বতসোয়ানা: উন্নয়নে আফ্রিকার রোল মডেল হওয়ার গল্প

১৯৬৬ সালে বতসোয়ানার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যখন দখলদার ব্রিটিশদের কাছে স্বাধীনতার দাবি নিয়ে হাজির হয়, তখন পশ্চিমা গণমাধ্যম তাদেরকে আখ্যায়িত করে ‘খুব সাহসী নয়তো খুব বোকা’ হিসেবে। অবশ্য পশ্চিমা গণমাধ্যমের এমন অদ্ভুত আখ্যা প্রদানের কারণও ছিল।

বতসোয়ানায় তখন পাকা রাস্তা ছিল মাত্র ১২ কিলোমিটার, শিক্ষার হার মাত্র ২৫ শতাংশ; অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতো পশুপালন ও কৃষিকাজের মাধ্যমে, পৃথিবীর সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত পঁচিশটি দেশের মধ্যে একটি ছিল তারা। এরকম আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে যখন একটি দেশ স্বাধীনতা লাভের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন রীতিমতো অবাক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন, বতসোয়ানা শেষপর্যন্ত টিকে যেতে পারবে না, কয়েক বছর যেতেই ব্যর্থ রাষ্ট্রের কাতারে নাম লেখাবে। কিন্তু তারা সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতামতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদেরকে পুরো বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

Ghjklll
ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে বতসোয়ানা; image source: nationalarchieves.gov.uk

বতসোয়ানার উত্থানের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘ভাগ্য’। শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবে ভাগ্যের সহায়তা ছাড়া এত দ্রুত উন্নয়নের মুখ দেখা সম্ভব হতো না দেশটির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পক্ষে। ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের তিন বছর পরই বিখ্যাত খনিজ পদার্থ উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ডি বিয়ার্স গ্রুপ ঘোষণা করে, তারা বতসোয়ানায় এমন পাথরের সন্ধান পেয়েছে, যেগুলোতে হীরা পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়। বতসোয়ানার ভাগ্য অবশ্যই ভালো বলতে হয়, কারণ স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ব্রিটিশ শাসনামলে যদি হীরার সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে দেখা যেত ব্রিটিশ বেনিয়ারা হীরা লুটপাট করে নিচ্ছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতো বতসোয়ানার সাধারণ মানুষ।

দেশে কোনো দামী খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে সেখান থেকে যেন রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়– এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তায় রাষ্ট্রের প্রধান কর্তাব্যক্তিদের উপর। ১৯৬৭ সালেই বতসোয়ানার আইনসভায় খনিজসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়, যে আইনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উত্তোলিত খনিজ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ দেশটির সরকার পাবে– এরকম বিধান রাখা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, বিদেশি কোম্পানিগুলো উৎকোচের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিদের নিজেদের পক্ষে টেনে নেয় এবং খনিজ পদার্থের উপর লুটপাট চালায়। বতসোয়ানার ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে নি, রাজনৈতিক নেতারা বহুজাতিক কোম্পানির অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে যাননি। স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম দুই প্রেসিডেন্ট শুধু দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য যা করা দরকার, সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন। তাই সেখানকার জনগণ হীরা উত্তোলনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের পূর্ণ সুফল ভোগ করেছে।

গগজজজজহ
হীরকের খনি বদলে দিয়েছে বতসোয়ানার ভাগ্য; image source: theatlantic.com

ব্রিটিশরা যখন বতসোয়ানা ছেড়ে যায়, তখন দেশটিতে শিক্ষার হার ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ। উচ্চশিক্ষার হার ছিল আরও হতাশাজনক, মাত্র ২২ জন মানুষ ছিল যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেছিল, তা-ও আবার সেগুলো ছিল বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতা লাভের পর দেশটির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শিক্ষার গুরুত্ব ঠিকই উপলব্ধি করেন। এজন্য হীরা উত্তোলন ও কৃষিশিল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় আয়ের এক বিরাট অংশ তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করেন। ২০১৩ সালে বতসোয়ানার শিক্ষার হার ছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ। ১৯৮২ সালে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, নাম ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব বতসোয়ানা’। বর্তমানে বতসোয়ানায় আটটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সেক্টরের জন্য যোগ্য, দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছে।

বতসোয়ানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেখানকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আফ্রিকার অনেক দেশে স্বাধীনতা লাভের পর দেখা গিয়েছে ক্ষমতা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সেসব দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলে একসময় কোনো সমঝোতায় আসতে না পেরে বিবদমান পক্ষগুলো গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, ধ্বসে পড়ে দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো। উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমানের অবনমন দেখা দেয়। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে দেখা যায়, বতসোয়ানায় গৃহযুদ্ধ বা কোনো অভ্যন্তরীণ সংঘাত দেখা যায়নি যেগুলো রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বতসোয়ানায় নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কখনও সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায়নি কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী নৈরাজ্যের আশ্রয় নেয়নি। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্যতম পছন্দের দেশ ছিল বতসোয়ানা।

১৯৬৬ থেকে ১৯৯৬– এই ত্রিশ বছরে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক অগ্রগতি হওয়া দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল বতসোয়ানা। ১৯৯০ সালে প্রতিবেশী জিম্বাবুয়ের তুলনায় বতসোয়ানার মাথাপিছু আয় ছিল তিন গুণ, বর্তমানে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট গুণে। স্বাধীনতার সময় যে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো বলতে কিছুই ছিল না, সে দেশটি স্রেফ খনিজসম্পদ ও পর্যটনশিল্প কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের শিখরে উঠেছে।

আফ্রিকা মহাদেশের এক বড় সমস্যা দুর্নীতি। এই মহাদেশের দেশগুলোর মাঝে সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে বতসোয়ানার। এমনকি অনেক সময় কম দুর্নীতির দেশ হিসেবে ইতালি কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপের দেশের সাথেও পাল্লা দিয়েছে তারা। স্বাধীনতার পর এমনভাবে আইনগুলো প্রণয়ন করা হয়েছিল যাতে সরকারি কিংবা বেসরকারি কর্তাব্যক্তিরা জবাবদিহিতার বাইরে যেতে না পারে।

ততগহহজ
বতসোয়ানার প্রেসিডেন্টরা কখনোই জনগণের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু ভাবেননি; image source: botswanayouth.com

এক হীরার খনির জন্য বিপুল উন্নয়ন হলেও বতসোয়ানার অর্থনীতি এখনও বৈচিত্র্যময়তা লাভ করতে পারেনি। মোট জাতীয় উৎপাদনের ৩৫ শতাংশ এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ শতাংশই আসে খনি থেকে উত্তোলিত হীরার মাধ্যমে! খনিজ পদার্থের উপর অতিনির্ভরশীলতা একটি দেশকে অনেক সময় বিপাকে ফেলে দেয়, যাকে ‘রিসোর্স কার্স’ (Resource Curse) হিসেবে অভিহিত করা হয়। আফ্রিকার আরেক দেশ নাইজেরিয়া এই রিসোর্স কার্সের একটি বড় উদাহরণ। যুগোপযোগী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য হীরার মতো খনিজদ্রব্যের ওপর এত নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও কখনও এই অভিশাপের কবলে পড়তে হয়নি বতসোয়ানার। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন শিল্পের প্রসার ঘটাতে বেশি আগ্রহী। ফলে একদিকে যেমন হীরার উপর নির্ভরশীলতা কমানো যাবে, একইসাথে বেকারত্বের হারও কমে আসবে।

এএুহজজক
দ্য ইউনিভার্সিটি অব বতসোয়ানা, দেশটির প্রথম উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান; image source: briefly.co.za

সৌভাগ্য, সুদক্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সঠিক পরিকল্পনা একটি দেশকে কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবর্তন করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানা। অন্যান্য অনেক আফ্রিকান দেশের জন্য স্বাধীনতা অভিশাপ বয়ে এনেছে। এখনও অনেক দেশে সশস্ত্র সংঘাত চলছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাঝে। বতসোয়ানায় সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাধীনতা এসেছে আশীর্বাদ হয়ে। টানা এতগুলো বছর ধরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

আফ্রিকার যে দেশটি কয়েক দশকও টিকতে পারবে না বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল বিশেষজ্ঞরা, সেই দেশই এখন আফ্রিকার অন্যান্য দেশের কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। আফ্রিকা মানেই অ্যাঙ্গোলা, মালি কিংবা সোমালিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল নয়, আফ্রিকা মানে বতসোয়ানার মতো উচ্চ-মধ্য আয়ের শান্তিপূর্ণ দেশও।

Related Articles