ত করতে পারে।

একজন মুস্তারেবিন এজেন্টকে মোট ১৩ থেকে ১৫ মাসের ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যার মধ্যে ৪ মাসই থাকে ভাষা এবং আচার-আচরণগত ট্রেনিং। প্রথম মাড়ে ৬ মাসের ট্রেনিং মূলত পদাতিক বাহিনীর ট্রেনিং, যা সব ধরনের সেনা কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক। এই ট্রেনিং প্রদান করা হয় আইডিএফের স্পেশাল ট্রেনিং সেন্টারের মিটকান অ্যাডাম আর্মি বেজে। তারপর দুই মাসের ট্রেনিং হয় কাউন্টার টেরোরিজম সংক্রান্ত। এ সময় তাদেরকে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক গঠন এবং সেগুলোতে বিচরণের পদ্ধতিও শেখানো হয়।

এরপরই শুরু হয় মুস্তারেবিন ট্রেনিং। এ পর্যায়ে আরবি ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে আরবদের মানসিকতা, পোশাক, চুলের স্টাইল সব কিছুর উপর ট্রেনিং দেওয়া হয়। সঠিকভাবে ছদ্মবেশ নেওয়ার জন্য তাদেরকে পরচুলা এবং কন্টাক্ট লেন্সও সরবরাহ করা হয়। ফিলিস্তিনিদের চোখকে নির্ভুলভাবে ফাঁকি দিতে সক্ষম হওয়ার জন্য এ সময় তাদেরকে মুসলমানদের মতো নামায-রোযা পড়াও শেখানো হয়। সর্বশেষ এক মাসের ট্রেনিং হয় বিভিন্ন ধরনের জটিল অস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি চালানোর ট্রেনিং।

দুই মুস্তারেবিন এজেন্ট এক ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করছে; Source: Reuters

ইসরায়েল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, গবেষক অ্যান্টয়েন শালহাতের মতে, মুস্তারেবিনদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত ফিলিস্তিনিদেরকে গ্রেপ্তার করা। তাদের অনেকগুলো ইউনিট আছে। সর্বপ্রথম মুস্তারেবিন ইউনিটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও অনেক আগে, ১৯৪২ সালে। এই ইউনিটটি ছিল ফিলিস্তিনে বসবাসরত তৎকালীন ইহুদী সম্প্রদায়ের মিলিশিয়া বাহিনী হাগানা, যা প্রধান বিভাগ পালমাকের অংশ। এই হাগানা মিলিশিয়া থেকেই পরবর্তীতে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের সৃষ্টি হয়েছিল।

প্রথম দিকে সৃষ্ট মুস্তারেবিনদের সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। কারণ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কিছুদিন পরপর, বিশেষ করে যখনই এই গোপন অপারেশনগুলো সম্পর্কিত কোনো সংবাদ প্রকাশ হয়ে পড়ে, তখনই এই ইউনিটগুলোকে বিলুপ্ত করে দেয় এবং পরবর্তীতে ভিন্ন নামে নতুন কোনো ইউনিট চালু করে।

শালহাতের মতে, মুস্তারেবিনদের সবচেয়ে পরিচিত ইউনিটগুলোর একটি হচ্ছে রিমন ইউনিট। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। এরা প্রধানত গাজা উপত্যকায় কার্যক্রম পরিচালনা করত। এছাড়া আশি-নব্বইয়ের দশকে শিমশন (ইউনিট ৩৬৭) নামে আরেকটি ইউনিট সক্রিয় ছিল, তবে ১৯৯৪ সালে অসলো শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ইসরায়েল তাদেরকে বিলুপ্ত করে। রিমন ইউনিট অবশ্য ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাজায় সক্রিয় ছিল।

মুস্তারেবিন এজেন্টরা আক্রমণ করছে ফিলিস্তিনিদের উপর; Source: Middleeastmonitor.com

মুস্তারেবিনরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল প্রথম ইন্তিফাদার সময় গাজা উপত্যকায়। কিন্তু পরবর্তীতে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর এই এজেন্টদেরকেও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে ও পূর্ব জেরুজালেমে নিযুক্ত করা হয়। পশ্চিম তীরে সক্রিয় ইউনিটগুলোর মধ্যে অন্যতম দুভদেভান (ইউনিট ২১৭)। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাক ১৯৮০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এটি এখনও পর্যন্ত সক্রিয় আছে।

মুস্তারেবিনরা ফিলিস্তিনিদের সাথে ছদ্মবেশে মিশে থাকলেও সাবধানতা অবলম্বন করলে মাঝে মাঝে তাদের উপস্থিতি বোঝা সম্ভব হয়। আল জাজিরার সাথে সাক্ষাৎকারে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গত ১৩ই ডিসেম্বরে আন্দোলনকারীরা যখন ইসরায়েলি সেনাদের দিকে পাথর মারাতে শুরু করার পরও প্রথমে তারা পাল্টা গুলি করেনি, তখনই তার সন্দেহ হয়েছিল, হয়তো মিছিলের ভেতরে ইসরায়েলের গুপ্তচর আছে বলেই তারা গুলি করছিল না। পরবর্তীতে ঠিকই মিছিল থেকে মুস্তারেবিনরা বেরিয়ে অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনিকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, পোশাক নির্বাচনের মাধ্যমেও সাবধানতা অবলম্বন করা সম্ভব। যেহেতু গুপ্তচরদেরকে তাদের অস্ত্র জামার ভেতরে লুকিয়ে রাখতে হয়, তাই তাদের পক্ষে প্যান্টের ভেতরে শার্ট প্রবেশ করিয়ে পরা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিরা সবাই যদি প্যান্টের ভেতরে শার্ট প্রবেশ করিয়ে পরে, তাহলে খুব সহজেই এই এজেন্টরা ধরা পড়ে যাবে।

মুস্তারেবিন এজেন্টরা আক্রমণ করছে ফিলিস্তিনিদের উপর @ ABBAS MOMANI / AFP

মুস্তারেবিনদের তৎপরতার কথা এর আগেও বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় এসেছিল। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফিলিস্তিন জুড়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ মিছিলে পুনরায় তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। গত ১৩ই ডিসেম্বর রামাল্লাহ শহরে এরকম একটি মিছিলে যখন এই ফিলিস্তিনি বেশী এজেন্টরা হঠাৎ করেই পিস্তল বের করে প্রতিবাদকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ তোরকমান এবং আব্বাস নোমানী সেই মুহূর্তের কয়েকটি দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে সক্ষম হন। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমে নতুন করে মুস্তারেবিনদের কথা উঠে আসতে শুরু করে।

ফিচার ইমেজ- MOHAMAD TOROKMAN / REUTERS