কী হচ্ছে হংকংয়ে?

সম্প্রতি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ইতোমধ্যেই ফেসবুক এবং টুইটারে সে ভিডিওটি ছড়িয়ে গেছে সমগ্র পৃথিবীময়। লাখ লাখ শেয়ার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এত এত শেয়ারের জোয়ারে ভেসে ভাইরালকৃত ভিডিওটি পৌঁছে গেছে বাংলাদেশেও।

ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, হংকংয়ের রাস্তায় লাখ লাখ মানুষের ঢল। শান্তিপূর্ণ স্লোগানে মুখরিত রাজপথ। হঠাৎ দেখা গেলো, জমায়েতের এক পাশ থেকে মানুষ দু পাশে চেপে যাচ্ছে, ঠিক যেন কাউকে গার্ড অব অনার দেয়া হবে। অনেকটা গার্ড অব অনার দেয়ার মতো করেই তারা অসুস্থ রোগী বহনকৃত অ্যাম্বুলেন্সকে চলে যাবার জন্য পথ করে দিচ্ছিল। অনেকের ধারণা, এই ভিডিওটি ভাইরাল হবার পরপরই বিশ্বব্যাপী তাদের আন্দোলনের পক্ষে মানুষের সমর্থন আরও বেড়ে গেছে। অনেকেই ফেসবুক টুইটারে সমর্থন জানাচ্ছেন তাদের এই আন্দোলনের পক্ষে।

হংকং; Image Source: gadgetsmalta.com

কী কারণে এই আন্দোলন?

সম্প্রতি হংকংয়ের আইনসভায় অপরাধী প্রত্যর্পণ আইন প্রস্তাব করা হয়েছে। হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম আইনসভায় এই প্রস্তাবটি তুলেন। এ প্রস্তাবের কারণটা খুঁজতে গেলে যেতে হবে আরও একটু পেছনে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হংকংয়ের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ তাইওয়ানে যান ছুটি কাটাতে। ছুটি কাটাতে গিয়ে সেই তরুণ তার অন্তঃসত্ত্বা প্রেমিকাকে হত্যা করেন এবং ফিরে আসেন হংকংয়ে। পরবর্তীতে তাইওয়ান সেই হত্যাকারীকে বিচারের সম্মুখীন করার চেষ্টা করে। কিন্তু অপরাধী হংকংয়ে অবস্থান করায় তাকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছিল না। কেননা হংকংয়ে অপরাধী প্রত্যপর্ণ করার কোনো আইন নেই। সে ঘটনার জের ধরেই ক্যারি লাম এই আইনটি আইনসভায় প্রস্তাব করেন। কিন্তু তাইওয়ান বলছে ভিন্নভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে। অন্তত এই সমস্যা সমাধানে হংকংয়ের আইনে এত বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছে না তারা।

প্রস্তাবিত এই আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র অপরাধী নয়, সন্দেহভাজন যে কাউকে চীন প্রয়োজনে নিজ সীমানার মধ্যে নিয়ে গিয়ে বিচারের আওতায় আনতে পারবে। বেইজিং, ম্যাকাও ও তাইওয়ান থেকে পালিয়ে আসা যেকোনো অপরাধীকেই চাইলেই ফেরত দিতে হবে এই আইনের বদৌলতে।

আন্দোলনকারী অধিকাংশের ধারণা, এই আইনের অপব্যবহার হবে প্রচণ্ড পরিমাণে। এতে করে নিরপরাধ মানুষের সাজা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই তারা এই আইনটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং সরাসরি এই প্রস্তাবনা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

আন্দোলনের ঢল; Image Source: CNN

উঠতি তরুণ সমাজ ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ আইন প্রসঙ্গে উৎকণ্ঠার পরিমাণ বেশি দেখা যাচ্ছে, কেননা অতি সম্প্রতি হংকংয়ের অধিবাসীদের মধ্যে একধরনের চীন বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে। অনেকে চীন থেকে বের হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম হংকংয়ের স্বপ্নও দেখেন। তাদের মতে এরূপ চীন বিরোধী মনোভাবাপন্নদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই এইরকম একটি আইনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। এই আইন পাশ হলে হংকংয়ের বিচার ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অনেকে। তাই এই অপরাধী প্রত্যপর্ণ আইনের প্রস্তাবনা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হচ্ছেন। যদিও হংকং কর্তৃপক্ষ বলছে, অপরাধীকে হস্তান্তর করা হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত সর্বদাই থাকবে বিচার বিভাগের হাতে। তাই এ নিয়ে হংকংবাসীকে দুশ্চিন্তা না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। কিন্তু এ আহবানে আন্দোলনকারীরা সন্তুষ্ট নন।

কারা যোগ দিয়েছেন এই আন্দোলনে?

হংকংয়ের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাদা রঙের পোশাক পরে এ আন্দোলনে যোগ দিতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা, এনজিও কর্মী, মানবাধিকার কর্মীদের।

হংকংয়ের প্রধান ছাত্র সংগঠন আন্দোলনের সাথে সংহতি ও একাত্মতা জানিয়ে ১২ জুন সকল ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানান এবং বর্জনকারীরা মিলে একত্রে মিছিলে যোগ দেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও চলমান এই বিক্ষোভের সাথে সংহতি জানিয়েছে।

আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি জানিয়ে একই দিনে সারাদিন নিজেদের ব্যবসা বন্ধ রাখেন বলে বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন হংকংয়ের প্রায় ১০০ এর বেশি ব্যবসায়ী।

আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে সেদিন সারাদিন ধীর গতিতে বাস চালিয়েছেন সে দেশের বাসচালক ইউনিয়নের নেতা-কর্মীবৃন্দ। হুইল চেয়ারে করেও অনেকে অংশ নিয়েছেন এই আন্দোলনে। আন্দোলনকারীরা যথাসাধ্য সহায়তা করে চলেছেন একে অপরকে।

১২ জুন প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। সেখানকার প্রধান প্রধান সড়কগুলো অবরোধ করে  এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পাল্টাপাল্টি পুলিশও আন্দোলনকারীদের ওপর রাবার বুলেট ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। এ সংঘর্ষে ১৫ থেকে ৬৬ বছর বয়সের অন্তত ৭২ জনের আহত হবার খবর পাওয়া যায়। ১১ জনের গ্রেফতার হবার খবরও প্রকাশিত হয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।

এ ঘটনার পর প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম আন্দোলনকারীদের সংঘবদ্ধ দাঙ্গাবাজ বলে আখ্যায়িত করেন। পরবর্তীতে অবশ্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বিলটি আপাতত স্থগিত করেন।

আপাতত স্থগিত করেও আন্দোলন দমাতে পারেননি ক্যারি লাম। কেননা, স্থগিত নয়, বিলটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল চান আন্দোলনকারীরা। তাই আবারও রাস্তায় নেমে আসেন তারা। ১৭ই জুন প্রায় ২০ লাখ আন্দোলনকারী রাস্তায় নেমে আসেন বলে দাবি করেন আয়োজনকারীরা। ‘শিক্ষার্থীরা দাঙ্গা করে না’ প্ল্যাকার্ড হাতে প্রধান সড়ক অবরোধের পাশাপাশি আইনসভা ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানান বিক্ষোভকারীরা।

শিল্ড গার্ল

তখন সন্ধ্যা নামছিল, আন্দোলনকারীদের প্রায় সকলেই ক্লান্ত। অল্প কিছু আন্দোলনকারীদের সামনে সেখানে তখন অনেক বেশি পরিমাণে দাঙ্গা পুলিশ উপস্থিত। এমনই সময় দাঙ্গা পুলিশের সারির সামনে গিয়ে ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিমায় বসেন একজন নারী। এটিই যেন হয়ে যায় হংকংয়ের সমগ্র আন্দোলনকারীদের প্রতীকী চিত্র!

শিল্ড গার্ল;  Image Source: BBC

২৬ বছর বয়স্ক তরুণী লাম কা লো সরকার প্রধানের কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনের মধ্যবর্তী সময়ে এ কাজটি করেন। তিনি চেয়েছিলেন আন্দোলনকারী বাকিরাও যেন তাকে অনুসরণ করে। কিন্তু তিনি কখনোই এই আন্দোলনের মুখপাত্র হতে চাননি বলেও জানান তিনি।

হংকংয়ারস

প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ কলোনি হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয় ১৯৯৭ সালে। তবে চীনের অধীনে হলেও ‘এক দেশ, দুই পদ্ধতি’ চুক্তি অনুযায়ী হংকং সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত। এখানে রয়েছে তাদের নিজস্ব আইন এবং বিচার ব্যবস্থা। এই আইন পাশ হলে চীন হংকংয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে বলে ধারণা করছেন আন্দোলনকারীরা

হংকংয়ারস; Image Source: quartz.com

হংকংয়ারসদের আন্দোলনের ইতিহাস অবশ্য কম নয়। ১৯৬৬ সালে স্টার ফেরি কোম্পানি তাদের ভাড়া বাড়ালে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করে তারা। আন্দোলন এমন পর্যায় রূপ নেয় যে একসময় সেখানে কারফিউ জারি করতে হয় এবং প্রায় ১০০ প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। এরপর ১৯৯৭, ২০০৩ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে আন্দোলন হয় হংকংয়ে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে নিজেদের নেতা নিজেরাই নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হন তারা। সহজভাবে বললে ভোটের অধিকারের দাবিতে প্রায় সপ্তাহখানেক আন্দোলন চলে তখন। আন্দোলন সফল না হলেও সে সময়ই আন্দোলনকারীরা বলেছিলেন, “উই উইল’বি ব্যাক”

সেই ধারাবাহিকতায়ই হয়তো এই দশকের সবচেয়ে বড় জমায়েত নিয়ে আন্দোলন করে দেখিয়ে দিচ্ছেন তাদের শক্তি। আদতে তারা কি স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হতে চাইছেন?

হংকংয়ের অধিকাংশ নাগরিকই চীনের আদিবাসী এবং চীনের একটি অংশও বটে। তবুও সেখানকার জনগণ  নিজেদের চীনা বলে পরিচয় দিতে অস্বস্তি বোধ করেন।

এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১৫% শিক্ষার্থী নিজেদের চীনা বলে পরিচয় প্রদান করেন, বাকিরা ‘হংকংয়ারস’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় মাত্র ৩% শিক্ষার্থী নিজেদের চীনা বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

সম্প্রতি হংকংয়ারসদের মধ্যে চীন বিরোধী মনোভাব তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। কিছু তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হংকংয়ের স্বাধীনতাও দাবি করে থাকেন। তবে স্বাধীনতা হোক আর স্বায়ত্তশাসনই হোক, নিজেদের ওপর চীনের প্রভাব তারা মোটেই পছন্দ করেন না, এই আন্দোলন অন্তত সেটাই প্রমাণ করে দিয়ে গেলো।

আন্দোলনকারীদের সর্বশেষ অবস্থা

আন্দোলনকারীদের এখন প্রধান দাবি চারটি

  • অপরাধী প্রত্যপর্ণ বিল সম্পূর্ণ প্রত্যাহার
  • ১২ জুনের বিক্ষোভকে দেয়া ‘দাঙ্গা’ আখ্যা প্রত্যাহার
  • সকল আটককৃত কর্মীদের মুক্তি
  • পুলিশি সহিংসতার সুষ্ঠু তদন্ত

এই প্রধান চারটি দাবি নিয়ে আন্দোলনকারীরা সামনের দিনগুলিতে কী হবে, সে সিদ্ধান্ত জানতে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন।

This is a bangla article about the present political situation in Hong Kong.

All necessary sources have been hyperlinked.

Featured Image Source: ABC News

Related Articles