চীনের ভূ-স্বর্গ জিওজাইগো উপত্যকা

যদি কখনো প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর স্বর্গ কোনটি? এর উত্তর দিতে কেউ হয়তো ভুল করবেন না। এক বাক্যে উত্তর দিবেন- কাশ্মীর। হ্যাঁ, মুঘল আমল থেকে ভূ-স্বর্গ হিসেবে বিবেচিত অনিন্দ্যসুন্দর, প্রাকৃতিক রূপ বৈচিত্রের লীলাভূমি কাশ্মীর। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীরকে ভূ-স্বর্গ আখ্যায়িত করার পর থেকে বিশ্বব্যাপী কাশ্মীরের পরিচিতি, পৃথিবীর স্বর্গ হিসেবে। 

এবার যদি আপনাকে একটু ঘুরিয়ে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করা হয়, চীনাদের কাছে ভূ-স্বর্গ হিসেবে বিবেচিত কোনটি? এবারের উত্তর কিন্তু আর আগেরটা না, বরং এবারের উত্তর হবে জিওজাইগো ভ্যালি! কিন্তু কেন? চলুন, চীনাদের কাছে ভূ-স্বর্গ হিসেবে বিবেচিত উপত্যকাটির আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক আজ।

জিওজাইগো ভ্যালি; Image Source : Emaze

জিওজাইগো হিমালয়ের গহীন অরণ্যে লুক্কায়িত এক পানির রাজ্য, যার অবস্থান চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সিচুয়ান প্রদেশের উত্তরে, আয়তন ৭২০ বর্গ কিলোমিটার বা ৭২,০০০ হেক্টর। জিওজাইগো স্বর্গ হলে সিচুয়ান প্রদেশকে তো স্বর্গের দুয়ার বলাই যায়!

উপত্যকাটি তিব্বত মালভূমির অন্তর্গত মিন শান (Min Shan) পর্বতমালার একটি বিশেষ অংশ। অঞ্চলটির মাত্র ৫০ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ১৭টি প্রবাহিত ঝর্না, ১১৪টি বিচিত্র বর্ণিল পানির লেক ও চারদিকে বিস্তৃত পাহাড়ি বনাঞ্চল।

জিওজাইগো শব্দের অর্থ ‘নয় গ্রামের উপত্যকা’। উপত্যকাটি জুড়ে নয়টি গ্রাম গড়ে ওঠার কারণে অঞ্চলটির এমন নাম। এর নামকরণের সাথে জড়িয়ে আছে এক রুপকথার গল্প। এখানকার স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের পর্বত দেবতা বিয়াংদুওমিনগ্রেবার নয় কন্যা ছিল। নয় বোনের প্রত্যেকেই ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ ও রূপবতী। একবার এই এলাকায় ভ্রমণ করতে এসে তারা দেখল শেমোজাহ্‌ নামের এক বিষধর দৈত্য তার বিষ দ্বারা এখানকার পানি বিষাক্ত করছে। তারপর সেই নয় বোন একত্রে দৈত্যকে পরাজিত করে। উপত্যকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তারা স্থানীয় নয় সম্ভ্রান্ত তিব্বতি পুরুষকে বিয়ে করে নয়টি পৃথক গ্রামে বসবাস শুরু করে। আর এই কাহিনি থেকেই পরবর্তীতে অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়েছে জিওজাইগো ভ্যালি।

অঞ্চলটিতে প্রায় ৩,০০০ বছর পূর্বে জনবসতি গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রামগুলোতে বসবাসকারী স্থানীয় তিব্বতিদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। তাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বকীয়তার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তারা নিজেদের মধ্যে বন (Bon) ও বেনবো-সেক (Benbo-Sec) নামে এক বিশেষ ধরনের প্রাক-বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা করে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে আবা এই ধর্মের প্রচার করেন।

জিওজাইগোর আট হাজার ফুট উচ্চতায় প্রাপ্ত সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম থেকে বোঝা যায়, সুদূর অতীতে এই উপত্যকার অবস্থান ছিল সমুদ্রের তলদেশে। হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টিকালে সমুদ্র তলদেশের মাটি ভাজ হয়ে বর্তমান আকার ধারণ করেছে। 

ধারণা করা হয়, প্রায় ৫,০০,০০০ বছর পূর্বের একটি পাহাড় ধসের কারণে জিওজাইগোর একটি মুখ বন্ধ হয়ে এক বিশাল লেকের সৃষ্ট হয়। অর্ধচন্দ্রাকার লেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭.৫ কিলোিটার ও প্রস্থ মাত্র ৫০০ গজ। এখানকার বাসিন্দারা সমুদ্র থেকে প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দূরে বসবাস করার কারণে এর চেয়ে বড় কোনো জলাশয় দেখার সুযোগ তাদের হয়নি। তাই লোকমুখে লেকটি পরিচিতি পেয়েছে ‘দীর্ঘ সাগর’ নামে।

দীর্ঘ সাগর; Image Source : sohu.com

শুধুমাত্র দীর্ঘ সাগর নয়, এখানকার অধিকাংশ লেকের সৃষ্টি হয়েছে ভূমিকম্পের কারণে পাহাড় ধসে। পাহাড় ধসের কারণে প্রাকৃতিকভাবে বাঁধের সৃষ্টি হয়ে, আবদ্ধ নিচু জায়গায় পানি জমে তৈরি হয়েছে অধিকাংশ লেক। 

লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, তাদের পর্বত দেবতা তার স্ত্রী পর্বত দেবীকে একটি আয়না উপহার দিয়েছিলেন যা ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। কিন্তু ভুলবশত দেবী আয়নাটি ভেঙে ফেললে তা ১১৪টি খন্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। এই টুকরোগুলো থেকে সৃষ্টি হয় ১১৪টি স্বচ্ছ পানির লেক।

জিওজাইগোর বেশিরভাগ হ্রদে অধিক মাত্রায় ক্যালসিয়াম কার্বনেটের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।‌ তাই লেকগুলোর জল এতটাই স্বচ্ছ যে উপর থেকে এর তলদেশও দৃশ্যমান। তলদেশের বিভিন্ন শৈবাল ও বালির বর্ণিল রঙের কারণে জল নানা বর্ণ ধারণ করেছে। 

লেকের গভীরতা, আকৃতি, লেকের চারপাশে আচ্ছাদিত বৃক্ষরাজি ও আকাশের চমৎকার প্রতিবিম্বের তারতম্যের কারণে লেকগুলোর সৌন্দর্যে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। কিছু কিছু লেক একইসাথে অগভীর ও নলখাগড়ায় পরিপূর্ণ। নীল, সবুজ ও ফিরোজা রঙের জলে সজ্জিত লেকগুলো অঞ্চলটির সৌন্দর্যের অন্যতম কারণ। এখানকার স্থানীয় তিব্বতিরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, এই জলই জিওজাইগোর প্রাণ। 

এখানকার অধিকাংশ লেকের নামকরণ করা হয়েছে তথাকথিত জলে বসবাসকারী জলপরী ও জলদানবের নামানুসারে; যেমন, দুই ড্রাগন লেক, পঞ্চ রাঙ্গা পুল, আয়না লেক, পান্ডা লেক, ময়ূর নদী ইত্যাদি। স্থানীয়রা লেকগুলোকে বলে হাইজি (Haizi), যার অর্থ সমুদ্রের পুত্র। 

জিওজাইগো সম্বন্ধে সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, মাত্র চল্লিশ বছর আগেও কারো জানা ছিল না যে এখানে এমন চোখজুড়ানো উপত্যকা রয়েছে। এই অঞ্চল সম্পর্কে তখন জানা যায়, যখন কাঠুরেরা কাঠের সন্ধানে এ পথে পা বাড়ায়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয় এখনকার বনজ সম্পদ জরিপ করতে এসে প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যায়।

প্রাকৃতিক রূপ-লাবণ্যে অনন্য জিওজাইগোর প্রাণীবৈচিত্র্য বিস্ময়কর। অঞ্চলটি বহু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এই বনভূমি প্রায় ১৪০ প্রকারের পাখির অভয়ারণ্য। এছাড়াও এখানে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় অতিকায় পান্ডা, নাকবোচা বানর এবং বহু কাঠবিড়ালী।

বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী অতিকায় পান্ডা; Image source: easytourchina.com
নাকবোচা বানর; Image Source : Pinterest

জলের রাজ্য জিওজাইগোতে অবশ্য মাছের দেখা মেলা ভার। এখানে শুধুমাত্র এক বিশেষ ধরনের কার্ফ মাছের সন্ধান পাওয়া যায়। এর নাম নগ্ন কার্ফ মাছ। এই মাছের শরীরে কোনো আঁশ নেই বলে এদের এমন নাম হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এত উচ্চতায় এর অবস্থানের কারণে শীতে এর পানি জমে বরফে পরিণত হয়। এত তীব্র শীতে এখানে শুধুমাত্র এই একপ্রকারের মাছই টিকে থাকতে পারে।

অতীতে এই উপত্যকার পথ ছিল অত্যন্ত দুর্গম। সেকালে শুধু ঘোড়ায় চড়ে এখানে আসা যেত। বর্তমানে এর নিকটবর্তী শহর থেকে বাসে চড়ে এখানে আসা যায়। এতে প্রায় দশ ঘন্টা সময় লাগে। অতীতের সেই দুর্গম জনপদ বর্তমানে চীনের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। 

এই পাহাড়ি বনাঞ্চলটি অতি প্রাচীন বৃক্ষে আচ্ছাদিত। দুর্বৃত্তরা এই অঞ্চলের বন উজাড় করছিল। এই বন রক্ষার জন্য ১৯৮২ সালে চীন সরকার এই অঞ্চলকে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করে। পূর্বে কৃষিকাজ ছিল এই অঞ্চলের লোকেদের জীবিকার্জনের একমাত্র উপায়।

বর্তমানে জিওজাইগো ন্যাশনাল পার্ক অঞ্চল একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সরকার জিওজাইগোকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করার পর থেকে চাষাবাদ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। যে কারণে এই অঞ্চলের স্থানীয়রা জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় সরকারের ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলকে ইউনেস্কো ১৯৯২ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ১৯৯৭ সালে ওয়ার্ল্ড বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা দেয়।

শীতে এই অঞ্চলের জল জমে বরফে পরিণত হয়; Image Source: easytourchina.com

১৯৮৪ সালে উদ্যানটি পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই পর্যটকদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ১৯৮৪ সালে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ হাজার, কিন্তু তা ১৯৯১ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৭০ হাজারে। ১৯৯৭ সাল নাগাদ তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লক্ষে। ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ পর্যটক এখানে ঘুরে গেছে, যাদের মধ্যে ৩,০০০ বিদেশী পর্যটক ছিল।

জিওজাইগো ভ্রমণের সর্বোত্তম সময় বসন্তের শেষের দিকে এবং শরৎকালে; বিশেষত এপ্রিল, মে, সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে। কারণ এই সময়ে এখানে জলের উৎস খুব পর্যাপ্ত থাকে। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে, শরৎকালে, যখন উপত্যকাটি বর্ণিল পাতা দ্বারা সজ্জিত হয়, তখন এটি যেন এক রঙের রূপকথার রাজ্যে পরিণত হয়। 

জিওজাইগোতে দর্শনার্থীদের ভিড়; Image source: Wikipedia

জিওজাইগো জুড়ে থাকা বর্ণিল বনাঞ্চল, প্রবাহমান ঝর্নাধারা, পতনশীল জলরাশি, বিস্ময়কর স্বচ্ছ পানির লেক, নয়নাভিরাম রথ, বৈচিত্রময় জলপ্রপাত ও চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য হিমালয়ের গহীন অরণ্যে লুকায়িত পানির রাজ্য, জিওজাইগো ভ্যালি, চীনাদের নিকট পরিচিতি পেয়েছে ভূ-স্বর্গ হিসেবে!

Related Articles