অবিভক্ত কোরিয়া রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাব্য উপায়সমূহ

কোরিয়া বিশ্লেষকরা মনে করে থাকেন নিকট ভবিষ্যতে না হলেও একটা সময়ে গিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া একত্রিত হয়ে যাবে। অবিভক্ত কোরিয়া রাষ্ট্র নিয়ে কোরীয়দের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়। তারা মনে করেন এতে কোরিয়া উপদ্বীপে শান্তি ফিরে আসবে। তবে সেটা হলে রাষ্ট্র গঠনের পরপরই যে প্রজন্মটা থাকবে, তাদেরকে একটা কষ্টকর যাত্রা পাড়ি দিতে হবে। সেটা নিয়ে ‘অবিভক্ত কোরিয়া রাষ্ট্র গঠনে সম্ভাব্য প্রতিকূলতাসমূহ’ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে। এই পর্বে থাকবে কীভাবে এই প্রতিকূলতাগুলো দূর করে একটা সমাধানের পথে যাওয়া যায়। আর এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে উন্নত দক্ষিণ কোরিয়াকেই। সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডগুলো উত্তর কোরিয়াতেই বেশি করতে হবে।  

কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠন

সম্ভাব্য সমাধানগুলোর একটি হতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে দুই কোরিয়ারই উল্লেখযোগ্যভাবে স্বায়ত্বশাসন থাকবে। তাদের আইন থাকবে আলাদা। এমনকি মুদ্রাব্যবস্থাও ভিন্ন থাকতে পারে। এই কনফেডারেশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে একটা প্রকৃত অবিভক্ত রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি প্রস্তুত করা, এবং উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাবের পরিমাণ কমিয়ে আনা।

কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠন করা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধারণা করা হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো কোনো না কোনোভাবে দুই কোরিয়ার শাসকরাই একমত হবেন কনফেডারেশন গঠন করার ব্যাপারে। তবে ওই কনফেডারেশনে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে বর্তমান উত্তর কোরিয়ার শাসকরা, তথা কিম পরিবার থাকার সম্ভাবনা কম। এমনকি যদি কিম পরিবারকে রাজি করানো সম্ভবও হয়, তাদের নিজেদের জনগণই অস্থির হয়ে পড়বে।

২০১৮ সালে দুই কোরিয়ার সীমান্তে পানমুনজম গ্রামে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন; Image Source: Korean Summit Press/AFP/Getty Images

বাস্তবে এমন কনফেডারেট গঠন করা তখনই সম্ভব হবে, যখন উত্তর কোরিয়ার রেজিমের পতন ঘটবে, কিংবা যদি এতে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসে তবে। তখন হয়তো পিয়ংইয়ং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভাব নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগবে না। অর্থাৎ, কেবলমাত্র কিম পরবর্তী যুগেই এই অস্থায়ী কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হবে। উত্তর কোরিয়ার এই সরকার পরিবর্তনের ঘটনাটা কী প্রক্রিয়ায় হবে তা কোনো প্রভাব রাখবে না। এটা জনতার কোনো বিপ্লবের দ্বারাও আসতে পারে, অভ্যুত্থান বা অন্য কোনোভাবেও হতে পারে। নতুন সরকার যদি দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে একত্রিত হতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী হয়, তখন এই কনফেডারেট রাষ্ট্র দেখা যেতে পারে।

তবে উত্তর কোরিয়ায় হঠাৎ যদি নিরাপত্তার কোনো সংকট দেখা যায়, তখন জরুরি ভিত্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া বা আন্তর্জাতিক বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমেও কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে। কোরিয়া উপদ্বীপ পুনরায় একত্রিত করার ব্যাপারে আপাত কনফেডারেট রাষ্ট্র গঠন করাই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য সমাধান।

অস্থায়ী এই কনফেডারেট রাষ্ট্রের সময়কালকে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কারণ এর বেশি সময় পার হয়ে গেলে উত্তর কোরীয় সাধারণ নাগরিকরা ভাবতে পারেন তাদেরকে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত জীবন ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত রেখে শুধু সস্তা শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে তারা প্রতারিত অনুভব করতে পারেন। আবার এর চেয়ে কম সময়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো আনার জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ সেখানে অনেক কাজ করতে হবে।

সীমানা অতিক্রম নিয়ন্ত্রণ

অস্থায়ী সরকার ব্যবস্থার একটা দায়িত্ব হবে দুই কোরিয়ার সীমান্ত দিয়ে জনগণের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। কনফেডারেট ব্যবস্থা সীমানা অতিক্রম করা বর্তমানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজ করে দেবে ভিসার মতো কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে। তবে এই ভিসা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার একটা পরিকল্পনা থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রথম পাঁচ বছর দুই কোরিয়ার জনগণ সীমানা অতিক্রম করার জন্য ভিসার মতো কোনো অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হবে। এই সময়টায় উত্তর কোরীয়দের সাধারণত দক্ষিণ কোরিয়ার ভূখণ্ডে কোনো চাকরি করতে দেওয়া হবে না কিংবা দীর্ঘসময় অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া হবে না। পরবর্তী বছরগুলোতে এই আইনগুলো পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হবে এবং একসময় তুলে নেওয়া হবে।

দুই কোরিয়া এক হয়ে গেলেও সীমানা দিয়ে জনসাধারণের আনাগোনা সীমিত রাখতে হবে © Jung Yeon-Je/AP

তবে এখানে একটু বাস্তববাদী চিন্তা করতে হবে। প্রশাসনিক সীমানা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের দক্ষিণ কোরিয়ায় অবৈধভাবে প্রবেশ করা থামিয়ে রাখতে পারবে না। একত্রীকরণ পরবর্তী কোরিয়া সীমান্তের সীমান্তরক্ষীরা অবৈধভাবে অতিক্রমকারীদের ওপর বর্তমান সময়ের মতো গুলি চালাবে না। দক্ষিণ কোরিয়া অনেক ধনী ও আকর্ষণীয় হওয়ায় জরিমানা বা ছোটোখাটো শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও তা খুব একটা প্রভাব রাখতে পারবে না। কারণ উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরা অনেক কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও গত তিন দশক ধরে ঝুঁকি নিয়ে দেশ ত্যাগ করে আসছেন। তাই এই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করার উপযুক্ত ব্যবস্থা হবে, উত্তর কোরিয়াকেই যদি অল্প সময়ের মধ্যে বসবাসের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলে যায়।

ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ন্ত্রণ

উত্তর কোরীয়দের সমৃদ্ধ করার জন্য তাদেরকে দক্ষিণ কোরীয়দের অবিবেচকের মতো কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করতে হবে। অস্থায়ী কনফেডারেশন রেজিম উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরে দক্ষিণ কোরীয়দের বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ দিলেও আবাদযোগ্য জমি ও বাসস্থান ক্রয় করার মতো কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে নিষিদ্ধও করতে হবে। এতে উত্তর কোরীয়দেরকে তাদের দক্ষিণী প্রতিবেশীদের লোভী আবাসন ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

১৯৪৬ সালের ভূমি সংস্কার আইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারটাও দৃঢ়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। এই ভূমির মালিকানা দাবি করা অকার্যকর বলে ঘোষণা দিতে হবে। সাবেক মালিকদের শান্ত করতে আংশিকভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। যদিও সেই মালিকদের তৃতীয় প্রজন্মরা সাধারণত এতদিনে যথেষ্ট অবস্থাসম্পন্ন হয়ে যাওয়ার কথা। তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ খুব বেশি প্রয়োজনীয় হওয়ার কথা নয়। এখানে আরেকটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে, যে পরিবারগুলো এই ভূমিগুলোর মালিকানা পেয়েছিল, তারা মূলত উপনিবেশ যুগে জাপানি জমিদারদের চাটুকার ছিল।

একত্রীকরণের পর উত্তর কোরিয়ার আবাদযোগ্য জমিগুলো কৃষকদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে; Image Source: Getty Images

উত্তর কোরিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত কৃষি সমবায়ের সম্পদগুলো গ্রামবাসীদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে এই কৃষি জমিগুলো দেওয়া যেতে পারে যারা বর্তমানে সেখানে কৃষিকাজ করছে তাদের কাছে। তবে শুরুতেই তাদেরকে সম্পত্তি হিসেবে দেওয়া হবে না। তখনও জমিগুলো রাষ্ট্রের মালিকানাতেই থাকবে। কিন্তু বিনিময়ে তাদের কর দেওয়া ছাড়া কোনো ভাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। পাঁচ থেকে দশ বছর যেসব পরিবারগুলো নিয়মিত ফসল ফলাবে আর কর জমা দেবে, তাদের স্থায়ীভাবে মালিকানা দাবি করার যোগ্য হিসাবে বিবেচনা করা হবে।

এটা অনেক উত্তর কোরীয়কে দক্ষিণের দিকে ছুটে যেতে নিরুৎসাহিত করবে। বরং তারা নিজেদের কৃষিখাতের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে থাকবে। কনফেডারেশন যুগের শেষে গিয়ে কৃষি জমি আর আবাসন প্রকল্পগুলো নিরাপদে বেসরকারিকরণ করা হবে, এবং এখানে উত্তর কোরীয়দের প্রাধান্য থাকবে। উত্তর কোরীয় কৃষকরা তখন পূর্ব জার্মানির কৃষকদের মতো নিজেদের স্বেচ্ছাসেবী সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

সামাজিক সংকটের সমাধান

কনফেডারেশন রেজিম উত্তর কোরিয়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমস্যা সমাধানেও কাজ করবে। বিশেষ করে তাদের যেন একত্রীকরণ পরবর্তী যুগের শুরুর দিকের সময়টায় কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে না হয়। কনফেডারেশন রেজিমের সময় তাদেরকে পুনঃশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় চলার মতো দক্ষ করার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশিরভাগ উত্তর কোরীয় চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলীরা মানিয়ে নিতে পারবেন না। তবে ১০-১৫ বছর সময়টা তাদেরকে হালনাগাদ করে নিতে সাহায্য করবে। অনেকে হয়তো বিকল্প আয়ের ব্যবস্থাও করে ফেলতে পারবেন। এই সময়টায় তাদের পেশা চলমান রাখতে দেওয়া হবে, তবে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহ দেওয়া হবে, এমনকি বাধ্যতামূলকও করা যেতে পারে।

সামরিক সংকটের সমাধান

দুই কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে একত্রিত করে ফেলা হবে। একত্রিত সেনাবাহিনীতে একটা বড় অংশ কোটা হিসেবে রাখা হবে উত্তর কোরীয় সৈনিকদের জন্য। সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের যদি একত্রীকরণ পরবর্তী ফোর্সে কমিশন দেওয়া হয়, তাহলে তাদের দক্ষতা ও আন্তরিক জাতীয়তাবাদী উদ্যম সেনাবাহিনীর জন্য উপকারেই আসবে। এটা নিরাপত্তার জন্যও ভালো কাজে দেবে।

অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান

উত্তর কোরীয় নাগরিকরা যেন শুধু সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে বিত্তশালী দক্ষিণ কোরীয়দের দ্বারা ব্যবহৃত না হয় কিংবা নির্যাতিত না হয়, কনফেডারেশন সরকার সেটা নিয়েও কাজ করবে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে উৎসাহ দেওয়া একটা উপায় হতে পারে।

দক্ষিণ কোরীয় ধনীদেরকে উত্তর কোরিয়ায় ধারাবাহিকভাবে মোটা অঙ্কের আর্থিক সাহায্য দিতে হবে। নির্দিষ্ট অঙ্কের সরাসরি বিনিয়োগ ও সাহায্য জরুরি হয়ে পড়বে। তবে জার্মানির মতো রাতারাতি দুই অঞ্চলের মুদ্রা ব্যবস্থা বা কারেন্সি এক না করলেই ভালো হবে। অন্তত কিছু সময় দুটি আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থা বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সমাধান

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় সিউলের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উত্তর কোরীয় শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক কোটার ব্যবস্থা রাখতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা, রাজনীতি কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গন সিউলের প্রথম সারির চার-পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া স্নাতকদের দখলে। এই পরিস্থিতি দুঃখজনক হলেও খুব দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনাও নেই।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস; Image Source: Seoul National University

কিন্তু উত্তর কোরীয়দের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা পূর্ববর্তী ব্যয়বহুল ছায়া শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে তারা দক্ষিণ কোরীয়দের সাথে কোনো প্রতিযোগিতাই করতে পারবে না। উত্তর কোরীয়দের যদি সিউল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ইয়নসেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দিতে হয়, তাহলে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলো হতে পারে অঞ্চলভিত্তিক কিংবা আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে কোটার ব্যবস্থা রাখা। কিন্তু দক্ষিণ কোরীয় অভিভাবকদের কাছে এই ব্যবস্থা জনপ্রিয় নয়। কিন্তু একত্রীকরণ পরবর্তী সংস্কার যুগে এটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।

রাজনৈতিক সংকটের সমাধান

একত্রীকরণ পরবর্তী কনফেডারেশনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা হবে খুবই বিতর্কিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে দুই ধরনের সম্ভাব্য সমাধান দেখা যেতে পারে।

প্রথমটি হচ্ছে, পুরো অন্তর্বর্তীকালীন সময়টা কিংবা শুরুর কয়েক বছর উত্তর কোরিয়া পরিচালিত হবে বাইরের কোনো সরকার দ্বারা। এরকম সরকার হয়তো সিউল থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে সেখানে ভবিষ্যতে কোনো সংকট দেখা গেলে জাতিসংঘ থেকে বাধ্যতামূলক কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সরকারের স্থানীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকবে না। তাদের কর্মকাণ্ডেও লোভী মনোভাব ফুটে ওঠবে। তারা সুযোগমতো নিজেদের পকেট ভারী করে চম্পট দেবে। ‘উত্তর কোরিয়ার ভাইসরয়েলটি’তে কিছু দক্ষিণ কোরীয় তরুণ আমলারা থাকতে পারেন, যারা সৎ বা আদর্শবান কর্মী হিসাবে কাজ করবেন। কিন্তু তারা অনেকটাই সাদাসিধে হবেন।

আরেকটি উপায় হতে পারে, একত্রীকরণের পরপরই উত্তর কোরিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এটা হয়তো আকর্ষণীয় পন্থা মনে হতে পারে। কিন্তু সেখানে বিকল্প ধারার অভিজাত শ্রেণি যদি না থাকে, তবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও কিম পরিবারের যুগের কর্মকর্তাদের আধিপত্য থাকবে। তারা যদি নাও থাকেন, তাদের সন্তান কিংবা আত্মীয়রা এই জায়গা দখল করতে পারে। এই সুযোগসন্ধানীরা তখন রাতারাতি নিজেদের আচরণ বদলে ফেলবে। তারা তখন দাবি করবে, তারা আজীবন গণতন্ত্রকামী ছিল। পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র পরবর্তী যুগে এমনটাই দেখা গিয়েছিল।

উত্তর কোরিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করার চেষ্টা করা হতে পারে; Image Source: KCNA/Reuters

এমনকি যে অভিজাতরা রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না, তাদের পরবর্তী প্রজন্মরাও দেশটির উঁচু পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একত্রীকরণ পরবর্তী সময়ে যদি বিদেশি কোনো কর্পোরেশন কর্মী নিয়োগ দিতে আসে, সেখানে পিয়ংইয়ং থেকে স্নাতক করা ইংরেজিতে দক্ষ সামাজিক দক্ষতাসম্পন্ন কোনো তরুণী আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা ইংরেজি না জানা, বহির্বিশ্বের আধুনিক অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা না থাকা তরুণীর মধ্যে প্রথমজনকেই বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

কিন্তু প্রথমজন সাবেক কোনো পার্টি সদস্যের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এমনকি রাজনৈতিক কারাগারের পুলিশ বাহিনীর সদস্য কিংবা প্রিজন ক্যাম্পের কোনো জ্যেষ্ঠ গার্ডও হয়ে থাকতে পারেন। কারণ উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র যাদের উপর মহলে ভালো জানাশোনা আছে আর যারা সরকারের অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকেন, তারাই সন্তানদের প্রথম সারির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সুযোগ পান। অন্যদিকে দ্বিতীয় তরুণীটি কিম শাসকদের প্রিজন ক্যাম্পে কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্বাসনে শাস্তি ভোগ করা প্রজন্মের উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিম পরবর্তী যুগেও তাদের তাই সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

নৈতিকতার ব্যাপার বাদ দিলেও কিম পরবর্তী যুগে পিয়ংইয়ংয়ের অভিজাত শ্রেণিরা তাদের পুরোনো অভ্যাস ধরে রাখবে। আধুনিক অর্থনীতি আর প্রযুক্তি সম্পর্কে ‘নিম্ন শ্রেণি’র চেয়ে তাদের জ্ঞান বেশি থাকায় তারা এটার অপব্যবহার করবে। তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক লোকরঞ্জনবাদী সিদ্ধান্ত নেবে। সাধারণ উত্তর কোরীয়রা তাদের সমাজ ব্যবস্থা আর অর্থনীতি নিয়ে সাধাসিধে দৃষ্টিভঙ্গি রাখায় তাদেরকে ভুল দিকে প্ররোচিত করে ভোট আদায় করে নেবে অভিজাতরা।

শেষ পর্যন্ত দুই প্রক্রিয়াই ত্রুটিপূর্ণ। যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক, সেখানে কিছু মারাত্মক ভুল, পারস্পরিক দোষারোপ, লোকরঞ্জনবাদীতা, আর দুর্নীতি অবশ্যম্ভাবী হিসাবেই বিবেচনা করতে হবে। তবে বাইরের মানুষদের দায়িত্ব দেওয়ার চেয়ে উত্তর কোরীয়দের হাতেই নিজেদের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া তুলনামূলক কম মন্দ পদক্ষেপ হবে। উত্তর কোরীয়দের নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মেটানোর সুযোগ দেওয়া উচিত। যদি তারা ভুলও করে, সেটার ফল তারাই ভোগ করবে। সেখান থেকে শিক্ষাও নিতে পারে। এছাড়া তখন এর জন্য বাইরের কাউকে দোষারোপও করার সুযোগ পাবে না।

কিম পরিবার ও আমলাদের ভবিষ্যৎ

অবিভক্ত কোরিয়া রাষ্ট্র গঠনের পর যে পদক্ষেপগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, তার মধ্যে একটি হচ্ছে মধ্য পর্যায় ও শীর্ষ পর্যায়ে থাকা আমলাদের পরিণতি নিয়ে, যারা কিম রেজিম অক্ষুণ্ণ রাখতে কাজ করছেন। একত্রীকরণ পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থায় উত্তর ও দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকদের ভালো সম্ভাবনা আছে সাবেক নিরাপত্তা পুলিশ কর্মকর্তা, গোপন তথ্যদাতা, আর কারাগারের রক্ষীদের বিচার ব্যবস্থায় নিয়ে আসার দাবি জানানো। এটা যৌক্তিক মনে হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা বাস্তবসম্মত হবে না।

উত্তর কোরিয়ার গোপন পুলিশ বাহিনীর কাছে প্রতি ৪০ থেকে ৫০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য এক জন করে তথ্যদাতা থাকে। অর্থাৎ, বর্তমানে তিন থেকে চার লক্ষ উত্তর কোরীয় নাগরিক পুলিশের তথ্যদাতা হিসাবে কাজ করছেন। অনেকেই আছেন তথ্যদাতা হিসাবে কাজ করার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। সে হিসেবে সংখ্যাটা পাঁচ লক্ষতে যেতে পারে। এছাড়া আড়াই থেকে পাঁচ লক্ষ উত্তর কোরীয় নাগরিক তাদের জীবনের কোনো সময় গোপন পুলিশ বাহিনীতে কাজ করে থাকতে পারেন। একত্রীকরণ পরবর্তী পুরো বিচার ব্যবস্থা যদি সাবেক তথ্যদাতা আর রাজনৈতিক পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কাজ না করে, সেখানে ন্যায়বিচার ও সঠিক তদন্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আরেকটি ব্যাপার বিবেচনা করতে হবে, উত্তর কোরিয়ার ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কিংবা উঁচু পদে চাকরি করা প্রত্যেকের সাথেই সরকারের আমলাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, যা সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও ছিল না। তাই কিম পরিবারের সাথে সম্পর্কিত সকলকে যদি বিচারের সম্মুখীন করে শাস্তি দিতে হয়, তাহলে ব্যবসা কিংবা পেশাগত দিক দিয়ে জড়িত সকলকেই শাস্তি দিতে হবে। সত্যি কথা বলতে, কিম পরিবারের স্বৈরতন্ত্রের সাথে জড়িত সাবেক এজেন্টদের কোনো বিচারের আওতায় আনা যাবে না। কারণ তাদের সংখ্যা অনেক। তারা কয়েক দশক ধরেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছে। সেগুলো বিস্তারিত তদন্ত করাও সম্ভব নয়। তাছাড়া এতে শিক্ষিত শ্রেণির একটা বড় অংশকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সব মিলিয়ে এটা যে শুধু অসম্ভব ব্যাপার তা-ই নয়, উত্তর কোরিয়ার সমাজ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করলে এটা ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ হবে।

কিম রেজিমকেও এ কারণে শাস্তির সম্মুখীন আনা সম্ভব হবে না। কিম পরিবার উত্তর কোরিয়ার শাসন ব্যবস্থাকে সংস্কার করছে না তাদের সম্ভাব্য পরিণতির কথা চিন্তা করেই। যদি আধুনিক বাস্তবসম্মত শাসন ব্যবস্থা প্রচলন করে, তাহলে এতে তাদের রাজনৈতিকভাবে পতন হবে, এমনকি শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে পারে এবং প্রাণও হারাতে হতে পারে। তাই উত্তর কোরিয়ার অভিজাতরা আর কিম রেজিমের সমর্থকরা হয়তো বর্তমান ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে লড়াইয়েও নামতে পারে। এক্ষেত্রে তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দিলে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ এড়ানো যেতে পারে।

কিম পরিবারের শাসকদের হয়তো বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে না © Nikkei montage/Source photos by Reuters and Getty Images

তার মানে এই নয় যে কিম রেজিমকে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য একেবারে ছেড়ে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, যেটা আংশিক সমাধান এনে দিতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে বর্ণবাদী শাসনামলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডগুলো শুধু তদন্ত করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো রায় বা শাস্তি দেওয়া হয়নি।

আরেকটা সমাধান হতে পারে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। এটা সমাজতন্ত্র পরবর্তী পূর্ব ইউরোপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এতে যারা সমাজতান্ত্রিক সরকারের গোপন পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন, মধ্যম পর্যায় থেকে শীর্ষ পর্যায়ের পার্টি সদস্য, এবং এরকম আরো কর্মকর্তাদের বিচার বিভাগ কিংবা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া হয়নি। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে সাবেক অভিজাতদের খুব বেশি সদস্যকে লক্ষ্যবস্তু বানানো ঠিক হবে না। প্রিজন ক্যাম্পের প্রশাসকের মতো কাজ করা অপরাধীদেরকে উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ শিক্ষিত প্রজন্মই একসময় চিহ্নিত করতে পারবে। তাদের ব্যাপারে তদন্ত করার ভার অনুসন্ধানী সাংবাদিক কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাস বিশেষজ্ঞদের হাতেই তুলে দেওয়া হোক। এতে সামাজিকভাবেও তাদেরকে এক প্রকার সাজা দেওয়া হবে।

কিম পরিবারেরও ব্যতিক্রম কিছু হওয়া উচিত না। তারা দেশ ত্যাগ করে চীনের ম্যাকাওতে নির্বাসনে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চীন হয়তো তাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করবে। সুইজারল্যান্ড, হংকং, ম্যাকাওতে কিম পরিবার দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি সংখ্যক অর্থ পাচার করে রেখেছে। সেগুলো বাজেয়াপ্ত করলেও খুব একটা লাভ হবে না। কারণ অবিভক্ত রাষ্ট্র গঠনে যে বিশাল অঙ্কের খরচ হবে, সেখানে এই দুই বিলিয়ন ডলার কিছুই নয়।

যে প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, এগুলোকে বিতর্কিত মনে হতে পারে। যদি বাস্তবায়িত করা হয়, ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা হয়তো এখানে অনৈতিক আপসমূলক কার্যক্রম দেখতে পাবেন। তারা হয়তো একে দুই কোরিয়ার অভিজাত শ্রেণির অনৈতিক চুক্তি হিসেবে দেখবেন। তারা এটাকে ‘গণতন্ত্র বিরোধী’ কিংবা ‘অনৈতিক’ ঘটনা হিসাবেও বর্ণনা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব জীবনে মন্দ আর অধিকতর মন্দের মধ্যে বাছাই করে নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নিতে হয়।

This is a Bengali article written about the reunification problems of North Korea & South Korea. Necessary references are hyperlinked in the article. 

Reference Book

1. The Real North Korea: Life and Politics in the Failed Stalinist Utopia by Andrei Lankov. Chapter 6: A Provisional Confederation as the Least Unacceptable Solution 

Featured Image: JUNG YEON-JE AFP

Related Articles