কিম পরিবারের রহস্যময় ট্রেনবহর

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে নিরাপত্তা প্রযুক্তির উপর ভরসা করে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধান যেখানে বিমানে করে দেশ থেকে দেশান্তর সফর করে বেড়ান, ঠিক তেমন সময়েই উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা এবং রাষ্ট্রপ্রধান কিম জং উন তার পূর্বপুরুষদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করে সাম্প্রতিক চীন সফরের জন্য বেছে নিলেন এক সাঁজোয়া ট্রেনবহর।

শুধু এই ভ্রমণই নয়, কিম জং উনের আগের উত্তর কোরিয়ার সাবেক দুই রাষ্ট্রনায়ক কিম জং ইল এবং কিম ইল সাং দেশের মধ্যে এবং বিদেশ ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করতেন আধুনিক প্রতিরক্ষা সুবিধাসমৃদ্ধ সাঁজোয়া ট্রেনবহর। সেই সুদূর অতীত থেকে কিম পরিবার সাধারণত আকাশপথের যেকোনো বিমান ভ্রমণ এড়িয়ে দেশে-বিদেশে ভ্রমণের জন্য বেছে নেন ব্যক্তিগত সাঁজোয়া ট্রেন বহর। এই ট্রেন বহর নানা আধুনিক সুবিধা এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভরপুর। আজ আমরা জানবো কিম পরিবারের রহস্যময় এই ট্রেনবহর এবং বিস্ময়কর সব রেল ভ্রমণ সম্পর্কে।

  •  ১৯৭৪ সাল; উত্তর কোরিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান কিম ইল সাং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য দীর্ঘ এক রেল ভ্রমণ শুরু করেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে নিজের ট্রেন বহরে করে তিনি একে একে পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো সফর করেন। চীন এবং রাশিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত এই ট্রেন যাত্রায় তিনিবিরতি নেন যথাক্রমে পোল্যান্ড, তৎকালীন পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়ায়। এই দেশগুলো সফর ছাড়াও তার ট্রেনবহর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশে যাত্রা বিরতি নেয়। দুটি বিশেষ ট্রেনের এই বহরের একটি ট্রেন ছিল কিম ইলের জন্য। অন্য ট্রেনটিতে ছিল রসদ এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
  • কোরিয়া যুদ্ধের সময়ে কিম ইল সাং একটি বিশেষ ট্রেনকে তার ‘কেন্দ্রীয় অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। তার যুদ্ধ পরবর্তীকালীন শাসনামলে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে ট্রেনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিম ইল তার যাতায়াতের জন্য গড়ে তোলেন এক বিশেষ রেল ব্যবস্থা। তার বিশেষ নিরাপত্তাবিশিষ্ট অন্ততপক্ষে ১৯টি প্রাসাদে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল ট্রেন।
  • উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কিম জং ইল বিমানে চড়তে ভয় পেতেন। কাজেই তিনি আকাশপথকে বিশেষভাবে এড়িয়ে চলতেন, তার যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল রেল ব্যবস্থা। দেশের মধ্যে কোনো সেনাস্থাপনা বা কারখানা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে অথবা কোনো দেশ সফরকালে তিনি নিজস্ব ট্রেন ব্যবহার করতেন। উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ১৯টি এমন স্টেশন আছে যেখানে এখনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য একটি বিশেষ রেল ব্যবস্থাপনা কাজ করে।

বিশেষ ট্রেন বহরে প্রেসিডেন্ট কিম জং ইল; Source: ABC News Australia

  • ২০০১ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং ইল একবার রাশিয়া সফর করেন। ঐতিহ্য এবং প্রথা অনুসারে এই সফরের জন্য তিনি বেছে নেন একটি বিশেষ ট্রেন বহর। অত্যন্ত বিলাসবহুল এই বহরে ২২টি বগি ছিল বলে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার জন্য এই বিশেষ ট্রেনে লবস্টার, বিদেশি ফল, বিদেশি ওয়াইনসহ যাবতীয় সব ধরনের সুযোগ সুবিধাই বিদ্যমান ছিল।
  • ২০১০ সালের এপ্রিলে মাসের দিকে চীনের সীমান্ত শহর ডাংডংয়ে একটি রহস্যময় ট্রেন হঠাৎ করেই গণমাধ্যমের নজরে পড়ে। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হয়তো চীন সফরে যাচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা  দেশেই আছেন। সেটা বিশেষ কোনো ট্রেন ছিল না, বরং ছিল একটি সাধারণ কার্গো ট্রেন।
  • আগস্ট, ২০১১; তৎকালীন নেতা কিম জং ইল তার ব্যক্তিগত ট্রেন বহর নিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং থেকে ৪,৫০০ কিলোমিটার দূরে রাশিয়ার উলান উদে শহর সফর করেন। এই সফরে কিমের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করা।
  • সম্প্রতি চলতি বছরের মার্চ মাসে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন তার পরিবার এবং বেশ বড় একটি কূটনীতিক দল নিয়ে চীন সফর করেন। এই সফর ছিল তার দেশের বাইরে প্রথম রাষ্ট্রীয় কোনো সফর। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে চীনের বেইজিং শহরে এই বিশেষ ট্রেন বহর দেখতে পাওয়া যায়। অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং আধুনিক সব সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন এই ট্রেন বহরে কিম জং এর সাথে তার স্ত্রী রি সল জু’র ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কিম তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে চীনকেই বেছে নেন।

সাম্প্রতিক চীন সফরে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম; Source: Medina-Gazette

আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা

উত্তর কোরিয়ার সাথে চীনের সরাসরি এবং রাশিয়ার সাথে পরোক্ষ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিগত ট্রেনগুলো অন্য স্বাভাবিক ট্রেনগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। নানা আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাবিশিষ্ট এই ট্রেনগুলোতে সাধারণত দুটি করে পাওয়ার ইউনিট থাকে। ২০০৯ সালে গণমাধ্যমে আসা খবর অনুসারে, কিম জং ইল ব্যক্তিগত ভ্রমণকালে ছয়টি ট্রেনের সাঁজোয়া বহর ব্যবহার করেন। এই বহরে ছিল প্রায় ৯০টি সুসজ্জিত এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাবিশিষ্ট রেল বগি। এই বিশেষ বহরে জরুরি যোগাযোগের আধুনিক সব ব্যবস্থা, যেমন- স্যাটেলাইট ফোন, জরুরি প্রয়োজনে ব্রিফিং সুবিধা, প্রতিরক্ষাসহ আমোদ প্রমোদের জন্য বিশেষ সব ব্যবস্থা ছিল।

ট্রেন বহরের প্রেসিডেন্ট বহনকারী ট্রেন; Source: ABC News Australia

  বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

২০০৪ সালে চীন সীমান্তের কাছে এক বিস্ফোরণের পর থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বাড়ানো হয়। গণমাধ্যমে খবর আসে, প্রেসিডেন্টকে বহনকারী ট্রেনবহরকে উদ্দেশ্য করে তেল এবং রাসায়নিক পদার্থ ভর্তি এক ট্রেন বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিশেষ ট্রেনটি যাওয়ার প্রায় তিন ঘন্টা পরের এই বিস্ফোরণে ট্রেনবহরের ট্রেনগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই ব্যক্তিগত ট্রেন বহরের গতিসীমা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার (৩৭ মাইল)। প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত এই বহর এখন তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে চলাচল করে।

  • বহরের প্রথম ট্রেনটি রেল লাইনের নিরাপত্তার দিকটি নিশ্চিত করে।
  • বহরের দ্বিতীয় ট্রেনটিই সাধারণত প্রেসিডেন্টকে বহন করে থাকে। এক্ষেত্রে, প্রথম ট্রেনটি থেকে এই ট্রেনটি ক্ষেত্রবিশেষে ২০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে থাকে।
  • বহরের তৃতীয় ট্রেনটিতে বিশেষ নিরাপত্তা অফিসার, নানা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অন্যান্য সফরসঙ্গী এবং প্রয়োজনীয় সব যোগাযোগ ব্যবস্থা মজুদ থাকে। এছাড়া এই ট্রেনে বিশেষ আদেশ, সংবাদ এবং ব্রিফিং প্রদানসহ যাবতীয় যোগাযোগের জন্য ফ্লাট পর্দার বিশেষ টেলিভিশন ব্যবস্থা থাকে।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ছবি; Source: ABC News Australia

উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতার কোনো ভ্রমণের চব্বিশ ঘণ্টা আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট রেললাইন বিশেষ নজরের মধ্যে রাখা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন নেতা কিম জং ইল দেশের অভ্যন্তরীণ এক সফর চলাকালীন সময়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ট্রেনেই মৃত্যু বরণ করেন।

বিশেষ গোপনীয়তা

উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের দেশের মধ্যে অথবা দেশের বাইরের যেকোনো ধরনের সফরের ক্ষেত্রে নেয়া হয় অত্যন্ত কঠোর সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সফর সংক্রান্ত কোনো খবর বা সময়সূচী পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় না। চীন এবং উত্তর কোরিয়ার কঠোর গণমাধ্যম নীতির কারণে এই ব্যাপারে কোনো সঠিক খবর পাওয়া খুবই দুরহ একটি বিষয়। সফর পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে কিছু সংবাদ প্রচারিত হলেও আগেভাগে প্রেসিডেন্টের সফর নিয়ে কোনো ধরনের সংবাদ প্রচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। প্রেসিডেন্টের বিশেষ ট্রেন বহরের যেকোনো ধরনের ছবি তোলাও নিষিদ্ধ রাখা হয়। এছাড়া, ট্রেন চলাকালীন এলাকাগুলো ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৯ সালের এক সফরের কথা বলা যেতে পারে। এই সফরে যেকোনো ধরনের ছবি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি ট্রেন বহর যখন সাইবেরিয়ার মধ্যে দিয়ে যায় তখন শহরবাসীকে রাস্তায় বের হতে নিষেধ করা হয়।

বেইজিংয়ের একটি স্টেশনে প্রেসিডেন্ট কিমের ট্রেন; Source: ABC News Australia

কিন্তু সাম্প্রতিক চীন সফরের ক্ষেত্রে এমন কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। কিমের ট্রেন বহর বেইজিং পৌঁছালে আধুনিক মোবাইল ফোনের বদৌলতে ট্রেনের কিছু ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া জাপানি মিডিয়ায় এই ট্রেন বহরের বিশেষ ভিডিও ফুটেজ প্রচারিত হয়। বর্তমান সময়ের শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এমন সফরের খবর চাপা রাখাটা আসলেই কঠিন একটি বিষয়।

বিশেষ ট্রেন বহর প্রদর্শনী

উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের অদূরে একটি সমাধিসৌধে প্রেসিডেন্ট বহনকারী এই বিশেষ ট্রেন বহরের একটি প্রতিরূপ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এই সমাধিসৌধে উত্তর কোরিয়ার জাতির পিতা  কিম ইল সাং এবং দেশটির পরবর্তী নেতা কিম জং ইলের সমাধি অবস্থিত।

 

ফিচার ইমেজ- ABC News Australia

Related Articles