রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর এখন যা যা হবে

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ২৫ বয়সে সিংহাসনে বসার পর কেটে গেছে সুদীর্ঘ ৭০টি বছর। এর মধ্যে ১৩ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ১৩ জন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব। এতগুলো উল্লেখযোগ্য ঘটনার স্রোতের সাথে তাল মিলিয়েও অপরিবর্তিত ছিলেন একজন; তিনি রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সিংহাসনে যাকে প্রায় সাত দশক ধরে দেখেছে গোটা বিশ্ববাসী। ৯৬ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্বজুড়ে। আসুন জেনে নেয়া যাক রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর কী কী হতে চলেছে সেই সম্পর্কেই।

Source: Perthnow.com

কী হবে এখন?

মৃত্যুর পর থেকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, পরবর্তী রাজার অভিষেকের মাঝের কমপক্ষে ১২ দিন পুরো ব্রিটেনে থমথমে ভাব বিরাজ করতে চলেছে। এই ঘটনার জের ধরে বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি ক্ষতি হবে ব্রিটিশ অর্থনীতির। শুধু তা-ই না, রানীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং তার পর পর অভিষেক- এই দু’দিনই জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হবে, যার কারণে বন্ধ থাকবে ব্যাংকের সকল লেনদেন, স্টক মার্কেট, সকল প্রতিষ্ঠান। আর তাতে গুণতে হবে বিলিয়নের উপর ক্ষতিপূরণ।

সুদীর্ঘ ৭০ বছর ধরে চলছে রানীর শাসনকাল; Source: Telegraph

আসলে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে এই ঘটনার ভয়াবহতার মাত্রা বোঝানো সম্ভব না। রানীর চলে যাওয়া এমনই অভূতপূর্ব কিছু হতে চলেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যা কেউ কোনোদিন দেখেনি। ছোটখাট অনেক পরিবর্তন ইতোমধ্যেই আসা শুরু হয়েছে- বিবিসি তার সমস্ত কমেডি শো বাদ দিয়েছে, প্রিন্স চার্লস খুব সম্ভবত তার পদবী পরিবর্তন করবেন, এমনকি ব্রিটেনের জাতীয় সংগীতে কথা পর্যন্ত বদলে যেতে পেরে! শুধু তা-ই না, রানীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ ভেঙেও যেতে পারে।

এর আগে প্রিন্সেস ডায়ানা এবং রানী মাতার মৃত্যুর পর পর পুরো ব্রিটেনে আছড়ে পড়েছিল শোকের ঢেউ। মানুষ হয়ে পড়েছিল হিস্টিরিয়াগ্রস্থ। কিন্তু রানী এলিজাবেথের চিরবিদায়ে পর হতে চলেছে অন্য মাত্রার কিছু।

রানীর দীর্ঘজীবিতায় মানুষ এতটাই অভ্যস্ত যে, যুক্তরাজ্যের বিশাল এক অংশ সারাজীবন ধরে রানীকে দেখে আসছে। তাই, তার মৃত্যুর অব্যবহিত পরের সময়টা অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তার সময়।

তরুণী রানী এলিজাবেথ; Source: Anglican.ink

আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগে এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। এরপর বিশ্ব খুব দ্রুত বদলে গেছে। তাই এখন কীভাবে সামলানো হবে সবকিছু, তা এখনো ধোঁয়াটে।

প্রথম প্রহর

বাকিংহাম প্যালেসের ভেতরে রানীর মৃত্যু সংক্রান্ত সাংকেতিক ভাষা ছিল ‘লন্ডন ব্রিজের পতন হয়েছে’ (London Bridge is down)। প্রাসাদের অধিকাংশ কর্মীকেই বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। 

প্রিন্সেস ডায়ানা পাশে তার স্বামী প্রিন্স চার্লস; Source: CNN

সারা পৃথিবীর মানুষ ইতোমধ্যেই এই ব্যাপারে জেনে গিয়েছে সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর বরাতে। বিবিসি চ্যানেল তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সমস্ত অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য টিভি চ্যানেলগুলোকেও যে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই- তবে অনেকেই করবে কেউ বলে না দিলেও।

বিবিসি’র ঘোষকরা এরকম পরিস্থিতির জন্য সবসময় তৈরি হয়েই থাকেন, যাতে হঠাৎ খবর জানার পর একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে না যান! কুইন মাদার এর মৃত্যু সংবাদ দেয়ার সময় বিবিসির ঘোষক পিটার সিজনস তোপের মুখে পড়েছিলেন, কারণ সেসময় তার পরনে ছিল লাল টাই। এরপর থেকে বিবিসি’র অফিসে কালো টাই আর স্যুট সবসময় মজুদ থাকে এরকম পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য। ফলে আজও যে রানীর মৃত্যু সংবাদে কালো টাই পরিহিত সংবাদপাঠকদের দেখা যাচ্ছে, তা না বললেও চলে।

সেকাল আর একাল; Source: Twitter.com

সব কমেডি শো সম্প্রচার বাতিল হয়ে যাচ্ছে

শেষবার, ১৯৫২ সালে যখন সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ যখন মারা যান, তখন বিবিসি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সব ধরনের কমেডি শো প্রচার বাতিল করে দিয়েছিল। এবারও রানী এলিজাবেথের বেলায়ও একই কাজ করতে চলেছে বিবিসি।

সিএনএন ইতোমধ্যেই রানীর জীবনকাহিনী নিয়ে ভিডিও তৈরি করে রেখেছে যেটা কিনা মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর দ্রুততার সাথে করা হবে। বাকি প্রধান প্রধান খবরের চ্যানেলগুলোও একইভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে যদি কর্মঘণ্টায় সংবাদটি পৌঁছায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের প্রটোকল মানবে সেগুলা সম্পর্কে নির্দেশনা আসবে শিল্প, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া অধিদপ্তর থেকে। তবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরে রানীর মৃত্যু নিয়ে সরকারের মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা এখনই আঁচ করা যাচ্ছে না।

প্রোক্লেমেশন ডে বাদে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরের দিনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে যেন এক জাতির সমস্ত শোক শুষে নিয়ে তার ভারে নুয়ে পড়েছে সেটা। গির্জার শান্ত সমাধিত ঘণ্টাগুলো বাজছে বিরতি দিয়ে দিয়ে।

অর্ধনমিত পতাকা; Source: The Sun

ব্রিটিশ রাজপরিবার সংক্রান্ত এত বড় একটা ঘটনা যে শুধু ব্রিটেনেই আলোড়ন তুলবে তা কিন্ত না। পুরো বিশ্বে প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে চলেছে একে কেন্দ্র করে। সব দেশে শীর্ষ খবর হিসেবে চলে এসেছে এটি। সারা বিশ্বের গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে সর্বশেষ অবস্থা। বিদেশে যুক্তরাজ্যের এতখানি প্রভাব শুধু কিন্তু দূতাবাসগুলোর জন্যই নয়,  রাজতন্ত্রের প্রাক্তন উপনিবেশগুলো এবং কমনওয়েলথ- যারা রাজদণ্ডের প্রতি বিশ্বস্ততায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং অন্যান্য ইংরেজি ভাষা জানা দেশগুলোর জন্যও।

Source: businessinsider.com

ব্রিটিশ রাজতন্ত্র একসময় দখল করেছিল পুরো পৃথিবীর চারভাগের একভাগই। সেই উপনিবেশগুলো এখন নেই সত্য। কিন্তু মানুষের মন থেকে প্রভাব এত সহজে মুছে যায় না। কোথায় যেন সেটার ছাপ এখনো রয়ে গেছে। রানীর সেসব প্রাক্তন প্রজার মনোযোগের কেন্দ্রে আছে এই সংবাদ।

প্রাসাদের অন্দরমহলে

বদ্ধ দরজার পেছনে লোকচক্ষুর অন্তরালে সেইন্ট জেমস প্যালেসে গঠিত হয়ে গেছে একটি উত্তরাধিকার কাউন্সিল, যারা ঠিক করবে এরপর রাজমুকুটটি কে পরতে যাচ্ছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে রানী এলিজাবেথের পুত্র প্রিন্স চার্লস হতে যাচ্ছেন পরবর্তী রাজশাসক। সবাই এটা ইতোমধ্যেই জানে, শুধু আনুষ্ঠানিকতাই বাকি!

রানী এলিজাবেথ, প্রিন্স চার্লস এবং প্রিন্সেস ডায়ানা; Source: popsugar.com

এই কাউন্সিলে থাকবেন প্রিভি কাউন্সিলরগণ, লর্ডস, লন্ডন সিটির লর্ড মেয়র, কয়েকটি কমনওয়েলথ দেশের হাইকমিশনারগণ প্রমুখ। এই কাউন্সিলের যে এই নতুন সম্রাটের অভিষেক আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে জানাতে হবে তা নয়- রানীর মৃত্যুর পরমুহূর্ত থেকেই প্রিন্স চার্লস ব্রিটিস সাম্রাজ্যের সম্রাট।

প্রিন্স চার্লসের উপাধি পরিবর্তন

প্রিন্স চার্লস এবং  বর্তমান স্ত্রী ক্যামিলা পার্কার; Source: wtop.com

কাউন্সিলে নতুন সম্রাট (প্রিন্স চার্লস খুব সম্ভবত) পার্লামেন্ট এবং চার্চ অব ইংল্যান্ডের কাছে তার আনুগত্য প্রকাশ করবেন, এবং তিনি হবেন চার্চের নতুন সুপ্রিম গভর্নর। তবে প্রিন্স চার্লসকে যে ‘কিং চার্লস’ হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। তিনি চাইলেই তার খ্রিস্টান নাম থেকে একটা পছন্দ করতে পারে। তাই, প্রিন্স চার্লস ফিলিপ আর্থার জর্জ যদি চান, তবে অভিষেকের পর তার নাম হতে পারে ‘কিং ফিলিপ’ অথবা ‘কিং আর্থার’ অথবা ‘কিং জর্জ’।

রানীর মরদেহ থাকবে জনসাধারণের সম্মান জ্ঞাপনের জন্য উন্মুক্ত

বাকি সব আনুষ্ঠানিকতার মাঝে চলতে থাকবে রানীর কফিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি। কিন্তু এর আগে, দুই পার্লামেন্ট হাউজ একসাথে বসবে নতুন সম্রাটের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপনের জন্য। তারা নতুন করে লেখা শপথ বাক্য পাঠ করবে এবং শোকজ্ঞাপন করবে। এরপর, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পর্যন্ত দুই হাউজই সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত থাকবে।

কফিন আনার এক ছোট্ট অনুষ্ঠানের পর রানীর মরদেহ ওয়েস্টমিনিস্টার হলে শায়িত থাকবে। তারপর থেকে, দিনে একটি ঘন্টা ব্যতীত বাকি সময় আপামর জনগণ তাদের শ্রদ্ধা জানাবে ফুল দিয়ে, রানীকে একনজর দেখে। এভাবে তিন দিন কেটে যাওয়ার পর রানীর শোকাহত প্রপৌত্রদ্বয় প্রহরীদের সরিয়ে নিজেরা কিছুক্ষণের জন্য পাহারায় থাকবেন রানীর কফিনের। একে বলে ‘ভিজিল অফ দ্য প্রিন্সেস‘ (Vigil of the Princes)। রাজা পঞ্চম জর্জের ক্ষেত্রেও একই রকম আনুষ্ঠানিকতা মেনে চলা হয়েছিল।

ওয়েস্টমিনিস্টার হলে রানী; Source: Flicker

প্রিন্সেস ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যুর পর মানুষ যেভাবে শোকাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল তা থেকে সহজেই অনুমেয় যে, রানীর বেলায় কেমন হতে যাচ্ছে মানুষের অনুভূতি। সেসময়, প্রিন্সেসের কফিনে সম্মান জ্ঞাপনের সময়, বাকিংহাম প্যালেসের বাহিরটা ছেয়ে গিয়েছিল ফুলে। অনুমান করা যায়, প্রায় দশ লক্ষ ফুলের তোড়ায় ডুবে ছিল প্রাসাদের আঙ্গিনা। মানুষ দশ ঘন্টার উপর লাইনে অপেক্ষা করে স্মারকগ্রন্থে স্বাক্ষর করে গিয়েছিল।

প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর এভাবেই ফুলে ফুলে ছেয়ে গিয়েছিল বাকিংহাম প্যালেসের প্রাঙ্গন; Source: The Sun

নক্ষত্রখচিত বিদায়

প্রায় ১২ দিন পর ওয়েস্টমিনিস্টার হলে শায়িত থাকার পর এবার আসবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পালা। একটা ক্যারিজে করে তার কফিন নিয়ে যাওয়া হবে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবিতে। রানীর মৃত্যুর পর সম্ভবত পুরো বিশ্ব সবচেয়ে জৌলুসময় তারকাখচিত শেষবিদায় দেখতে পাবে। বিশ্বের আনাচেকানাচে থেকে সরকার প্রধান, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আসবেন রানীকে বিদায় দিতে।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াটি পরিচালনা করবেন “আর্চবিশপ অফ ক্যান্টারবেরি”, জাস্টিন ওয়েলবি, যিনি কিনা ব্রিটেনের দ্বিতীয় প্রবীণ ব্যক্তি (রানীর পরে)। ডেইলি বিস্টের দেয়া তথ্যানুসারে, রানী নিজেও নাকি তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরিকল্পনাতে বেশ ভালভাবে যুক্ত!

একটি রাজকীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া; Source: Wikimedia

প্রিন্সেস ডায়ানার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সময় তার কফিন অ্যাবিতে নেয়ার মিছিল দেখতে রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ পথের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল একনজর দেখার পর। আর টিভিতে পুরো বিশ্বে বিলিয়নের উপর মানুষ দেখেছে পুরো আনুষ্ঠানিকতাটুকু। রানীর বেলায় ধরা যায় এর থেকে কম সাড়া পড়বে না, বরং প্রিন্সেসের সময়কার তুলনায় বেশিই হবে!

কোথায় হবে রানীর অন্তিমশয্যা?

রানীর কবর কোথায় হবে সেটা খুব সম্ভবত ঠিক করাই আছে। যদিও নির্দিষ্ট করে কোনো জায়গার কথা বলা যায় না, তবে সেটা স্কটল্যান্ডের স্যান্ড্রিংহাম কিংবা বালমোরালে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই দুটি জায়গাই রানীর একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি, রাজমুকুটের নয়।

অথবা তার প্রয়াত পিতা ষষ্ঠ জর্জের মতো তার শেষশয্যা সেইন্ট জর্জ চ্যাপেলেও হতে পারে।

সেইন্ট জর্জ চ্যাপেল; Source: Wikimedia

এরপর, অনেকদিন বাদে, প্রায় এক বছরের মতো সময় পর অনুষ্ঠিত হবে নতুন রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান। রূপকথার বইয়ে যেমন আমরা পড়ি, রাজার অভিষেকের দিন পথে পথে ছড়ানো হয় ফুল, মণ্ডামিঠাইয়ের বন্যা বয়ে যায়, মানুষ নেচে গেয়ে মেতে ওঠে নতুন আনন্দে- বাস্তবের সাথে খুব একটা ফারাক নেই কিন্তু সেটার। ব্রিটেনে অনেক অনেক দিন পর এমন একটা অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে যেখানে দিনের পর দিন অবিরাম চলবে উৎসব, পার্টি আর খুশির মিছিল। অবশ্য নতুন রাজা চার্লস চাইলে তাঁর অভিষেকের উৎসব সংক্ষিপ্ত করতে পারবেন।

তবে মনে হয় না চার্লস এতদিনের পুরনো ঐতিহ্যের ব্যত্যয় ঘটাবেন। সেই অভিষেক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হবে সেই একই ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবিতে। পরিচালনাও সেই একই মানুষ করবেন- আর্চবিশপ অফ ক্যান্টেরব্যারি।

১৯৫২ সালে রানী এলিজাবেথের অভিষেকে এমন সাজেই সেজেছিল ব্রিটেন; Source: flashback.com

পুরো অভিষেক অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে টিভিতে এবং অনলাইনে। দেশের সব আনাচে-কানাচে, রাস্তায় রাস্তায় পার্টি দেয়া হবে, যেমনটা হয়েছিল ২০১১ সালে কেট মিডেলটন আর প্রিন্স উইলিয়ামের বিয়ের পর। তাদের বিয়ের দিন যেহেতু সরকারী ছুটি ছিল, তাতে ব্রিটেনের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ১.২ বিলয়ন থেকে ৬ বিলিয়নের মতো। অভিষেক উপলক্ষেও যে এমনটাই হবে তা চোখ বন্ধ করে আন্দাজ করা যায়।

আরো ছোট ছোট বিষয়…

রানী মারা যাবে, তার পুত্র নতুন রাজা হবে- ব্যাস! তাতেই কি সব ফুরিয়ে গেল? জিনিসটা কি এতই সোজা?

আসলে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে যে কতকিছুর পরিবর্তন হবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। যেমন, জাতীয় সঙ্গীত। গানের কথার পরিবর্তন আসবে। রানীর বদলে গাওয়া হবে রাজার নাম। এরপর ধরা যাক, অর্থের কথা। রানীর মৃত্যুর সাথে সাথে শুরু হতে চলেছে নতুন মুদ্রা ছাপানো, যার গায়ে রানীর পরিবর্তে থাকবে নতুন রাজা চার্লসের ছবি। চার্লসের কোন ছবি বসানো হবে সেটা আগে থেকেই তোলা এবং বাছাই করা আছে।

রানীর ছবি সংবলিত পাউন্ড আর থাকবে না; Source: bbc.co.uk

যদিও রাতারাতি এই নতুন টাকাগুলো পুরনোগুলোকে সরিয়ে দেবে না। পুরো প্রক্রিয়া শেষে হতে লেগে যেতে পারে কয়েক বছর।

কমনওয়েলথের শেষ দেখতে যাচ্ছে পৃথিবী?

গভীরভাবে দেখলে, রানীর মৃত্যু আসলে কিছু পোস্টকার্ড কিংবা টাকা পরিবর্তনের চেয়েও বেশি কিছু। রাজনৈতিকভাবে এই মৃত্যুর প্রভাব হবে অপরিসীম। যেমন- কমনওয়েলথ ভেঙে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। ৫৩টি দেশের মিলিত এই সংঘে রয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশে থাকা ১৬টি দেশ, যাদের দেশের প্রধান কাগজে-কলমে এখনও ব্রিটিশ রাজপরিবার। এই ১৬টি দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, বারবাডোজ, নিউজিল্যান্ড, জ্যামাইকা প্রভৃতি।

কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো; Source: Wikimedia

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যে ছাইপাশ আজ অবশিষ্ট আছে, সেটা মূলত বাণিজ্যিক আর রাজনৈতিক এক প্রতিষ্ঠান, এর বেশি কিছু না। অতীতের সেই প্রতাপের প্রতিধ্বনিটুকুও যেন আজ নেই, দাঁড়িয়ে আছে কেবল মুকুটহীন রাজার মতো, মুকুট আছে বৈকি, তবে সেটা কেবল প্রতীকী। এ দেশগুলোর অধিকাংশই ইচ্ছের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের দাস হয়ে ছিল, প্রায় সবগুলোই বহুকাল আগে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে। রানীর চলে যাওয়ার পর এখন হয়তো এই দেশগুলো আরেকবার বিবেচনা করবে কমনওয়েলথে থাকার কথা।

যেমন, ধরা যাক অস্ট্রেলিয়ার কথাই। ১৯৯৯ সালে ইতোমধ্যেই একবার গণভোট হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক অস্ট্রেলিয়া’ হওয়ার ব্যাপারে। যদিও রিপাবলিকের সমর্থকরা খুব কম ব্যবধানের (৪৫%-৫৫%) ভোটে হেরেছিল, তবে এই ৫৫% ভোটের অনেকটাই এসেছিল মানুষের শুধুই রানীর প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা থেকে। রানীর মৃত্যুর পর এখন যদি এই ভোট আবার নেয়া হয়, তখন হয়তো পরিসংখ্যান উল্টে যেতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার গণভোট; Source: redditmedia

আবার ধরা যাক কানাডার কথা। রানীর মৃত্যুর পর এখন তারাও ভাবতে পারে কমনওয়েলথ ছেড়ে যাওয়ার কথা। অবশ্য এই সুতা ছেড়ার বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করছে রানী কোন সময় মারা যাচ্ছেন সেটার উপরও।

গণপ্রজাতন্ত্রী ব্রিটেন?

উপনিবেশগুলোর সাথে সাথে খোদ ব্রিটেনেও বইতে পারে রিপাবলিক হওয়ার হাওয়া। যদিও খুব শীঘ্রই ব্রিটেন রাজতন্ত্র থেকে বের হচ্ছে না, তবু দূর ভবিষ্যতে কী হতে পারে কে-ই বা জানে! যদিও রাজতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। একবারের জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭% মানুষ রিপাবলিক ব্রিটেনের পক্ষে, যেখানে প্রায় ৬৬% মানুষ তার বিপক্ষে।

নিকট ভবিষ্যতে ব্রিটেনের রাজতন্ত্র থেকে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ; Source: theroyalforum.com

সব মিলিয়ে গোটা বিশ্ব রানী ২য় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে, যার দেখা মেলেনি গত প্রায় ৬ যুগেও!

ফিচার ইমেজ: lgbtqnation.com

Related Articles