এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

[পূর্ববর্তী পর্বের পর থেকে]

 এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় ব্যাপারটি হলো- করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলোর সবগুলোই আসলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4th Industrial Revolution) অংশ। যদিও বিশ্বে এখনো অনেকের কাছে এই ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’ একটি নতুন শব্দ। প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয় সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এবং তা আঠারো শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত চলে। বৃহত্তর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ঘটা এ বিপ্লবে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া হাত থেকে যন্ত্রের ভিত্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বাষ্প ও জলশক্তির ব্যবহার, রাসায়নিক পণ্য ও লোহা উৎপাদন এবং যন্ত্রচালিত কারখানার উন্নয়ন ইত্যাদি ছিল এই সময়ের মূল উপাদান।

এরপর দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের যাত্রা শুরু করে ঊনিশ শতকের শেষে। এবং স্থায়ী হয়  বিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত। মূলত এটি ছিল জোরালো শিল্পায়নের পর্যায়। টেলিগ্রাফ ও রেল নেটওয়ার্কের ধরনে বড় মাত্রায় রূপান্তর, সরকারি উপযোগগুলোর (যেমন: গ্যাস, পানি ও পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থা প্রভৃতি) ব্যাপকতর ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কারখানার বিদ্যুতায়ন এ শিল্প বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তারপর তৃতীয় বিপ্লবের যাত্রা ঘটেছিল মধ্য বিশ শতক থেকে। আর এটি সূচিত হয়েছিল পারমাণবিক জ্বালানি, ইলেকট্রনিক্স ভিত্তিক ট্রানজিস্টর, মাইক্রোপ্রসেসর, কম্পিউটার, টেলিযোগাযোগ, জৈবপ্রযুক্তির উত্থান এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মোটামুটি মাত্রায় স্বয়ংক্রিয়তার মধ্য দিয়ে। 

ঠিক এই সময়টায় চলছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের শুরুর পর্যায়। বিশ শতকের শেষের দিক থেকে রূপ নেয়া এ বিপ্লব প্রধানত তৃতীয় শিল্প বিপ্লব ও দ্রুত বিবর্তনশীল ডিজিটাল উদ্ভাবনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বিগ ডাটা, ইন্টারনেট অব থিংস, ক্লাউড কম্পিউটিং, অটোনোমাস রোবট, জিনোম এডিটিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্লকচেইন, অগমেন্টেড রিয়েলিটি ও থ্রিডি প্রিন্টিং সহ অসংখ্য প্রযুক্তির সমন্বয় হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। আর বর্তমানে করোনা মোকাবেলায় ব্যবহৃত জেনেটিক সিমুলেশন, অগমেন্টেড রিয়ালিটি, টেলি হেলথ ইত্যাদি সবকিছু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অংশ এবং ভবিষ্যতে এগুলো চিকিৎসেবাকে আরো বহুগুণে ত্বরান্বিত করবে।

Image: Writer

এ মুহূর্তে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমরা ইতিমধ্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। আর এক দশক পরেই হয়তো সম্পূর্ণভাবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অংশীদার হবে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উৎকর্ষতা কি মানবজাতিকে শুধুমাত্র উন্নত থেকে উন্নততর দিকে নিয়ে যাবে, নাকি এর মাধ্যমে আমরা মূল্যবান কোনোকিছু হারিয়ে ফেলছি?

গত শতাব্দীতে শিল্পকারখানার অভাবনীয় উন্নতির ফলে বিশ্ব যেমন এগিয়েছে অনেকদূর, তেমনিভাবে তা এই পরিবেশ বান্ধব পৃথিবীকে ফেলেছে হুমকির মুখে। সারাবিশ্বের জলবায়ু এখন পরিবর্তনের মুখে, প্রতিদিন বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতার হার। নবায়নযোগ্য অসংখ্য শক্তির উৎস থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিকে দেশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। শুধুমাত্র ব্যক্তিবিশেষের আর্থিক লাভের দায় পড়ছে পুরো পৃথিবীর উপর, পৃথিবীর অন্যান্য সকল মানুষের উপর। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এর অবসান হলেও হতে পারে। কারণ এখন অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান সৌরবিদুৎকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক শহর, বিদুৎ চালিত স্বনিয়ন্ত্রিত গাড়ি, সোলার অটোমেটেড কারখানার দিকে ঝুঁকছে।

তবে এসবকিছুর বাইরে ভবিষ্যৎ সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বিশ্বে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, অর্থাৎ বিশ্বের ৫৯% মানুষ এখন নিয়মিত ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমের সাথে যুক্ত। প্রতিবছর এর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে তুমুল গতিতে। উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতেও ইন্টারনেট এখন অনেকটাই মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে গেছে। আর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যতো নিকটবর্তী হবে বিশ্ব, ততো মানুষের তুলনায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বাড়তে থাকবে।

বর্তমানে ব্যবহৃত প্রতিটা মোবাইল প্রতি মুহূর্তে আমাদের লোকেশন জানিয়ে দেয় নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলোকে। মোবাইলকে চালু রাখতে হলে, অর্থাৎ নিকটবর্তী নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সাথে কানেক্টেড থাকতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই আসলে। এর বাইরেও এখন অনেক প্রযুক্তি আছে যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং চলাফেরাকে আমাদের অজান্তে রেকর্ড করে রাখে। যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্মার্টফোনে ব্যবহার করা ম্যাপের লোকেশন, বিভিন্ন শপিংমল কিংবা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত ক্লোজ সার্কিট বা সারভাইলেন্স ক্যামেরা, বায়োমেট্রিক পদ্ধতির ব্যবহার ইত্যাদি অনেক প্রযুক্তি আমাদের গতিবিধিকে আড়াল থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়।

এছাড়া স্যোসাল নেটওয়ার্কগুলোতে আমাদের বন্ধু-বান্ধব বাছাই, বিভিন্ন বস্তু-সামগ্রী কেনাবেচা, তথ্য বা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা ইত্যাদি নানা বিষয় থেকে আমাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। স্মার্টফোনে ব্যবহার করা বিভিন্ন অ্যাপ এসব তথ্য এর মূল ডেটাবেসে সংরক্ষণ করে রাখে ভবিষ্যতে এনালাইসিস করার জন্য। এবং সেই অনুযায়ী তারা আমাদের পরিবর্তী চাহিদা, পছন্দ-অপছন্দ কী হতে পারে- তা অনুমান করে সেই অনুযায়ী আমাদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে। বর্তমান সময়ে ফেসবুক, অ্যামাজন, ইউটিউবের মতো বিশ্বের বড় বড় টেক জায়ান্টগুলোর এটাই বিজনেস পলিসি। যদিও এসব অ্যাপ আমরা ফ্রি-ই নিচ্ছি বলে মনে হয়, কিন্তু মূলত আমরা বিনা অর্থে তাদের কাছে বেঁচে দিই আমাদের মহামূল্যবান সময়কে, আমাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে; যা তাদেরকে সুযোগ করে দেয় আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাজকর্ম, চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণ করতে।

আগামীদিনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যেসব উপাদান আমাদের সামনে আসবে, এবং ইতিমধ্যে চলে এসেছে, তাতে মানুষের এসব ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহার আর গতিবিধি আদৌ নিরাপদ থাকবে কিনা, সেটা এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গত ২৪ মার্চ দৈনিক প্রথম আলো’তে মানিক চন্দ্র দাস কর্তৃক অনূদিত বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারির প্রবন্ধ ‘করোনা পরবর্তী পৃথিবী’র অংশবিশেষ এখানে দেওয়া হলো। যা আমাদেরকে করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করবে-

“করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধের এই যুদ্ধে বেশ কয়েকটি দেশের সরকার ইতিমধ্যেই নতুন সব সারভেইল্যান্স টুল ব্যবহার করেছে এবং করছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে চীনে। আমজনতার স্মার্টফোন খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, কয়েকশো মিলিয়ন ফেস-রিকগনাইজিং ক্যামেরা ব্যবহার করে, জনগনকে নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা এবং অবস্থা রিপোর্টে বাধ্য করে চাইনিজ সরকার শুধু দ্রুত ভাইরাস বাহক শনাক্তকরণই নয়, সেই বাহকের চলাফেরা ট্র্যাক থেকে শুরু করে কাদের সংস্পর্শে ভাইরাস বাহক ছিলো তাও বের করে ফেলেছে অসম্ভব দ্রুত গতিতে। এর সাথে আবার মোবাইলের বেশ কিছু অ্যাপ সাধারণ জনগনকে আশপাশের সংক্রমিত রোগী সম্পর্কে সাবধান করে দেয়ার কাজও করেছে।

চীন যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে সে ধরনের প্রযুক্তি যে শুধু পূর্ব এশিয়াতেই আছে, তা কিন্তু নয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ইসরাইল সিকিউরিটি এজেন্সি সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে যে সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সেই সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন শুধুমাত্র করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ট্র্যাক করার জন্য। তাতে সংসদীয় উপকমিটি বাগড়া দিলেও নেতানিয়াহু ‘ইমার্জেন্সি ডিক্রি’ বলে দুই শব্দে সমস্ত আপত্তি উড়িয়ে কাজটি শুরু করে দিয়েছেন।

আমার বক্তব্যের এই পর্যায়ে এসে আপনি বলতেই পারেন, এইসব তো নতুন কিছু না। সম্প্রতি বিভিন্ন সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগনকে ট্র্যাক, মনিটরিং এবং নানাভাবে ব্যবহার করার জন্য খুবই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তারপরেও আমরা যদি সাবধান না হই, এই ধরনের মহামারী বা অতিমারীগুলো সার্ভেইল্যান্সের ইতিহাসে দাগ রেখে যাবে। বন্যার জল নেমে যাবার পর দেয়ালের গায়ে যেরকম দাগ থেকে যায় অনেকটা ওরকম দাগ। এর কারণ হচ্ছে, যে দেশগুলো নিজেদের জনগনের উপর নজরদারীতে বিশ্বাস করে না, তারাও কঠিন নজরদারীর জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এতদিন যে নজরদারী ছিল আংশিক বা অনেকটা বাইরে থেকে, নজরদারী হবে এখন ঘরের ভেতরে, একদম আপনার হাঁড়ির ভেতর। সার্ভেইল্যান্স ‘ওভার-দ্য স্কিন’ থেকে হয়ে যাবে ‘আন্ডার-দ্য-স্কিন’।

এখন পর্যন্ত আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কোন লিঙ্কে আপনি যখনই আঙ্গুল দিয়ে ক্লিক করেছেন, সরকার শুধু জানতে চেয়েছে, কিসের লিঙ্কে আপনি ক্লিক করেছেন। কিন্তু এই করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারের ফোকাসটা সরে গেছে অন্যদিকে। এখন সরকার জানতে চায় আপনার আঙ্গুলের তাপমাত্রা কতো, ত্বকের নীচে আপনার রক্তের চাপ কতো।

এর খারাপ দিক অবশ্যই আছে। এর ফলে ভীতিকর একটি সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা আইনগতভাবে বৈধতা পেয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে বলি, যদি আপনি জানেন যে আমি সিএনএন এর লিংকের বদলে ফক্স নিউজ চ্যানেলের একটি লিঙ্ক ক্লিক করেছি, এই ডেটা থেকে আপনি জেনে যেতে পারেন আমার রাজনৈতিক দর্শন কি। এমনকি আমার ব্যক্তিত্বের কোন একটা বিশেষ দিকও হয়তো এখান থেকেই বেরিয়ে আসবে আপনার হাতের মুঠোতে। কিন্তু একটা ভিডিও ক্লিপ দেখতে দেখতে আমার শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ এবং হৃৎপিণ্ডের গতির পরিবর্তন- এইসব তথ্য যদি আপনার হাতে চলে যায় আপনি তখন জেনে যাবেন কোন বিষয়টা আমাকে হাসায়, কিসে আমার কান্না পায় এবং কোন জিনিসটায় আমার প্রচণ্ড ক্রোধের সৃষ্টি হয়। আমার খুব রাগ হয়!

একটা জরুরি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, আনন্দ, বিষাদ, ক্রোধ, বিষন্নতা, ভালোবাসা, শরীরে জ্বর কিংবা সর্দির মতোই একটি জৈবিক বিষয়। যে প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনার শরীরের কাশি শনাক্ত করা যাচ্ছে, সেই একই প্রযুক্তি দিয়ে আপনার হাসিও শনাক্ত করা যাবে। যদি সরকার বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের এইসব বায়োমেট্রিক ডেটা বা তথ্য জমা করা শুরু করে, তাহলে আমরা আমাদের নিজেকে নিজে যতোটুকু চিনি তার চাইতে বেশি আমাদের চিনবে সরকার বা সেই বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। তখন তারা আমাদের অনুভূতিই যে আগে থেকে বলে দিতে পারবে ব্যাপারটা শুধু তা না, তারা আমাদের আবেগ নিয়ে খেলতে পারবে, আমাদের কাছে বিক্রি করতে পারবে যে কোন কিছু। তা সে ভোটের জন্য একজন রাজনীতিবিদই হোক কিংবা একটা ভৌত পণ্য। বায়োমেট্রিক এই মনিটরিংয়ের কাছে ক্যামব্রিজ অ্যানালাইটিকার ডেটা হ্যাকিং ট্যাকটিকস হচ্ছে প্রস্তর যুগের একটা জিনিস। কল্পনা করুন ২০৩০ সালে উত্তর কোরিয়াতে প্রতিটি নাগরিককে এরকম একটি করে বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরিয়ে দেয়া হয়েছে, সেই ব্রেসলেট আবার মাসের ত্রিশ দিন চব্বিশ ঘণ্টা হাতে রাখতে হয়। তখন উত্তর কোরিয়ার মহান নেতার ভাষণ শুনে আপনার ব্রেসলেট যদি শনাক্ত করে যে আপনি ভাষণ শুনে রেগে গিয়েছেন, আপনি শেষ।

যখন করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমতে কমতে শূন্যে এসে দাঁড়াবে, কিছু ডেটা-হাভাতে সরকার তর্ক করতেই পারে এই বলে যে বায়োমেট্রিক সার্ভেইল্যান্স রাখতে হবে, কারণ করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয়বার আক্রমণের আশংকা আছে কিংবা সেন্ট্রাল আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাসের নতুন কোন স্ট্রেইন হয়েছে। এতোক্ষণে বুঝে গেছেন নিশ্চয়ই, ঘটনাটা আসলে কি। গেলো কয়েক বছর ধরেই আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় নিয়ে বেশ একটা শীতল যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে করোনা ভাইরাস একটা টিপিং পয়েন্ট হতে পারে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বেঁচে থাকা, এই দুটি বিষয়ের মধ্যে যেকোন একটি বিষয় যখন কাউকে বেছে নিতে বলা হবে, নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সে বেঁচে থাকতে চাইবে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা একজন মানুষের ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’ নয়।”

হারারির এই বক্তব্য থেকে যেটা স্পষ্ট হয়, তা হল- ভবিষ্যৎ পৃথিবী আসলে নিয়ন্ত্রিত হতে যাচ্ছে তথ্য বা ডেটা দ্বারা। যার কাছে যত বেশি পরিমাণ তথ্য আছে, তা সে ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান হোক, আর রাষ্ট্র হোক- সে ততো বেশি ক্ষমতাবান হবে। ক্ষমতাবান হবে এই অর্থে,- সে সাধারণ মানুষের উপর ততো বেশি নিজের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ লাভ করবে; সেটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হতে পারে, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যেও হতে পারে। ফলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আসলে যে ভিত্তিপ্রস্তরের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা হলো ডেটা।

এই ডেটা শুধুমাত্র মানুষের সাথে সম্পর্কিত এমন নয়। মানুষের ডেটার সাথে সাথে আসবে আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিসপত্রের ডেটা। সেটা হতে পারে একটা স্মার্ট হোম, স্মার্ট কার, স্মার্ট টিভি, ফ্রিজ, লাইট, ফ্যান ইত্যাদি থেকে শুরু করে অটোমেটেড ফ্যাক্টরির ডেটা এবং হতে পারে একটা পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রের সকল ডেটা। প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে এই ডেটা বিভিন্ন সার্ভারে জমা হতে থাকবে পরবর্তী এনালাইসিসের জন্যে। এবং তা থেকে বেরিয়ে আসবে গোপনীয় তথ্য, ইনফরমেশন। ফলে যে ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা ডেটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, তারাই আগামীদিনে অন্য সকল প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের উপর উপর ছড়ি ঘুরাতে পারবে। আর এই ডেটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার যে কাঠামোগত কৌশল তা নিহিত আছে আগামীদিনের ইন্টারনেট ব্যবস্থা তথা 5G, 6G এবং আরো পরবর্তী ইন্টারনেট জেনারেশনের উপর।

ঠিক একারণেই বর্তমান বিশ্বের তাবৎ শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে রেষারেষির অন্যতম কারণ হলো ইন্টারনেট ইকুয়েপমেন্টে তাদের নিজেদের প্রভাববিস্তার করা। এতদিন ধরে যেসব শক্তিশালী দেশ অন্যান্য দেশের উপর তাদের প্রভাব বিস্তার করে এসেছে, তারা কোনোভাবেই এই সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাইছে না। ১২ এপ্রিল ২০১৯ এ হোয়াইট হাউজের Remarks by President Trump on United States 5G Deployment-এর বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন,

“5G বর্তমান 4G নেটওয়ার্কগুলো থেকে ১০০ গুণ বেশি দ্রুতগতির হবে। এটি আমাদের দেশের নাগরিকদের কর্ম, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং ভ্রমণে আমূল পরিবর্তন আনবে। এটি আমেরিকার ফার্মগুলোকে আরো উৎপাদনশীল, ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলোকে আরো প্রতিযোগিতামূলক এবং স্বাস্থ্যখাতকে আরো উন্নত করে তুলবে। মূলত, এটি প্রায় সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করবে, যখন আপনারা এর আওতায় চলে আসবেন।

এটা খুবই চমকপ্রদ! আমরা ভবিষ্যতের এই শক্তিশালী শিল্পে অন্য কোনো দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে দিতে পারি না। আমরা বিভিন্ন ধরণের শিল্পে এতদিন নেতৃত্ব দিয়েছি, তাই এক্ষেত্রে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করবে, এমনটা আমরা হতে দিতে পারি না। 5G এর প্রতিযোগিতায় আমেরিকাকে অবশ্যই জিততে হবে, স্পষ্টতই আমাদের দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী টেক জায়ান্টগুলো এর সাথে জড়িত। আমরা তাদেরকে যতসম্ভব প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছি। 5G এর এই দৌড়ে আমেরিকাই বিজয়ী হবে!” 

ট্রাম্পের এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, এক্ষেত্রে শুধুমাত্র তথ্যনিয়ন্ত্রণ দিয়ে নয়, উন্নততর ইন্টারনেট ব্যবস্থা সার্বিকভাবে একটা দেশের শিল্পবাণিজ্য তথা অর্থনীতিকে বহুগুণে তরান্বিত করবে। পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, গবেষণা, যোগাযোগ মাধ্যম, কর্মসংস্থান, কৃষিব্যবস্থা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা সবকিছুতে প্রভাব ফেলবে ইন্টারনেটের গতি।

Image: IHS Markit
Image: IHS Markit

২০১৯ সালের নভেম্বরে IHS Markit কর্তৃক প্রকাশিত ‘The 5G Economy: How 5G will contribute to the global economy’ এর প্রতিবেদনে ২০৩৫ সালে বিশ্বে 5G এর ভ্যালু চেইন আউটপুট এবং কর্মসংস্থান কী ধরনের হতে পারে তা দেখানো হয়েছে। যেখানে পর্যায়ক্রমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, সাউথ কোরিয়া, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য নের্তৃত্বস্থানীয়। যদিও সবশেষে এটা বলা ছাড়া উপায় থাকেনা যে- ভবিষ্যতে ভূ-রাজনৈতিক বোঝাপড়া কোন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, আর কোন দেশকে পিছিয়ে দেবে, তা খুবই অনিশ্চিত। এবং আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রাক্বালে সমগ্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার দৌড়ে ক্ষমতাধর দেশগুলোর গোপন আন্তঃশক্তিযুদ্ধে কত উলুখাগড়ার প্রাণ যাবে, সেটাও আসলে ধারণার অতীত!

এসবকিছুর সাথে সমগ্র বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া এই করোনা ভাইরাস মানবজাতির জন্যে সত্যিকার অর্থে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অসংখ্য আন্তঃদেশীয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ, দ্বন্দ্ব-রেষারেষির মধ্যে একদম সাধারণ গৃহবন্ধী মানুষ অথবা একজন চিকিৎসক, একজন স্বেচ্ছাসেবক, একজন শিল্পী কিংবা গবেষক কতটুকু মানবিক হতে পারে আরেকজন মানুষের প্রতি, সেখানেই বোধহয় নির্ভর করছে সেই দিনের হিসাব; ভবিষ্যতে আর কতগুলো দিন পৃথিবীর বুকে মানুষ হিসেবে টিকে থাকতে পারব আমরা, তার উত্তর।

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সিরিজটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কিংবা কোনোরকম অভিযোগ প্রকাশের জন্য লিখিত নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে করোনা ভাইরাস প্রেক্ষাপটে একটি বৈশ্বিক পর্যালোচনামাত্র। এছাড়া বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়া একটি নিন্দনীয় এবং পুরোপুরি ভ্রান্ত গুজব, যেটি- ৫জি এর মাধ্যমে 'কোভিড-১৯ ভাইরাস' এর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বলা প্রচারিত হচ্ছে, তার সাথে উক্ত আর্টিকেলটির কোনো সম্পর্ক নেই। পাঠকে এ ব্যাপারে সচেতন থেকে আর্টিকেলটি পড়ার জন্যে অনুরোধ করা হলো।]

তথ্যসূত্র:
১। https://www.wired.com/story/us-feds-battle-against-huawei/?itm_campaign=BottomRelatedStories_Sections_4
২। https://www.nytimes.com/2020/03/27/business/china-coronavirus-masks-tests.html
৩। https://spectrum.ieee.org/view-from-the-valley/at-work/tech-careers/coronavirus-is-triggering-fear-of-going-to-work
৪। https://www.energyupdate.com.pk/2020/03/27/the-coronavirus-outbreak-could-lead-to-rising-demand-for-it-products-huawei-ceo-ren-zhengfei/
৫। https://www.scmp.com/tech/tech-leaders-and-founders/article/3076939/founder-ren-says-huawei-working-round-clock-amid/
৬। https://www.theregister.co.uk/2020/03/26/huawei_back_at_90_percent_capacity/
৭। https://www.lightreading.com/asia/even-covid-19-cant-stop-huawei-says-founder/a/d-id/758501
৮। SLAVOJ ŽIŽEK: My Dream of Wuhan, অনুবাদ: কাজী তাফসিন
৯। https://www.prothomalo.com/economy/article/1437696/ 

Featured Image: Global Village Space