এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

ইংরেজি ‘Cult’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ অর্চনা বা কোনো কিছুর প্রতি প্রবল শ্রদ্ধা। প্রায়োগিক অর্থে ‘কাল্ট’ হলো একটি সংগঠন যা এক বা একাধিক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি বড় অংশের মানুষকে কিছু নির্দিষ্ট বিশ্বাস বা জীবনাচরণ অনুসরণে বাধ্য করে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাল্টের নেতা ধর্মের শিক্ষা ও বিশ্বাস নিজের মনমতো ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করেন ও মানুষকে আকৃষ্ট করেন। ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যার সাথে থাকে কাল্ট নেতার ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ। কাল্টের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, অনুসারীদের বোঝানো হয় যে, তারা কাল্টে যোগদানের মাধ্যমে সামাজিক, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, কাল্টগুলো তথাকথিত আধ্যাত্মিক নেতাদের অর্থ লুট, শোষণ ও যৌন নিপীড়নের হাতিয়ার মাত্র।

প্রিয় পাঠক, চলুন বিশ্বের এমনই কিছু অদ্ভুত কাল্টের কথা জেনে নেয়া যাক। আজ দ্বিতীয় পর্বে থাকছে 'দ্য রজনীশ মুভমেন্ট'-এর কথা।

দ্য রজনীশ মুভমেন্ট - বিতর্কিত নব্য সন্ন্যাসধর্ম

'দ্য রজনীশ মুভমেন্ট' শুরু করেন ভগবান শ্রী রজনীশ। ১৯৩১ সালে ভারতে চন্দ্র মোহন জৈন হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদ সম্পর্কে বরাবরই তার নিজস্ব মতামত ছিল এবং তিনি তা প্রকাশ্যে বলতেন। এর মাঝে ২১ বছর বয়সে তার ‘আধ্যাত্মিক বোধন’ (Spiritual Awakening) ঘটে বলে জানা যায়। দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেবার পর রায়পুর সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্ত বিতর্কিত মন্তব্য ও আচরণের জন্য তাকে সেখান থেকে সরে আসতে হয়। পরবর্তীতে জাবালপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

Image source: the quint

বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিরত থাকাকালীনই তিনি ভারতজুড়ে ভ্রমণ করে নিজস্ব মতবাদ প্রচার করতে লাগলেন। তিনি বিশেষভাবে সমালোচনা করতেন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের। সমাজতন্ত্র ও মহাত্মা গান্ধীর আদর্শেরও বিরোধী ছিলেন তিনি। তার মতে, ভারতের এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল পুঁজিবাদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। এছাড়া রজনীশ মুক্ত যৌনতার পক্ষপাতী ছিলেন। তার মতে, যৌনতার মাধ্যমে মানুষ ‘মহাজ্ঞান’ বা ‘মহাচৈতন্য’–এর খোঁজ পেতে পারে।

তার এসব মতবাদ বিতর্ক সৃষ্টি করার সাথে সাথে তাকে জুটিয়ে দিয়েছিল অনুগত কিছু শিষ্য, যার মধ্যে ছিলেন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এই শিষ্যরা রজনীশকে গুরু মেনে তার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ ও পরামর্শ নিতে আসতেন। তার সঙ্গে গুরুর জন্য নিয়ে আসতেন দান ও দক্ষিণা। এভাবে ভারতে রজনীশের নাম ডাক যেমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তেমনি বাড়তি উপার্জনের পথও খুলে গেল। ১৯৬২ থেকে তিনি তার আশ্রমের জন্য সদস্য সংগ্রহ করেন ও বিভিন্ন স্থানে মেডিটেশন ক্যাম্পের আয়োজন করেন। ধ্যানের মাধ্যমে আত্ম অনুসন্ধানের এই প্রক্রিয়ার নাম ছিল ‘জীবন জাগৃতি আন্দোলন’। এভাবেই চলছিল; এর মধ্যে ১৯৬৬ সালে জাবালপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথায় অধ্যাপনা ছেড়ে দিতে হয় রজনীশকে।

চাকরি ছেড়ে রজনীশ পুরোপুরি আধ্যাত্মিক গুরু ও মেডিটেশনের শিক্ষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘ডায়নামিক মেডিটেশন’ নামে একধরনের ধ্যান পদ্ধতি প্রচলন করেন তিনি। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে পশ্চিমারাও রজনীশের মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে। ১৯৭৪ সালে পুনেতে তার প্রথম আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। শিষ্যরা গেরুয়া বসন ধারণ করে, গলায় ফুলের মালা পরে, সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত হয়ে আত্ম-অনুসন্ধান করতে লাগলেন। ফুলের মালাতে আবার রজনীশের ছবিসমেত লকেটও থাকতো। পশ্চিমা শিষ্যরা ভারতীয় নাম গ্রহণ করে। আশ্রমে অনেক ধরনের দলগত কার্যক্রম চলত, যার মধ্যে অবাধ যৌনাচার ছিল অন্যতম। এই শিষ্যরা নব্য সন্ন্যাসী হিসেবে পরিচিত ছিল। মুক্ত যৌনতার প্রতি এই সমর্থনের কারণে গণমাধ্যমে রজনীশকে 'সেক্স গুরু' বলে অভিহিত করা হয়।

Image source: pavitro

রজনীশের নব্য সন্ন্যাসধর্ম জনপ্রিয় হবার কারণ ছিল তার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। সাধারণত সন্নাসীরা যেখানে সংসারবিমুখ ও ত্যাগী মনোভাবের হন, সেখানে রজনীশ ভোগের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও দৈব সাধনা সম্ভব বলে প্রচার করলেন। জাগতিক সুখ-সুবিধা ভোগ করে পরমার্থ খুঁজে পাবার এই ধারণা পুঁজিবাদী পশ্চিমের সাথেও বেশ ভালভাবে খাপ খেয়ে গেল।

রজনীশের কয়েকজন বিখ্যাত শিষ্যের মধ্যে বলিউড অভিনেত্রী পারভিন ববি, অভিনেতা বিনোদ খান্না, পরিচালক মহেশ ভাট, দ্য হাফিংটন পোস্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা আরিয়ানা হাফিংটন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। শেষ পর্যন্ত যদিও এঁরা সবাই রজনীশের সাথে ছিলেন না।    

এর মধ্যে আশ্রমে সদস্য সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে আর স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। সেই সাথে ছিল সরকার ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের তরফ থেকে বিরোধ। সব মিলে প্রয়োজন পড়ল আশ্রম অন্য কোথাও সরিয়ে নেবার। রজনীশ বেছে নিলেন আমেরিকার ওরেগন। ১৯৮১ সালে হাজার দুয়েক শিষ্য নিয়ে চলে গেলেন সেখানে এবং শুরু করলেন নতুন এক শহর তৈরির কাজ, যার নাম ছিল রজনীশপূরম।   

ওরেগনের স্থানীয়রা রজনীশপূরমের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, যখন দেখা গেল রজনীশ রোলস রয়েস আর প্রাইভেট জেটের মালিক বনে গেছেন। এ সন্দেহ পরবর্তীতে রূপ নেয় প্রকাশ্য বিরোধে। আশ্রম তুলে দেবার জন্য উঠে-পড়ে লাগে ওরেগনবাসী। টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে পড়েন শিষ্যরাও, যেখানে অপরাধ করতেও দ্বিধা করেননি তারা। স্টেট অ্যাটর্নি চার্লস এইচ টার্নারসহ কয়েকজনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তবে অপরাধের প্রশ্নে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন মা আনন্দ শীলা, রজনীশের সহকারী এবং অন্যতম আলোচিত, গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী শিষ্যা।

Image source: Vulture

স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসন জিতে রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে আশ্রম টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা করলেন রজনীশপূরমের শিষ্যরা। জয় নিশ্চিত করার জন্য প্রথমে ভোট জালিয়াতির চেষ্টা করেন মা আনন্দ শীলা। তাতে ব্যর্থ হবার পর এমন এক চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিলেন যার নজির পাওয়া মুশকিল। ১৯৮৪ সালে করে বসলেন আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জৈবসন্ত্রাস আক্রমণ (Bioterror Attack)।

বিরোধী প্রার্থীকে যাতে ভোটাররা ভোট দিতে না পারে সেজন্য খাবারে বিষক্রিয়া ঘটালেন। স্থানীয় দশটি রেস্টুরেন্ট ও সালাদ বারের খাবারে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল স্যালমোনেলা এন্টেরিকা। ৭৫০ জন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে এতে। এক বছর পর প্রমাণিত হয় যে এ বিষক্রিয়া স্বাভাবিক ছিল না, বরং ইচ্ছে করে ঘটানো হয়েছিল। রজনীশপূরমের ল্যাবরেটরিতে পাওয়া যায় সেই ব্যাকটেরিয়ার নমুনা যা বিষক্রিয়া ঘটানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

রজনীশ এ ঘটনায় নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। দায়ী করেন কয়েকজন শিষ্যকে। ওদিকে মা আনন্দ শীলা দাবি করেন, রজনীশ সব জানতেন এবং তার নির্দেশনা মতোই এ কাজ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মাদক পাচার, হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য যেসব অভিযোগ শিষ্যদের বিরুদ্ধে আছে তাতে রজনীশও সমান অংশীদার। এর পরেই শীলার সাথে রজনীশের বিরোধ শুরু হয়। ধীরে ধীরে আশ্রমও ভেঙে পড়তে থাকে। শীলা আশ্রম ছেড়ে পালিয়ে যান ইউরোপে, সেখানে পরে গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে স্যালমোনেলা-হামলা, কাউন্টি অফিসে আগুন লাগানো ও আশ্রমে নজরদারির অভিযোগ প্রমাণিত হয়। আমেরিকায় বিচার শেষে ২০ বছরের কারাদণ্ড হয় তার, অবশ্য ৩৯ মাস পর মুক্তি পেয়ে যান। তারপর থেকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও ডকুমেন্টারিতে অংশ নিয়েছেন।

১৯৮৫ সালে রজনীশের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয় ইমিগ্রেশন ফ্রড। আমেরিকা থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়, ফলে বাধ্য হয়ে ফিরে আসেন ভারতে। শিগগিরই পেয়ে যান হাজার পনের শিষ্য, ফলে আশ্রম জমে ওঠে আবার। ১৯৮৯ সালে রজনীশ বৌদ্ধ নাম অশো (Osho) গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সালে পুনেতে নিজ আশ্রমে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

রজনীশ না থাকলেও আজও রয়ে গেছে তার প্রভাব। ভারতে তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া নেতিবাচক মনোভাব তার মৃত্যুর পর অনেকটাই বদলে যায়। রজনীশের লেখা সমস্ত বই ভারতের জাতীয় সংসদের গ্রন্থাগারে স্থান পেয়েছে। বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ভাষায় তার লেখা অনূদিত হয়েছে। পুনে ভারতের অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ রজনীশের কারণেই, সেখানে তার আশ্রম Osho International Meditation Resort– এ রূপান্তরিত করা হয়েছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় দু’শ Osho Centre রয়েছে। তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি, তার মধ্যে সর্বশেষ ২০১৮ সালের নেটফ্লিক্সের “Wild Wild Country”।

Image source: India Travelite

মা আনন্দ শীলা এখনও বেঁচে আছেন এবং হয়ে আছেন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বই লিখেছেন, কিছু ডকুমেন্টারিতে অংশ নিয়েছেন এবং আরো কয়েকটিতে অংশ নেবার কথা রয়েছে। বলিউডে তার জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি হবে, যেখানে তার ভূমিকায় দেখা যাবে অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাসকে।

দ্য রজনীশ মুভমেন্ট যে শিগগিরই শেষ হচ্ছে না, এ কথা হলফ করেই বলা যায়।