এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

[১ম পর্বের পর থেকে]

এ বছরের ৩১ মার্চ চীনের শেনঝেনে ২০১৯ সালের নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে হুয়াওয়ে। গতবছর এর গ্রাহক ব্যবসা থেকে বিক্রয় আয় প্রায় ৬৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, অন্যান্য বছরের চেয়ে যা প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি। আয়ের পাশাপাশি কোম্পানিটি গত বছর মোট মুনাফা করেছে ৮ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও গবেষণার লক্ষ্যে চলমান কর্মকাণ্ডের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৯ সালে অর্জিত রাজস্বের প্রায় ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ হুয়াওয়ে বিনিয়োগ করেছে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। এ নিয়ে গত এক দশকে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় করা মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮৪ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

হুয়াওয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কারণ আসলে কী- তা নিয়ে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক প্রতিষ্ঠানের দেশগুলো অনেক তথ্য বের করার চেষ্টা করেছে। এরমধ্যে গত কয়েক বছর বেশ কয়েকটি ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত হয়েছে। ২০১৮ এর ডিসেম্বরের ১ তারিখ কানাডা থেকে গ্রেফতার করা হয় হুয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (CFO) মেং ওয়ানঝু’কে। যিনি হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেইর মেয়ে। যুক্তরাষ্ট্র তাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানায় এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে- তার প্রতিষ্ঠান ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে 5G প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ বিক্রি করছে। আর এতে সত্যিকারভাবে দোষী প্রমাণিত হলে তার ত্রিশ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।

“আটকের পরিণতি যাই হোক না কেন। এটি এই বার্তা দিচ্ছে- চীনারা বুঝতে পারছে যে তাদের বিরুদ্ধে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়েছে,”

মন্তব্যটি করেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বেলফার সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক গ্রাহাম আলিসন। এদিকে মেংকে আটকের পাল্টা জবাবে চীন দু’জন কানাডীয় নাগরিককে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টার অভিযোগ আনে। বিশ্লেষকদের মতে হুয়াওয়েকে নিয়ে যা হচ্ছে সেটি যুক্তরাষ্ট্র করছে চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য। কারণ হুয়াওয়ে চীনকে শক্তভাবেই বিশ্বে উপস্থাপন করছিল। এরপর ২০১৯ এর এপ্রিলের ৪ তারিখে আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়- হুয়াওয়ে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে নিচ্ছে এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য এবং প্রমান আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ মে ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্র অফিসিয়ালি হুওয়াওয়ে কে ব্লাকলিস্ট করে। এবং তার ঠিক ৩ দিনের মাথায় গুগল (Google) ঘোষনা করে যে তারা হুয়াওয়কে আর এন্ড্রয়েড সেবা প্রদান করবে না। এছাড়া ঐ বছরেরই ২২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (FCC) একটি আদেশে আমেরিকার গ্রামীণ অঞ্চলে ক্যারিয়ার নেটওয়ার্ক সরবরাহকারীদের প্রতি হুয়াওয়ে ত্থেকে সরঞ্জাম ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এফসিসি’র এই আদেশটি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কতটা ক্ষতি করবে, সে বিষয়ে ২১ বার বিস্তারিত মন্তব্য জমা দিয়েছে হুয়াওয়ে। কিন্তু সবগুলোই উপেক্ষা করে গেছে এফসিসি- এমনটা জানিয়েছেন হুয়াওয়ের চিফ লিগাল অফিসার ড. সং লিউপিং। তিনি আরো বলেন,

“গোটা আমেরিকার গ্রামাঞ্চল এমনকি- মন্টানা, কেন্টাকির মতো ছোট শহরের ক্যারিয়ার নেটওয়ার্ক সরবরাহকারী এবং হুয়াওয়ের ফার্মগুলোও হুয়াওয়ের সাথে কাজ করে, কারণ তারা হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতির গুণমানের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সংযুক্ত করার এই যৌথ প্রচেষ্টা বন্ধ করা এফসিসি’র উচিত হবে না।”

যদিও হুয়াওয়ে চীনের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু হুয়াওয়ের কারণে বিশ্বে চীনের এই আধিপত্যের পেছনে রাষ্ট্রীয় কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা নিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি করে। ডিসেম্বরে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন সরকার গত দুই দশকে হুয়াওয়েকে ধাপে ধাপে ৭৫ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে হুয়াওয়ে এক টুইট পোস্টে বলেছে, মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ অসত্য খবর প্রকাশ করেছে। এ খবরের মাধ্যমে রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্টে আমাদের ৩০ বছরের বিনিয়োগকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

শর্ত মেনে চললে সব চীনা কোম্পানিই সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি পায়। গত কয়েক দশকে হুয়াওয়ে মোট আয়ের ০.৩ শতাংশ ভর্তুকি পেয়েছে। তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, চীন সরকার তাদেরকে ৪৬ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে ক্রেডিট লাইন, লোন ও অন্যান্য সহায়তার নামে। এছাড়াও সরকারি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ায় ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হুয়াওয়েকে ট্যাক্স  দিতে হয়নি। এই ট্যাক্সের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ডলার। আরও দুটি খাতে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের সুবিধা পেয়েছে হুয়াওয়ে। সংবাদ মাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, এসব সুবিধা পাওয়ার ফলে হুয়াওয়ে গ্লোবাল টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি হিসেবে শীর্ষে পৌঁছাতে পেরেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চায়নার ‘হুয়াওয়ে’ কোম্পানির এই দ্বন্দ্ব আসলে সাম্প্রতিক সময়ে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ইঙ্গিত করে। এ যুদ্ধকে অনেকেই ৩য় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন “যুক্তরাষ্ট্রের বাজার চীনের কাছে খুলে দেওয়াটা ছিল মারাত্বক ভুল।”  এর পেছনে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৮০০ বিলিয়ন ডলার। এই বাণিজ্য বৈষম্য দূর করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাতারাতি চীনা পণ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলার ট্যাক্স আরোপ করেন। চীনও পাল্টা ৬০ বিলিয়ন ডলার ট্যাক্স আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে। এর ফলে বছরখানেক ধরে চলতে থাকা কূটনৈতিক যুদ্ধ বাণিজ্য যুদ্ধে রূপ নেয়।

শুধু ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর শুল্ক আরোপ নিয়ে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিযুদ্ধও শুরু হয়ে যায়, যার চাক্ষুষ প্রমাণ আগেই দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রয়টার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন,

“হুয়াওয়ে আমাদের মিলিটারি এবং নিরাপত্তা সংস্থার জন্য একটা বড় হুমকি। হুয়াওয়ের সাথে তাই ব্যবসায়িক সম্পর্কে আমরা জড়াতে চাচ্ছি না। যদিও চীনের দিক থেকে আমরা বিবেচনা করতে পারি, কিন্তু হুয়াওয়ে আলোচনা করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান নয়।”

তিনি আরো ইঙ্গিত করেন, চীনের উপর বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংক্রান্ত বড় ধরনের জরিমানা আরোপ করা হতে পারে। এমনকি তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন বক্তৃতায় আইপি ঠিকানা (IP Address) চুরির প্রসঙ্গটি এসেছে। যদিও হুয়াওয়ের ব্যাপারে এরকম তথ্য পাচারের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৮’তে North Atlantic Treaty Organization (NATO) এর এক রিপোর্টে বলা হয়-

“5G প্রযুক্তির শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে হুয়াওয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চীনের সামরিক বাহিনী তাদের গুপ্তচরবৃত্তি, বৈদেশিক সরকার ও কর্পোরেশনগুলোর প্রতি নজরদারিতে কাজে লাগাতে পারে। বিশ্বব্যাপী হুয়াওয়ের এই একচেটিয়া বাণিজ্যের মাধ্যমে আসন্ন সাইবার হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে এই প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে- 5G এর উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে বিনোয়গের ব্যাপারে মার্কিং যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য যেন চীনের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি পুনর্বিবেচনা করে।” 

এ আশঙ্কাকাকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কী হতে পারে- সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম রাইনস বলেছেন, ‘সব প্রশাসনের হাতেই বিভিন্ন সুযোগ থাকে, চরম থেকে মাঝারি— যেকোনো পদক্ষেপই সে নিতে পারে। পার্থক্য হচ্ছে, এই প্রেসিডেন্ট চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতেই বেশি আগ্রহী।’ ব্যাপারটা হলো, মার্কিন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চীনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি অনেক দিন ধরেই দেশটির মাথাব্যথার কারণ। এর যেমন নিরাপত্তাজনিত কারণ আছে, তেমনি অর্থনৈতিক কারণও আছে। আইপি চুরির মধ্যে আছে নকল পণ্য ও পাইরেটেড সফটওয়্যার বিক্রি— এই বাবদ মার্কিন কোম্পানিগুলোর বছরে ২২ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৬০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে।

মার্কিন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি বিষয়ক কমিশনের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। চীন যখন নিম্ন প্রযুক্তি থেকে উচ্চ প্রযুক্তির যুগে অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে চাইছে এবং অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করতে চাইছে, তখন এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফেলো এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশের বাণিজ্য উপদেষ্টা ফিল লেভি বলেছেন,“চীন এ ব্যাপারে ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে যে তার পক্ষে কম দামের পণ্য বানিয়ে আর টিকে থাকা সম্ভব হবে না।” ২০১৫ সালে চীন রাষ্ট্রীয় শিল্প পরিকল্পনা ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’-এ প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।

Image: hochhaus-schiffsbetrieb.jimdo.com

তারা যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছিল সেগুলো হচ্ছে ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদন ও পঞ্চম প্রজন্মের (5G) প্রথম মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরি করা। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) জগতে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। একই সঙ্গে তারা কম্পিউটার চিপ তৈরির সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে চীনকে শিল্প ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়াতে হবে। আর সে কারণেই তারা অন্য দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আহরণের ব্যাপারে আগ্রহী।

২০১৫ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে আশ্বস্ত করলেন যে চীন আর করপোরেট গোপনীয় তথ্য চুরি করবে না, তখন এটি এত বড় সমস্যা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনে ব্যবসা করার জন্য কোম্পানিগুলোকে এখন সেখানে প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আসলে চীনে যারা ব্যবসা করতে চায়, তাদের স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজ করতে হয়। এই অংশীদারির কারণে চীনা কোম্পানিগুলো বিদেশি কোম্পানির এমন অনেক তথ্য পেয়ে যাচ্ছে, যা গোপন রাখা হতো। এ ব্যাপারে ২০১৭ সালে চীন নতুন এক আইন করে পাস করে- National Intelligence Law of the People's Republic (Adopted at the 28th meeting of the Standing Committee of the 12th National People's Congress on June 27, 2017)  এর ৭ নাম্বার আর্টিকেলে বলা হয়-

“Any organization or citizen shall support, assist and cooperate with the state intelligence work in accordance with the law, and keep the secrets of the national intelligence work known to the public.”

ফলে এই নতুন আইন আর গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসের কারণে জাতীয় অবকাঠামোয় চীনের দুই টেলিকম হুয়াওয়ে আর জেডটিই (ZTE) কোম্পানির প্রযু্ক্তি ব্যবহার অনেক দেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত এই আইনের পর শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র নয়, অস্ট্রেলিয়াও তাদের দেশের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর 5G নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউটের ইন্টারন্যাশনাল সাইবার পলিসি সেন্টারের গবেষক টম উরেন বলছেন,

“তথ্য চুরির ব্যাপারে চীনের সরকারের চেষ্টার ব্যাপারটি অনেকদিন ধরেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। অনেক সাইবার বা বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য চুরির ঘটনার সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রযন্ত্র জড়িয়েছিল।”

উরেন আরো বলছেন, “চীনের সরকার আর দেশটির অনেক কোম্পানির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই সন্দেহ আরো বেড়েছে যে, তাদের গুপ্তচরবৃত্তিতে সরকার সমর্থিত এসব কোম্পানি সহায়তা করে থাকতে পারে।” কানাডাও হুয়াওয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পর্যালোচনা করে দেখছে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নিউজিল্যান্ড হুয়াওয়ে থেকে সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। 5G নেটওয়ার্কে ব্যবহারের জন্য নিউজিল্যান্ডের একটি কোম্পানি হুয়াওয়ে থেকে সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু দেশটির সরকার বলছে, এই চুক্তির ফলে বড় ধরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ব্রিটেন এখনো পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু যু্ক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ব্রিটেনের ওপর চাপ রয়েছে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। হুয়াওয়ের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলে ব্রিটেনের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা তুলে নেওয়া হবে বলে হুমকি দেয় ট্রাম্প সরকার। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে অর্ক্সফোর্ড ইউনিয়নের এক বক্তৃতায় হোয়াইট হাউজ কর্মীদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মিক মালভেনে বলেন,

আমরা প্রচণ্ডরকম উদ্বিগ্ন যে- আমাদের (যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য) তথ্যসমূহের অখণ্ডতা, তথা নিরাপত্তা আমাদের কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার আর সিস্টেমগুলো সাথে জড়িত থাকে। আপনারা যদি এর মধ্যে হুয়াওয়ে'কে জড়াতে চান, তাহলে ভবিষ্যতে আপনাদের সাথে আমাদের তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ এবং নাটকীয় প্রভাব পড়বে। এবং এটাই শেষ কথা।”

ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করেছে যে হুয়াওয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ব্রিটেনের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার সম্প্রতি হুয়াওয়েকে অনুরোধ করেছে ব্রিটেনের টেলিকম নেটওয়ার্কে যেসব সমস্যা/ঝুঁকি তৈরি করছে সেগুলো ঠিক করতে। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স সংস্থা এমআই-সিক্সের প্রধান আলেক্স ইয়াংগার সামনে অনেক সিদ্ধান্ত নিবে হবে বলে জানিয়েছেন। কারণ যে 5G নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে নিরাপত্তার বিষয়গুলো মনিটর করা অনেক কঠিন হবে। কিন্তু সর্বশেষ তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে উপেক্ষা করে দেশের অভ্যন্তরে ‘কোর নেটওয়ার্কিং’ এর অংশগুলো ব্যক্তিরেকে ‘নন-কোর নেটওয়ার্কিং’ এর জন্য ৩৫% হুয়াওয়ে কিটের সরবরাহকে স্বীকৃতি দেবে বলে জানিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

মার্কিন সিনেটর টম কটন টুইটার বার্তায় একে স্নায়ুযুদ্ধের সময় কেজিবি (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা)-র কাছে টেলিফোন নেটওয়ার্ক তৈরির সাথে তুলনা করেন! এছাড়া জার্মানি, পোল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস হুয়াওয়েকে ভবিষ্যতের টেলিকম নেটওয়ার্কগুলিতে ভূমিকা রাখার দিকে ঝুঁকছে। ফরাসী সরকার গত নভেম্বরে নিশ্চিত করেছে যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুসরণ করছে না এবং হুয়াওয়েকে তার 5G নেটওয়ার্কের জন্য চুক্তি থেকে বাদ দিতে অস্বীকার করেছে। ইউরোপভুক্ত দেশগুলোর এই অবস্থানের পেছনে ট্রাম্প সরকারের প্রভাবহীনতাকে আমেরিকার অনেক রাজনীতিবিদ চরম ব্যর্থতার দৃষ্টিতে দেখছেন। আমেরিকার হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সাবেক স্পিকার নিউট গিংরিচ একে বলেছেন,

“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরাজয়।”

হুয়াওয়ের উপর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের এই নিষেধাজ্ঞা তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে যেমন একটা সংকটের সৃষ্টি করেছে, তেমনিভাবে করোনা ভাইরাসের কারণে গোটা বিশ্বের শিল্পবাণিজ্যে পড়ছে বহুবিধ প্রভাব। সামগ্রিকভাবে বহির্বিশ্বের প্রভাব আর করোনার চাপ সামলাতে হুয়াওয়ে কতটুকু প্রস্তুত এই মুহূর্তে, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আইটি পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা মহামারী কোনোটাই আমাদের উপর বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আমরা বিশ্বাস করি, যেটুকু প্রভাব পড়েছে- সেটাই সর্বনিম্ন এবং এটুকু আমরা উৎরে যেতে পারব। এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় বিশ হাজারের অধিক বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ এবং ইঞ্জিনিয়ার তাদের নবর্ষের ছুটিতে অতিরিক্ত সময় কাজ করেছে। কারণ আমরা নতুন এমনকিছু প্রযুক্তি তৈরি করছি, যা ভবিষ্যতে প্রযুক্তিবিশ্বে আমাদেরকে আগিয়ে রাখবে। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকা আসলে কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, চ্যালেঞ্জ হলো শীর্ষ অবস্থানটিকে ধরে রাখতে পারা। যদি আমরা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রযুক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী তিন কিংবা পাঁচ বছর পর আমরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারব না।”

রেন ঝেংফেই-এর বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, হুয়াওয়ে অবকাঠামোগত এবং কৌশলগতভাবে প্রস্তুত এই মহামারি এবং বাণিজ্যযুদ্ধে তাদের সংকট মোকাবেলা করতে। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ও নেটওয়ার্কিং-এ প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলা সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। যেমন: গতবছর মে মাসে গুগল যখন হুয়াওয়ের এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার তিনমাস পরেই হুয়াওয়ে ‘হারমনি’ নামে নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম উন্মুক্ত করে। এ থেকে বোঝা যায়, অনেক আগে থেকে হুয়াওয়ে তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছিল।

২০১৮ সালে প্রকাশিত উইয়ার্ড ডট কমের এক আর্টিকেল থেকে জানা যায়, হুয়াওয়ে সে সময়ই আশঙ্কা করেছিল ভবিষ্যতে আমেরিকা তাদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াবে। এবং সেক্ষেত্রে তাদের প্রথম প্রস্তুতি ছিল একটা নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা। যা গুগলের এন্ড্রয়েড, এমনকি অ্যাপলের আইওএসের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এছাড়াও তারা ইঙ্গিত দেয় নিজস্ব চিপ ইন্ড্রাস্ট্রি তৈরির। এই সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন,

“They [U.S] have awoken a dragon, this is a big-boy game! আমরা এমনকিছু চিপসেট (কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার) তৈরি করব, যা এর আগে তৈরি করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু বর্তমানে চীন এই ইন্ডাস্ট্রি এত দ্রুততর সময়ে তৈরি করবে, যা কেউ চিন্তাও করতে পারবে না।”

সুতরাং ভূ-রাজনৈতিক চাপ কিংবা করোনার মতো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারীর কারণে হুয়াওয়ের বাণিজ্যকৌশল পুরোপুরি স্থবির হয়ে যাবে, এমন ভাবাটা বোকামি। ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব স্মার্টফোন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অ্যাপল সতর্ক করে দিয়েছে যে কারখানার শাটডাউন ও স্টোর বন্ধ হওয়ার কারণে এটির আয় উপার্জন ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম ফোন প্রস্তুতকারক সংস্থা স্যামসাং বর্তমানে প্রায় অর্ধেক উত্পাদন ভিয়েতনামে স্থানান্তরিত করেছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত এর ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম। তবে চীনের বৃহত্তম ফোন প্রস্তুতকারক আশ্চর্যজনকভাবে- কেউ কেউ অবিশ্বাস্যরূপে বলেছেন- করোনাভাইরাস প্রভাব সম্পর্কে তারা আশাবাদী। হুয়াওয়ের একজন রিসার্চ পার্টনার নেইল শাহ বলেন,

“চীনে লকডাউন শুরু হওয়ার কারণে হুয়াওয়ে জানুয়ারির শেষ ১০ দিন উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছিল। এবং এর অনলাইন কৌশলও বাড়ানো হয়েছে। মার্চে টিকে থাকার জন্য হুয়াওয়ের পর্যাপ্ত স্টক রয়েছে এবং ইতিমধ্যে চীনে স্মার্টফোনের বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।”

আবার বিজনেস ইনসাইডারে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুয়াওয়ের ক্যারিয়ার বিজনেসের প্রেসিডেন্ট রায়ান ডিং বলেন, “আমরা এখনো প্রতিদিন লাভ-ক্ষতির হিসাব নিকাশ করছি। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, আগামী তিন কিংবা ছয়মাসে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।” বর্তমানে চীনে করোনার প্রভাব অনেকটা কমে যাওয়ায় হুয়াওয়ে তার উৎপাদন ক্ষমতার ৯০ ভাগ আবার চালু করতে পেরেছে। করোনার মূল প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল হুবেইয়ের বাইরে হুয়াওয়ের কোনো কর্মচারী ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক।

তারা এ মুহূর্তে করোনা আক্রান্ত দেশে এবং এর পার্টনারদের কাছে বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক গিয়ার, তথা মাস্ক, টেস্ট কিট, পিপিই ইত্যাদি সরবরাহের দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। এতে বহির্বিশ্বে হুয়াওয়ে তথা চীনের উপর রাষ্ট্রগুলোর আস্থা বাড়ছে। তাছাড়া এখন অধিকাংশ মানুষ লকডাউনে থাকায় স্যোসাল মিডিয়ার অ্যাপগুলোতে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে। করোনায় লকডাউনের ফলে ফেসবুকে আগের তুলনায় ৭০% বেশি সময় ব্যয় করছে ইতালির মানুষ। ফলে সেসব এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট চালু রাখতে কাজ করতে হচ্ছে নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। হুয়াওয়ের মালিক এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, “এই চাহিদা আমাদেরকে পূরণ করতে হবে।”

[পরবর্তী পর্ব দেখুন এখানে]

তথ্যসূত্র:
১। https://www.wired.com/story/us-feds-battle-against-huawei/?itm_campaign=BottomRelatedStories_Sections_4
২। https://www.nytimes.com/2020/03/27/business/china-coronavirus-masks-tests.html
৩। https://spectrum.ieee.org/view-from-the-valley/at-work/tech-careers/coronavirus-is-triggering-fear-of-going-to-work
৪। https://www.energyupdate.com.pk/2020/03/27/the-coronavirus-outbreak-could-lead-to-rising-demand-for-it-products-huawei-ceo-ren-zhengfei/
৫। https://www.scmp.com/tech/tech-leaders-and-founders/article/3076939/founder-ren-says-huawei-working-round-clock-amid/
৬। https://www.theregister.co.uk/2020/03/26/huawei_back_at_90_percent_capacity/
৭। https://www.lightreading.com/asia/even-covid-19-cant-stop-huawei-says-founder/a/d-id/758501
৮। SLAVOJ ŽIŽEK: My Dream of Wuhan, অনুবাদ: কাজী তাফসিন
৯। https://www.prothomalo.com/economy/article/1437696/

Featured Image: Global Village Space