জিডিপির ক্রমে গোটা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ এখন লুক্সেমবার্গ। বিগত কয়েক দশক ধরে নাগরিক জীবনের সমৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি, দক্ষ দেশ পরিচালনায় লুক্সেমবার্গের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা শিল্পকে আরও বৈচিত্র্যময় করার মাধ্যমে দেশটি নিজেদের অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত আরও বেশি এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে চলেছে।

সবুজে ঘেরা লুক্সেমবার্গ; Image Source: En Circle Photos

দেশটিতে আছে ১৫৫টিরও বেশি ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের অধিকাংশই আবার বিদেশী মালিকানার। অসংখ্য ডেটা সেন্টার তৈরির মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নতিতে মাত্রাতিরিক্ত উচ্চ-গতিসম্পন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করায় গ্লোবাল কানেক্টিভিটির দিক থেকেও দেশটি আছে অনন্য উচ্চতায়। 

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, অপেক্ষাকৃত স্বল্প হারের কর্পোরেট ট্যাক্স, সুবিধাজনক ব্যবসায়িক পরিবেশ ও দক্ষ জনগোষ্ঠীই এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।

ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত লুক্সেমবার্গ, ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে জনসাধারণের জন্য বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করেছে।

বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা প্রথম দেশ; Image Source: New Age

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস, এস্তোনিয়ার ট্যালিন, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কিছু শহরসহ বিশ্বের প্রায় শতাধিক শহরে বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা দেয়ার নজির থাকলেও, দেশব্যাপী এমন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে লুক্সেমবার্গই প্রথম।

এর আগে যেসব শহর এই সেবা চালু করেছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সেই শহরগুলোর বাসিন্দারাই সুবিধাটি পেয়ে থাকেন। কিন্তু, লুক্সেমবার্গে সেখানকার সাধারণ নাগরিকদের মতো ভ্রমণকারীরাও পাবেন এই সেবা।

দেশটির গণপরিবহন মন্ত্রী ফ্রাংকোয়েস বশ বলেন, 

বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা আমাদের সামাজিক জীবনের মান বৃদ্ধিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া, আমাদের নাগরিকরাও গণপরিবহনের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব মতামত ও পছন্দ তুলে ধরেছেন। তাদের সেই পছন্দের প্রতি সম্মান রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত।

ট্র্যাফিক জ্যামের জন্য বহুদিন ধরে নানা সমস্যায় ভুগতে থাকা লুক্সেমবার্গের সড়কগুলোতে প্রায় ৪৭% যাতায়াতই হয় ব্যক্তিগত গাড়িতে। বাসে যাতায়াতের পরিমাণটা সেখানে ৩২% ও ট্রেনের ক্ষেত্রে ১৯%।

দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লুক্সেমবার্গ ইকোলজিক্যাল মুভমেন্টের প্রেসিডেন্ট ব্লাঞ্চ ওয়েবার বলেন,

বহু বছর ধরে সড়ক পথে বিনিয়োগ করেছি আমরা। সরকারও চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু তবুও গণপরিবহনের উন্নয়নে এখনো বড় রকমের ঘাটতি রয়ে গেছে।

ছয় লক্ষ চৌদ্দ হাজার জনসংখ্যার দেশটি ইউরোপের ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেও, যে পদক্ষেপ তারা নিয়েছে, তার পূর্ব নজির নেই অন্য কোনো দেশে। নিঃসন্দেহে উদ্যোগটি যথেষ্ট প্রশংসনীয়।

লুক্সেমবার্গের সড়কপথে সেখানকার বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা এখন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে পারবে, কিনতে হবে না কোনো টিকেট। যদিও ফার্স্ট-ক্লাস ট্রেনের যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটবে।

বাস, ট্রেনের পাশাপাশি রয়েছে ট্রাম লাইন; Image Source: Euro News

প্রাথমিকভাবে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে খরচ হবে ৪১ মিলিয়ন ইউরো, যা কি না পাউন্ডের হিসাবে ৩৫ মিলিয়ন ও মার্কিন ডলারের হিসেবে ৪৪ মিলিয়ন। এই বিশাল অঙ্কের বাজেটের যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করা হবে বিনামূল্যে ভ্রমণ সেবা। কিন্তু তা-ই বলে ভাববেন না যে, সরকার কোনো রকম ভর্তুকি দিচ্ছে। বরং জনগণের ট্যাক্সের টাকাতেই হবে এই সেবার সকল ব্যবস্থা। 

এ ব্যাপারে ফ্রাংকোয়েস বশ বলেন,

বিনামূল্যে বলা হচ্ছে মানে তো এই না যে, কাউকেই পয়সা দিতে হবে না। অবশ্যই সরকার লুক্সেমবার্গকে আরও বেশি গতিশীল করে তুলতে বদ্ধপরিকর। আর সে লক্ষ্যে লুক্সেমবার্গকে গতিশীলতার পরীক্ষাগার হিসেবেও অধিষ্ঠিত করতে চাই আমরা।

সরকারি হিসেব মতে, এ প্রকল্পে মোট খরচ হবে ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর চেয়েও বেশি। যদিও সড়কপথে ভাড়া থেকে মুনাফা লাভের পরিমাণটা তুলনামূলকভাবে কম। এতে করে পরিবহন খাতে নিয়োজিত কোনো কর্মীকে তাদের চাকরি হারাতে হবে না। পাশাপাশি প্রতিদিন টিকেট চেক করে নষ্ট হওয়া সময়টুকুও বেঁচে যাবে তারা। 

কর্ম দিবসগুলোতে লুক্সেমবার্গে কর্মরত জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রায় দুই লক্ষাধিক কর্মী প্রতিদিন যাতায়াত করে বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে। যার পেছনে মূল কারণ হলো উচ্চ বেতন ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক কাঠামো।

লুক্সেমবার্গ সিটিতে কর্মব্যস্ত সকাল; Image Source: RTL

২৯ ফেব্রুয়ারির আগে যে খুব বেশি খরচ হতো, তা-ও কিন্তু না। লুক্সেমবার্গে একবার ভ্রমণ করলে, টিকেটের মূল্য ২ ইউরো। কেউ যদি সারাদিনের জন্য পাস টিকেট কিনতে চায়, সেক্ষেত্রে খরচ মাত্র ৪ ইউরো। আর অধিকাংশ কর্মীদের বাৎসরিক ট্রাভেল পাস সরকারের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়। কাজেই, গণপরিবহনে সাধারণত কারো খুব একটা খরচ করার প্রয়োজনও হয় না।

বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা প্রকল্প শুরু করতে লুক্সেমবার্গ সরকার গত কয়েক বছর ধরেই কাজ করে চলেছে। আর এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

  • নতুন এ প্রকল্পের ফলে উচ্চ করদাতাদের কাছ থেকে সরকার আরও বেশি লাভবান হবে। প্রকল্পটি পরিচালিত হবে জনগণের ট্যাক্সের পয়সায়। পুরো প্রকল্পটি এমনভাবেই সাজানো হয়েছে, যাতে করে এর সিংহভাগ প্রদান করা লাগবে উচ্চ করদাতাদের।

  • এই প্রকল্পের ফলে সড়ক পথে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সংখ্যা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর অন্তর্ভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রতি হাজার মানুষে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা লুক্সেমবার্গেই সবচেয়ে বেশি।

  • এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে গণপরিবহনে চলাচল করা যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে শতকরা ২০ শতাংশ পর্যন্ত।

  • এর ফলে লুক্সেমবার্গের নাগরিকরা তাদের দেশের পরিবেশগত সমস্যার ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন হবে।

  • দেশটির ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যার সেবা চাহিদা পূরণে পরিবহন নেটওয়ার্ককে আরও বেশি উন্নত করে তুলবে এই প্রকল্প।

একটি উন্নত ও ধনী রাষ্ট্র হিসেবে, লুক্সেমবার্গের সড়কপথের মান মোটেই আশানুরূপ নয়। দিনের ব্যস্ত সময়গুলোতে প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে চোখে পড়ে যানজটের দীর্ঘ সারি। বর্তমানে সচল বাসগুলো যেমন সেকেলে ধাঁচের, তেমনি ট্রেনগুলোর নিয়মিত বিলম্বের জন্য দায়ী।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় ডিজেল ও পেট্রোলের বাজারমূল্য লুক্সেমবার্গে অপেক্ষাকৃত কম। তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকে মানুষ যে কেবল অফিস ধরতেই ছুটে আসে তা কিন্তু নয়। বরং অপেক্ষাকৃত কম দামে পেট্রোল-ডিজেল কিনতেও আসে অনেক ‘ফুয়েল ট্যুরিস্ট’!

ব্যক্তিগত গাড়ির ভীড়ে যানজট সেখানে নিত্যদিনকার সমস্যা; Image Source: DW

অবশ্য নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান যদিও করা সম্ভব না। কারণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে যারা আসে, তাদের সবার বাড়ির কাছাকাছি ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায়, তাদের অধিকাংশের পক্ষেই গণপরিবহনে আসা সম্ভব হবে না। যদিও, লুক্সেমবার্গের অধিবাসীরা, যারা বর্তমানে সাইকেলে চলাচল করে- নতুন এই প্রকল্পের ফলে নিঃসন্দেহে তারা গণপরিবহনে আরও বেশি বেশি চলাচল করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

সড়কপথের মানোন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে লুক্সেমবার্গ সরকার। নতুন ট্রাম নেটওয়ার্ককে আরও বেশি সম্প্রসারিত করার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, ট্রেন ও বাস সিস্টেমেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ। কাজেই, সুফল পেতে যে আরও কয়েকবছর লেগে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এস্তোনিয়ার রাজধানী ট্যালিনেই সর্বপ্রথম সেবাটির সূচনা হয়েছিল; Image Source: The Economist

২০১৩ সালে এস্টোনিয়ার রাজধানী ট্যালিনে প্রথমবারের মতো বিনামূল্যে গণপরিবহন সেবা চালু হয়। কিন্তু সেটা ছিল শুধুমাত্র ট্যালিনের বাসিন্দাদের জন্য। যদিও, বাইরের মানুষদের জন্য সেবাটি সম্প্রসারিত করার সিদ্ধান্তটাও ফেলে দেয়নি শহর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেটা করতে, যে বাড়তি ২০ মিলিয়ন ইউরো খরচ হবে, তাতে তারা মোটেও আগ্রহী নয়।

এছাড়াও ২০১৮ সালে উত্তর ফ্রান্সের শহর ডানকার্কে শহরটির দুই লক্ষ বাসিন্দার জন্য বিনামূল্যে ভ্রমণ সেবা চালু করার পর থেকে, গণপরিবহনে যাত্রী সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা যায়। এই সাফল্যে অভিভূত হয়ে, প্যারিসের মেয়র অ্যান হিডালগো তার মেয়র নির্বাচনী প্রচারণায় আঠারো বছরের কম বয়সী সকল প্যারিস সিটিজেনের জন্য বিনামূল্যে ভ্রমণ সেবার সুযোগ দেয়ার কথা বলেন।

প্রাথমিকভাবে প্যারিসের সব বয়সী মানুষের জন্য সেবাটি উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও, সেক্ষেত্রে প্রতিটি পরিবারের জন্য ৫০০ ইউরো করে প্রয়োজন হবে। নাগরিক সেবায় এমন বিলাসিতা কোনোভাবেই সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য না হওয়ায়, পরিকল্পনাটিতে পরিবর্তন আনা হয়। 

ফ্রান্সের ডানকার্ক শহরও আছে এ তালিকায়; Image Source: France24

লুক্সেমবার্গ সরকার দেশটির জিডিপির একটি নির্দিষ্ট হার ব্যয় করবে এই প্রকল্পে। ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় পরিবহন ব্যবস্থায় লুক্সেমবার্গ অধিক ব্যয় করে থাকে। এই প্রকল্প অনুসারে, এক বছরে জনপ্রতি খরচ করবে ৬০০ ইউরো। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত গণপরিবহন খাতে দেশটি খরচ করবে প্রায় চার বিলিয়ন ইউরো।

যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের ফলে আবাসন খাতের ঘাটতি কোনোভাবেই পূরণ হবে না। দেশটির আবাসন খাতের সীমাবদ্ধতার কারণে ইতিমধ্যেই বহু নাগরিক চাকরিতে বহাল অবস্থাতেই পাড়ি জমিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে সেখান থেকেই লুক্সেমবার্গের অবস্থিত কর্মক্ষেত্রে এসে এসে কাজ করে যান। তাই যোগাযোগ খাতের পাশাপাশি নাগরিক জীবনের মানোন্নয়নে আবাসন খাতেও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী।