এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

অনেক যুগ ধরে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বলা হয়ে থাকে। যদিও অনেকের মতে, বর্তমানে চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিনপিং পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া কোনো সহজ কথা নয়। তবে ইতিহাসে এমনও একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও প্রেসিডেন্ট উভয় পদে কোনো নির্বাচন ছাড়াই মনোনীত হয়েছিলেন। আজকে আমরা জানবো কীভাবে আমেরিকার ৩৮ তম প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড এই দুটি পদ পেয়েছিলেন এবং প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার কাজকর্ম সম্পর্কে।

হোয়াইট হাউজে জেরাল্ড ফোর্ড; Image source: Wikimedia

১৯৫০ এর দশকের গোড়ার দিকে মিশিগানের রিপাবলিকান পার্টির নেতারা ফোর্ডকে মার্কিন সিনেটের পদ গ্রহণ করার আহ্বান করেন, যে পদকে সাধারণত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ফোর্ড সেটি গ্রহণ না করে বলেন, তার ইচ্ছা স্পিকার অফ হাউজ হওয়ার। তার মতে, স্পিকারের পদটি ঐ সময়ে তার জন্য সর্বোচ্চ অর্জন হবে। তিনি বলেন,

সেখানে উঠে ৪৩৩ জন ব্যক্তির প্রধান বক্তা হওয়ার এবং মানব ইতিহাসের সর্বোচ্চ আইনসভা সংস্থা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা অন্যান্য অর্জনের চেয়ে  অনেক বেশি। আমি মনে করি, আমি প্রতিনিধি পরিষদে থাকার পরে দু'বছরের মধ্যে আমি এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পেয়েছি।

তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালানোর পরেও ফোর্ড স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হন। অবশেষে, তিনি তার স্ত্রী বেটিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, স্পিকারের পদ থেকে যদি তাকে ১৯৭৪ সালে আবারও বাদ দেয়, তবে তিনি ১৯৭৬ সালে কংগ্রেস এবং রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর নেবেন।

ফোর্ড ও ফার্স্ট লেডি বেটি; Image source: CNN

তবে সেই অবসরের চিন্তা তো দূরে থাক, জেরাল্ড ফোর্ডই প্রথম ব্যক্তি যিনি কোনো পদে নির্বাচিত না হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট উভয় পদের দায়িত্বই পালন করেছিলেন।

১৯৭৩ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় তার ভাইস-প্রেসিডেন্ট স্পিরো অ্যাগ্নিউ গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে ট্যাক্স ফাঁকি এবং অর্থ পাচারের ফেডারেল অভিযোগের সাথে সম্পর্কিত ২৯,৫০০ ডলার ঘুষ গ্রহণের কারণে পদত্যাগ করেন। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫ তম সংশোধনীর ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে শূন্যতার বিধানে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নিক্সন তৎকালীন হাউস মাইনরিটি নেতা জেরাল্ড ফোর্ডকে অ্যাগ্নিউয়ের স্থলে মনোনীত করেন। অবশেষে ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭৩ সালে ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।

শপথ গ্রহণ করছেন ফোর্ড; Image source: History

তিনি যখন রাষ্ট্রপতি নিক্সনের মনোনয়ন গ্রহণ করতে রাজি হন, তখন স্ত্রীকে বলেছিলেন, ভাইস-প্রেসিডেন্সি তার রাজনৈতিক ক্যরিয়ারের জন্য চমৎকার বিদায় হবে। কিন্তু তারা তখনও জানতেন না, তার রাজনৈতিক ক্যরিয়ারের আরো অনেক কিছুই বাকি আছে।

জেরাল্ড ফোর্ড ভাইস প্রেসিডেন্টের কাজে যখন অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন, তখন গোটা জাতি ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারী উদ্ঘাটিত হতে দেখছিল। ১৯৭২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের সময় নিক্সনের কমিটিতে নিয়োগপ্রাপ্ত পাঁচজন সদস্যকে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিক্সনের প্রতিপক্ষ জর্জ ম্যাকগোভারের সাথে সম্পর্কিত তথ্য চুরি করতে ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির সদর দফতর ওয়াটারগেটে পাঠানো হয়েছিল।

১৯৭৪ সালের ১লা আগস্ট, কয়েক সপ্তাহের অভিযোগ ও অস্বীকারের পরে রাষ্ট্রপতি নিক্সনের চিফ অফ স্টাফ অ্যালেক্সান্ডার হাইগ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সাথে দেখা করে তাকে জানান, নিক্সনের ওয়াটারগেটের গোপন টেপ শক্ত প্রমাণ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। হাইগ ফোর্ডকে বলেন, টেপগুলোতে কথোপকথনের ফলে কোনো সন্দেহ নেই যে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওয়াটারগেটে তথ্যচুরির আদেশ দিয়েছেন এবং তাতে অংশও নিয়েছেন।

হাইগের সফরের সময় ফোর্ড এবং বেটি তাদের ভার্জিনিয়ার বাড়িতে ছিলেন, কারণ ওয়াশিংটনে ভাইস-প্রেসিডেন্টের বাসভবন সংস্কার করা হচ্ছিল। ফোর্ড তার স্মৃতিচারণগুলোতে পরে সেই দিনটির কথা বলেন এভাবে,

হাইগ আমাকে এসে বলেছিল, সোমবার একটি নতুন টেপ প্রকাশিত হবে এবং সেখানকার প্রমাণগুলো অস্বীকার করা অসম্ভব। সম্ভবত কোনো অভিশংসন বা পদত্যাগ হতে পারে।

তিনি আরও বলেন,

আমি আপনাকে কেবল সতর্ক করছি যেন আপনি প্রস্তুত থাকেন, এই বিষয়গুলো নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হতে পারে এবং আপনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।

পরে তিনি বেটিকে বলেছিলেন,

আমার মনে হয় না আমরা কখনও ভাইস-প্রেসিডেন্টের বাসায় থাকব।

অভিশংসন প্রায় নিশ্চিত অবস্থায় নিক্সন ১৯৭৮ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ানুসারে, ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

পদত্যাগের সময় নিক্সন;  Image sourc: Biography

হোয়াইট হাউজের পূর্ব কক্ষ থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত জাতীয় টেলিভিশন ভাষণে ফোর্ড বলেন,

আমি ভালো করেই জানি যে আপনারা আমাকে আপনাদের ব্যালট দ্বারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেননি এবং তাই আমি আপনাদের প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থনার সাথে আমাকে নিশ্চিত করার জন্য বলছি।

তিনি আরও যোগ করেন,

আমার সহকর্মী আমেরিকানরা, আমাদের দীর্ঘ জাতীয় দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। আমাদের সংবিধান কাজ করে; আমাদের মহান রিপাবলিক সরকার আইন-কানুনের, মানুষের নয়। এখানে জনগণ শাসন করে। তবে এখানে একটি উচ্চতর শক্তি রয়েছে, আমরা তাকে যে নামেই সম্মান করি, তিনি কেবল ধার্মিকতাকেই নয়, কেবল প্রেমকেই নয়, ন্যায়বিচার করেন, কিন্তু করুণার সাথে। আসুন আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সোনালী দিন ফিরিয়ে আনি এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ভালবাসা দ্বারা আমাদের সন্দেহ এবং ঘৃণার অন্তরকে শুদ্ধ করি।

ফোর্ডের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল। এই দম্পতি কখনও ভাইস-প্রেসিডেন্টের বাড়িতে না গিয়ে সোজা হোয়াইট হাউজে চলে যায়। প্রথম অফিসিয়াল কাজ হিসেবে ফোর্ড ২৫ তম সংশোধনীর দ্বিতীয় ধারা অনুশীলন করেন এবং নিউ ইয়র্কের নেলসন রকফেলারকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করেন। ২০ আগস্ট ১৯৭৪ সালে কংগ্রেসের উভয় হাউজই মনোনয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করার পক্ষে ভোট দেয় এবং ১৯৭৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর রকফেলার শপথ গ্রহণ করেন।

যখন জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি কেবল হোয়াইট হাউজেই অশান্তির মুখোমুখি হননি, বরং আমেরিকার জনগণের সরকারের প্রতি অনাস্থা ও অর্থনীতিতেও সংগ্রামে পড়েন। অনেক লোক বেকার ছিল, গ্যাস-তেলের সরবরাহ সীমাবদ্ধ ছিল, খাবার, পোশাক, আবাসনের মূল্য ছিল অনেক বেশি। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি প্রতিক্রিয়াও উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন।

এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ফোর্ডের অনুমোদনের হার বেশি ছিল। কারণ, তাকে সাম্প্রতিক প্রশাসনের জন্য নতুন বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। তিনি হোয়াইট হাউজে রূপান্তর সম্পন্ন হওয়ার সময় তার শহরের নিম্নস্তর থেকে কয়েকদিন ধরে রাষ্ট্রপতি পদে আসার মতো বিভিন্ন ছোট ছোট পরিবর্তন প্রতিষ্ঠিত করে এই পরিস্থিতিকে আরও জোরদার করেন। মূল কংগ্রেস কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি নীতিমালা তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন এবং তিনি হোয়াইট হাউজকে একটি বাসভবনের পরিবর্তে কর্মস্থল হিসেবে বেছে নেন।

১৯৭৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ফোর্ড প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে রাষ্ট্রপতি থাকাকালে যে সমস্ত অপরাধের অভিযোগ ছিল বা অংশগ্রহণ করেছিলেন সেজন্য পূর্ণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। অবিলম্বে, ফোর্ডের অনুমোদনের হার ২০ শতাংশের বেশি কমে যায়।

ফোর্ড ও জিমি কার্টার বিতর্কের সময়; Image source : businessinsider

এই ক্ষমার বিষয়টি অনেক আমেরিকানকে ক্ষুদ্ধ করেছিল কিন্তু ফোর্ড তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন, তিনি ঠিক কাজই করেছেন। ফোর্ড এক ব্যক্তিকে নিয়ে বিতর্ক পেরিয়ে দেশ পরিচালনায় এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পূর্বের প্রেসিডেন্টের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা ফোর্ডের পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এবং তিনি বিশ্বাস করেছিলেন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে দেশ ব্যস্ত থাকলে এ কাজ করা কঠিন হবে।

১৯৭৪ সালে জেরাল্ড ফোর্ড জাপান সফরকারী প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি হন। তিনি চীন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোতেও শুভেচ্ছা ভ্রমণ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনামে সাইগনের পতনের পরে ফোর্ড আমেরিকান সামরিক বাহিনীকে ভিয়েতনামে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানানোর মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন। যুদ্ধের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে তিনি অবশিষ্ট মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেযন এবং ভিয়েতনামে আমেরিকার উপস্থিতির ইতি টানেন।

ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছেন ফোর্ড; Image source : Vox

তিন মাস পরে, ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ে জেরাল্ড ফোর্ড ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে ইউরোপে সুরক্ষা ও সহযোগিতা বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নেন। মানবাধিকার রক্ষা এবং স্নায়ু যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে ৩৫টি দেশের সাথে যোগদান করেন। কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রসমূহ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি করার জন্য তিনি হেলসিংকি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

ফোর্ড পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তাতে হেরে যান। আমেরিকার জনগণ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং ওয়াশিংটন ডিসি-তে নবাগত জিমি কার্টারকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছিল।

হোয়াইট হাউজে অনেক নাটকীয়ভাবে প্রবেশ করলেও জেরাল্ড ফোর্ড তার অবিচ্ছিন্ন মধ্য-পশ্চিমা মূল্যবোধের মাধ্যমে সততা, কঠোর পরিশ্রম দিয়ে আমেরিকানদের সরকারের প্রতি তার বিশ্বাসকে পুনরুদ্ধার করেছিলেন। তবে নিক্সনের বিতর্কিত ক্ষমাপ্রাপ্তি তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত না করতে দেশটির জনগণকে প্রভাবিত করেছিল।

This Bengali article is about American politician Gerald Rudolph Ford Jr. He served as the 38th president of the United States.

Feature Image: m.media-amazon.com