সেন্ট্রালিয়া: অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে আগুনে জ্বলতে থাকা নরকের এক শহর

ভূতের গল্প বা সিনেমাতে হয়তো জ্বলতে থাকা শহর আমরা অনেকেই  দেখেছি। কিন্তু বাস্তবেও এমন একটি শহর আছে, যা প্রায় ৫৭ বছর ধরে আগুনে জ্বলছে। আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সে শহরটি কিন্তু জনমানবশূন্য নয়, এখনো সেখানে এগারোজন মানুষ বাস করে!

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া প্রদেশের অঙ্গরাজ্য পেনসিলভানিয়ার ছোট্ট এক শহর সেন্ট্রালিয়া। নানান রাজ্য কিংবা দেশ থেকে ভাগ্য যাচাই করতে ছুটে আসা হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত সেন্ট্রালিয়া

পেনসিলভানিয়ার ছোট্ট শহর ‘সেন্ট্রালিয়া’; Image source: Legends of America

সেখানকার মানুষের আয়ের মূল উৎস ছিল শহরের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কয়লা খনিগুলো। সেই সাথে শহরের সম্পূর্ণ জ্বালানির যোগানও দিত এই খনিগুলোই। ১৮৫৪ সালের রেলপথ বসানোর আগে পর্যন্ত একপ্রকার উপেক্ষিতই ছিল এই পুরো এলাকা। যদিও সেখানে মানুষের আনাগোনা শুরু সেই ১৮৩২ সাল থেকে। জনাথন ফাউস্ট নামের এক ব্যক্তি একটি সরাইখানা খোলেন যার নাম দেন “বুলস হেড”। সেই থেকে এই এলাকার নামও হয়ে যায় “বুলস হেড”। এর প্রায় দশ বছর পর সেখানে স্থায়ীভাবে মানুষ বসবাস করতে শুরু করে।

প্রথমদিকের সেই বাসিন্দাদের মধ্যে সবার আগে নাম আসে অ্যালেক্সান্ডার রে-এর। পেশায় তিনি ছিলেন খনি প্রকৌশলী। তাই কাজের খাতিরে আর ছোট একটা শহর গড়ে তোলার ইচ্ছা নিয়ে পরিবারের সাথে সেখানে থাকা শুরু করেন রে। তাঁর নিরলস চেষ্টায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে রাস্তাঘাট আর বেশ কিছু স্থাপনা। ধীরে ধীরে লোক সমাগমও বাড়তে থাকে, সেই সাথে বাড়তে থাকে কাজের পরিমাণ। শহরের নতুন নাম দেয়া হয় “সেন্টার-ভ্যালী”। কিন্তু নামের উপর আসলো ইউএস পোস্টের নিষেধাজ্ঞা। তাদের হিসাবে এই নামে অন্য শহর আগে থেকেই আছে। তাই ১৮৬৫ সালে নাম বদলে শহরের নতুন নামকরণ করা হয় সেন্ট্রালিয়া।

সবই ঠিকঠাকই চলছিল। ১৮৬০ সালের দিকে মলি মাগুইরস নামে পরিচিত এক গুপ্ত সংঘের আবির্ভাব হলো সেন্ট্রালিয়াতে। মূলত আয়ারল্যান্ড থেকে আসা খনি শ্রমিকদের মাধ্যমে সেন্ট্রালিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে এই সমিতির সদস্যরা। ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ডারলি বি জনসনের মতে, সে সময় শহরে ঘটে যাওয়া আলোচিত সব হত্যার সাথে এই মলি মারগুইস দলের সদস্যরা জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়। যাদের মধ্যে শহরের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্সেন্ডার রে এবং সেই অঞ্চলের প্রথম যাজকও ছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৭৭ সালে আইন রক্ষাকারী বাহিনী গুপ্ত সংঘের বেশ কিছু নেতাদের ধরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়ার পর সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

আয়ারল্যান্ড থেকে আসা খনি শ্রমিকের দল; Image source: History.com

এরপর বহু বছর সাধারণ এক শহরের মতোই চলতে থাকে সেন্ট্রালিয়ার জীবনধারা। বিশ্বযুদ্ধের কারণে সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়লেও কয়লাকেন্দ্রিক শহর হওয়ায় সেন্ট্রালিয়ার উপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। বিভীষিকার শুরু ১৯৬২ সালের মে মাসে। শহরের পৌরসভা থেকে প্রস্তাব করা হলো সেন্ট্রালিয়ার অন্যতম উৎসব “মেমোরিয়াল ডে” উপলক্ষে উৎসব শুরুর আগে শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হবে। বেশ কিছু আধুনিক সুযোগ সুবিধা সেন্ট্রালিয়ার জনগণ ভোগ করলেও আবর্জনা ফেলার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা তাদের ছিল না। তাই তারা কয়লা খনির কিছু পরিত্যক্ত শাখাকে ময়লার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করত, যার অবস্থান ছিল শহরের সীমানার ঠিক বাইরে, কবরস্থানের কাছে।

পৌরসভা থেকে ৫ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হলো ময়লা ফেলার এই জায়গাগুলো পরিষ্কার করার জন্য। পরিষ্কার বলতে, পৌরসভা আদেশ করে আগুনে পুড়িয়ে সব ময়লা-আবর্জনা ছাই করে ফেলবার জন্যে। আগুন যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যেতে পারে, সেজন্য এর চারদিকে কাদামাটির দেয়াল নির্মাণের কথাও বলে দেয়া হয় তাদের। কিন্তু লোকবল ও সময়ের অভাব এবং সেই সাথে হয়তো কিছুটা অনীহার কারণেই দেয়াল তৈরির কাজ সম্পন্ন না করেই আবর্জনা পোড়ানো চলতে থাকে। মতবিরোধ থাকলেও অনেকের মতে, পরিচ্ছন্নতার এই অভিনব উদ্যোগ থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। কারণ পুড়তে থাকা আবর্জনার জ্বলন্ত কণা বাতাসে উড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই জ্বলন্ত কণাই কয়লা খনির পরিত্যক্ত শাখা থেকে এর সাথে সংযুক্ত কয়লা বোঝাই শাখাতেও ছড়িয়ে যায়। দাহ্য কয়লায় একবার আগুন লেগে গেলে সে আগুন সব কিছু গ্রাস করে নিতে বেশি সময় নেয় না। আর সেখান থেকেই সেন্ট্রালিয়া পরিণত হতে শুরু করে জ্বলতে থাকা জীবন্ত এক নরকে।

পুড়তে থাকা সেন্ট্রালিয়ার দৃশ্য; Image source: forbes.com

প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লেও কেউই খুব বেশি আতঙ্কিত হয়নি। কিন্তু বেশ কয়েকবার প্রচেষ্টার পরেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে উৎকণ্ঠা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের শিখা কয়লাখনির শাখা থেকে মূল সুড়ঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। পুড়তে থাকা কয়লার ধোঁয়াতে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড নিঃসরণের ফলে সুড়ঙ্গে ঢুকে আগুন নেভানোর কাজ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

উপায় না দেখে কয়লা খনির মালিকরা খনি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। আগুনের শিখা শহরের নিচের কয়লার খনির অন্যান্য শাখাতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এ কারণে শহরের ভেতরেও তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। বাড়ির মাটির নিচের ঘরগুলোর ছিদ্রপথে বিষাক্ত গ্যাস প্রবেশ করতে শুরু করে। কারও কারও বাড়ির বেসিনের পাইপ দিয়েও গরম ধোঁয়া বের হতে থাকে। আতংক আর বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে শহরবাসী অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। প্রবল উত্তাপে শহরের রাস্তা ফেটেও কয়লার ধোঁয়া বের হতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে তাপমাত্রার প্রভাব পড়া শুরু হয় বিভিন্ন স্থাপনার উপর। বেশিরভাগ স্থাপনায় হয় ফাটল ধরে, নাহয় হেলে পড়তে শুরু করে। ১৯৭৯ সালে জন কডিংটন নামের এক পেট্রোল পাম্পের মালিক নিজের মাটির নিচের ট্যাঙ্কের তেলের হিসেব করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন তেলের তাপমাত্রা ১৭২ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এ উঠে গেছে। ১৯৮১ সালে ঘটে আরও মারাত্মক ঘটনা। টোড নামের ১২ বছরের এক কিশোর নিজের বাড়ির পেছনের উঠানে হাঁটতে বেরোলে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া গর্তের ভেতর পড়ে যায়। ভূগর্ভের সেই অংশ আগুনের কারণে সৃষ্টি হওয়া বিষাক্ত গ্যাসের চাপে সরে গিয়ে এই মরণফাঁদ তৈরি করে। গর্তটি উচ্চতায় ছিল প্রায় ৪ ফুট আর চওড়ায় ১৫০ ফুট। তাৎক্ষণিকভাবে টোডের এক ভাই তাকে গর্ত থেকে টেনে তোলায় এ যাত্রায় বেঁচে যায় সে।

 সৃষ্ট আগুনের ভয়াবহতা; Image source: forbes.com

আগুনের কারণে সৃষ্ট এই বিপদ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরে শহরের মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে শহরের সুরক্ষার বিষয়ে। ১৯৮৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে শহরবাসীদের স্থানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বেশিরভাগ শহরবাসী এ প্রস্তাবে রাজি হলেও কিছু মানুষ সেখান থেকে চলে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রায় ১০০০ মানুষ শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় এবং শহরের প্রায় ৫০০ স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। ১৯৯০ সাল নাগাদ শহরের জনসংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৫০। ১৯৯২ সালে পেনসিলভানিয়ার গভর্নর শহর পুরোপুরি খালি করতে এবং বাকি স্থাপনাগুলোও ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিলেও শহরবাসীর তৈরি করা আইনি জটিলতায় সেটা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৩ সালে অন্য সব শহরের সাথে যোগাযোগ রক্ষার প্রধান সড়ক ‘রুট ৬১’ থেকে সেন্ট্রালিয়ার অংশ বন্ধ করে দেয়া হয়। এবং ২০০২ সালে ডাক বিভাগ থেকে সেন্ট্রালিয়ার জন্য বরাদ্দ পোস্ট কোড (১৭৯২৭) বাতিল করা হয়।

সেন্ট্রালিয়াকে বাঁচানোর চেষ্টা গত অর্ধশতকে বহুবার করা হলেও অসীম এই আগুনের শুরু আর শেষ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ, সেন্ট্রালিয়া শহর আর এর আশেপাশের পুরো এলাকা জুড়েই ছড়িয়ে আছে কয়লাখনির অসংখ্য শিরা উপশিরা। কয়লা বোঝাই এই সুরঙ্গগুলোর কোনটিতে যে আগুনে এখনো জ্বলছে তা খুঁজে পাওয়া নেহায়েতই অসম্ভব। তাই সেন্ট্রালিয়া শহর আজও জ্বলছে। পরিবেশ সংরক্ষণ অধিদফতরের হিসেব অনুযায়ী, এ আগুন আরও শত বছর পর্যন্ত জ্বলার সম্ভাবনা রয়েছে যদি না একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

গ্রাফিতি রোড; Image source: forbes.com

বর্তমানে সেন্ট্রালিয়া পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় এক স্থানে পরিণত হয়েছে। শহরের ভেতর এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ঘরবাড়ি, গির্জা কিংবা সময়ের সাথে লড়াই করে হেরে যাওয়া স্থাপনার অংশ বিশেষ বেড়াতে আসা পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ায়। রুট ৬১ এর বন্ধ করে করে দেয়া অংশও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ। এই রাস্তায় আঁকা হয় অদ্ভুত সুন্দর সব আলপনা, সে কারণে এই রাস্তার নামই হয়ে গেছে আলপনার সড়ক (গ্রাফিতি রোড), যদিও নরকের সড়ক নামেও ডাকা হয় এ রাস্তাকে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মাটির নিচে জ্বলতে থাকা কয়লার ধোঁয়ায় রাস্তায় তৈরি হয় ঘন কুয়াশার। মনে হয়, রূপকথা থেকে সত্যি উঠে এসেছে নরকের কোনো শহর!

This Bengali article is about the city named ' Centralia.' which has been abandoned for almost 60 years. An underground coal fire has raged for 57 years in Centralia, Pennsylvania, that turns it almost into a ghost town.

Featured Image: slate.com

 

Related Articles