একটি দেশের রাজধানী যেভাবে নির্বাচন করা হয়

ছোটবেলা থেকেই আমরা বিভিন্ন দেশের রাজধানীর নাম মুখস্থ করে আসছি। যেমন- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, জাপানের রাজধানী টোকিও ইত্যাদি। এসব নাম পড়তে গিয়ে একটা প্রশ্ন আসতে পারে রাজধানীগুলো ঠিক কীভাবে নির্বাচন করা হয়? ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী না হয়ে চট্টগ্রাম হলো না কেন? ঢাকার বিশেষত্ব কী?

সাধারণত একটি দেশের রাজধানীকে কেন্দ্র করে সে দেশের সরকারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সরকারের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর রাজধানীতে অবস্থিত হয়ে থাকে। এছাড়া রাজধানী শহরগুলো সাধারণত ওই দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ থাকে। রাজধানী নির্বাচনে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় পাঠকদের জন্য সেগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায়।

ভৌগলিক অবস্থান

একটি দেশের রাজধানীর ক্ষেত্রে তার ভৌগলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগলিক অবস্থানকে যখন বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, তখন সাধারণত সামরিক ও প্রতিরক্ষার কৌশল বিবেচনা করে রাজধানী নির্বাচন করা হয়। উপকূলীয় ও সীমান্তবর্তী শহরগুলো নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজধানী করা হয় না। এছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে রাজধানী শহরের দূরুত্বও বিবেচনায় আনা হয়, যেন জনগণ সহজে যাতায়াত করতে পারে।

এসব দিক বিশ্লেষণ করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেশের ঠিক কেন্দ্রে বা মাঝখানে যে শহর থাকে, সেই শহরকে রাজধানী নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এরকম দেশের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত।

ঢাকার অবস্থান বাংলাদেশের মাঝখানে; Image Source: researchgate.net

ব্রাজিলের রাজধানী ১৯৬১ সালে উপকূলীয় শহর রিও ডি জেনিরো থেকে ব্রাসিলিয়ায় আনা হয়। ১৯৫৬ সালে ব্রাসিলিয়াকে সাজানো হয়েছিল দেশের রাজধানী আরো কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নিয়ে আসার জন্য। ব্রাসিলিয়াকে আধুনিক পরিকল্পিত শহরের উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

ইতিহাস

কিছু কিছু দেশের রাজধানী নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে সেই অঞ্চলের ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি। ইতিহাসবিদরা এধরনের রাজধানীকে বলেন স্বয়ংক্রিয় রাজধানী। অর্থাৎ, এসব অঞ্চল স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দেশগুলোর জনগণের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে এবং সময়ের পরিক্রমায় রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছে। এসব শহরে সাধারণত দেশের জনসংখ্যা ছিল বেশি অথবা, সেখানে রাজ পরিবারের সদস্যরা বা শাসকরা থাকতেন।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক দিয়ে এমন উদাহরণ হতে পারে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে মাদ্রিদ গুরুত্বপূর্ণ কোনো শহর ছিল না। সেখানের জনসংখ্যাও কম ছিল। রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ সেখানের একটি খালি প্রাসাদে থাকা শুরু করেন। ফলে স্পেনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও চলে আসে মাদ্রিদে। তখন থেকে স্পেনের রাজতন্ত্রের কেন্দ্র হয়ে ওঠে মাদ্রিদ শহর। এর চারশ বছর পর মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের রাজধানীর মর্যাদা পায়।

মাদ্রিদের রাজধানীর মর্যাদা পাওয়া হয় ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকার কারণে; Image Source: idealista.com 

ঐতিহাসিক জটিলতাও রাজধানী নির্বাচনে নিয়ামক হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল ভেঙে যখন পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি এক করে ফেলা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- রাজধানী কোন শহর হবে; বার্লিন নাকি বন?

স্নায়ুযুদ্ধের সময় পূর্ব জার্মানির রাজধানী ছিল বার্লিন এবং পশ্চিম জার্মানির ছিল বন শহর। নতুন জার্মানির রাজধানী নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ভোটের আয়োজন করা হয়। ১৯৯১ সালের ২০ জুন সেই ভোটাভুটিতে অল্প ব্যবধানে জিতে যায় বার্লিন। বার্লিন পায় ৩৩৭ ভোট এবং বন পায় ৩২০ ভোট।

জার্মানির দুই রাজধানী নিয়ে জটিলতা থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে একটি নয়, দুটি নয়, তিনটি রাজধানী। সেখানকার সরকারের কার্যক্রমকে তিনটি রাজধানীতে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- প্রিটোরিয়া (প্রশাসনিক), ব্লুমফন্টেইন (বিচার বিভাগীয়) এবং কেপ টাউন (আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত)।

১৯১০ সালে চার ব্রিটিশ উপনিবেশ একীভূত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকান ইউনিয়ন গঠিত হয়। কিন্তু রাজধানী শহর কোথায় হবে তা নিয়ে কখনো মতানৈক্যে পৌছাতে পারেনি দেশটি। নব্বই দশকে চেষ্টা করা হয়েছিল একটি রাজধানী নির্বাচন করার। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়।

ধর্মীয় গুরুত্ব

কিছু কিছু শহরের রাজধানী হওয়ার পেছনে ধর্মীয় প্রভাব অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। অনেক রাষ্ট্রই ধর্মীয় অনুশাসনে পরিচালিত হয়। তাদের ক্ষেত্রে কোনো শহরকে কেন্দ্র করে ধর্ম প্রচারিত হওয়ার ইতিহাস থাকে। আবার, কিছু শহরকে দেবতার আদি নিবাস মনে করা হয়।

ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত এমন একটি রাজধানী শহর হচ্ছে ইতালির রোম। প্রথম শতাব্দী থেকেই ক্যাথলিক চার্চের পোপের কার্যালয় রোমে অবস্থিত। রোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতা চার্চগুলোর অধীনে চলে আসে। রোমান সাম্রাজ্যের পতন হলেও তা অব্যাহত থাকে।

রোম ইতালির রাজধানী হয়েছে ধর্মীয় প্রভাবে; Image Source: hotel-bb.com

এরপর ইতালির কিছু অঞ্চল ক্যাথলিক চার্চের অধীনে চলে আসে। ৭০০ খ্রিস্টাব্দে পোপ রাজ্যের এ-অঞ্চলগুলোর রাজধানী করা হয় রোমকে। এরপর প্রায় ১,১০০ বছর রোম শহর তার এই অবস্থান ধরে রাখে। ধর্মীয় গুরুত্ব ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুর কথা বিবেচনা করে ১৮৭১ সালে রোম শহরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতালির রাজধানী ঘোষণা করা হয়।

অর্থনীতি

একটি শহর যখন অর্থনৈতিকভাবে চাঙা থাকে, তখন তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তাই রাজধানী নির্বাচনে অনেক সময় একটি শহর অর্থনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী সেটাও বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক আকর্ষণের পাশাপাশি এই স্থানটি রাজনীতিবিদদেরও দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম হয়।

মধ্যযুগ থেকেই লন্ডন ব্রিটেনের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র; Image Source: visitlondon.com 

একটি অঞ্চলের সুস্থ অর্থনীতির সুবাদে রাজধানীর মর্যাদা পাওয়া শহরের উদাহরণ হতে পারে ইংল্যান্ডের লন্ডন। রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই লন্ডন ব্রিটেনের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। ইতিহাসবিদরা এই শহরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে ভৌগলিক অবস্থানের অবদানের কথাও বলেন। মধ্যযুগ থেকেই লন্ডন একটি ধনী ও ঘনবসতিপূর্ণ শহর। ১২৬৫ সাল থেকে এখানে সংসদ অধিবেশন হয়ে আসছে।

রাজনৈতিক সমঝোতা

ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার পর রাজধানী নির্বাচন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। তখনকার রাজনীতিবিদ আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন রাজধানীকে উত্তরাঞ্চলের কোনো শহরে চাইছিলেন। অন্যদিকে টমাস জেফারসন ও জেমস ম্যাডিসন চাচ্ছিলেন দক্ষিণে নিয়ে যেতে। তখনকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন কোনোদিকেই না গিয়ে ১৭৯০ সালে পটোমাক নদীর কাছের স্থান নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে ওয়াশিংটনের প্রতি সম্মান জানিয়ে শহরটির নাম রাখা হয় ওয়াশিংটন ডিসি।

ওয়াশিংটন ডিসি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী হয় রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে; Image Source:  U.S. Air Force photo by Airman 1st Class Philip Bryant.

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরাকেও নির্বাচন করা হয় রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে। এর বৃহত্তম শহর সিডনির সাথে দক্ষিণের মেলবোর্নের দ্বন্দ্ব দেখা যাওয়ায় ক্যানবেরাকে বেছে নেয়া হয়। যদিও ইতিহাসবিদরা বলেন এটি আসলে প্রকৃত কারণ নয়।

তারা মনে করেন, গ্রীষ্মের সময় মেলবোর্ন ও সিডনিতে প্রচণ্ড গরম থাকায় তুলনামূলক শীতল জায়গা ক্যানবেরাকে বেছে নেয়া হয়েছে। ইতিহাসবিদ ডেভিড হিডন অস্ট্রেলিয়ান জিওগ্রাফিকে বলেন, তখনকার রাজনীতিবিদরা একমত হয়েছিলেন যে শ্বেতাঙ্গরা ঠাণ্ডা অঞ্চলে থেকেই শাসন করতে পারবে এবং উন্নতি লাভ করতে পারবে। এটিই ক্যানবেরাকে রাজধানী নির্বাচন করার মূল কারণ।

শাসকদের খেয়াল

শাসকদের উচ্চাভিলাষী খেয়াল খুশিতে অনেক সময় রাজধানী শহর নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৭ সালে কাজাখস্তানের রাজধানী নির্বাচন করা হয় আস্তানাকে। এটি ছিল তখনকার রাষ্ট্রপতি নুরসুলতান নাজারবায়েভের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। এই শহরের পূর্ব নাম ছিল আকমলা। কিন্তু এর আকমলার অর্থ ‘সাদা কবর’ হওয়ায় পরিবর্তন করে আস্তানা রাখা হয়।

কাজাখস্তানের রাজধানীর নাম ‘নুরসুলতান’ রাখা হয়েছে; Image Source: Shutter stock

এ বছরের মার্চে শহরের নাম আবার পরিবর্তন করে সাবেক রাষ্ট্রপতির নামে ‘নুরসুলতান’ রাখা হয়েছে। এখানে কংক্রিট ও কাঁচের তৈরি একটি পিরামিড আছে। এই পিরামিডের ভেতরে ১,৫০০ আসনের একটি অপেরা হাউজ আছে।

শাসকদের এরকম উচ্চাভিলাষী আরেকটি প্রকল্পের উদাহরণ মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডো। ২০০৫ সালে সামরিক সরকারের অধীনে এই শহর নির্মাণ করা হয়। এই রাজধানীতে বিশাল রাস্তা, চিড়িয়াখানা, গলফ কোর্স থেকে শুরু করে বিলাসিতার নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। তবে তা কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নিয়ে আরও জানতে পড়ুন এই বইগুলো

১) ষাট বছর আগের ঢাকা
২) চল্লিশের দশকের ঢাকা
৩) ঢাকার টুকিটাকি

This is a Bengali article written about the capital cities are chosen. It is about the criteria of capital cities & example of those. All the references are hyperlinked in the article.

Featured Image: The Daily Star

References: 

1. BBC News

2. World Atlas

Related Articles