দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের বদলে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি

দেশটির আয়তন আমাদের বাংলাদেশের প্রায় সমান। চারদিক স্থলভাগ দিয়ে ঘেরা দেশটির বিশাল আয়তনের প্রতিবেশী দুটি দেশই পারমাণবিক বোমার অধিকারী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়া ও ধর্মীয় নান্দনিক সব উপাসনালয়ের সৌজন্যে দেশটিতে প্রচুর পরিমাণ পর্যটকের আগমন ঘটে প্রতিবছর, যেটি দেশটির অর্থনীতিতে বেশ জোরালো ভূমিকা রাখে। আরও একটি কারণে দেশটি অনন্য। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র এই দেশটিতেই কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রয়েছে এখন পর্যন্ত। বলা হচ্ছিল নেপালের কথা।

ৃশৃশৃয়ৃয়ৃস

পর্যটনশিল্পের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের সুখ্যাতি রয়েছে;
image source: thrplanetd.com

নেপালের যে দুটো পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের নাম বলা হলো, সেগুলো নিঃসন্দেহে ভারত ও চীন। দুটো দেশই আঞ্চলিক রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কয়েক দশক ধরে। এর মধ্যে চীন অর্থনীতিতে ভারতের চেয়ে ঢের এগিয়ে। খোদ ভারতেরই বাজার চীনা পণ্য দিয়ে রীতিমতো সয়লাব। আমেরিকার মতো প্রচন্ড শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের সাথে পাল্লা দিচ্ছে চীন। তবে ভারতও যে খুব পিছিয়ে আছে, সেটি বলার অবকাশ নেই। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভারতে যেসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। বিশাল বাজার ও বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ ভারতের জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক হিসেবে ধারণা করা হয়।

অর্থনীতির জন্য নেপালকে বিশেষভাবে ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। এজন্য নেপালের ভৌগলিক অবস্থানের দায় রয়েছে। নেপালের তিনদিকেই ভারত। সেই সাথে স্থলবেষ্টিত নেপালের সাথে কোনো সমুদ্রের সংযোগ নেই। ফলে ভারতকে এড়িয়ে গিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনা করা নেপালের পক্ষে দিবাস্বপ্নের চেয়ে কম কিছু নয়। ভারতের বহুমাত্রিক অর্থনীতি নেপালের সব ধরনের পণ্যের চাহিদা মেটাতে সক্ষম, তাই নেপালেরও বিকল্প খোঁজার প্রয়োজন হয়নি।

ব ণমঙঙমঙঙ

এতদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকার কারণে রাজনৈতিকভাবেও ভারতের বলয়ে থাকতে হয়েছিল নেপালকে। কেপি শর্মা ওলি দায়িত্ব নেয়ার পরে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে;
image source: orfonline.org

নেপালের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতো গভীর, তা কিছু উপাত্তের সাহায্যে বুঝতে সহজ হবে। নেপাল মোট আমদানি বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন করে ভারতের সাথে, যেখানে চীন থেকে মাত্র ১৪ শতাংশ পণ্য আমদানি করা হয় নেপালে। নেপালের রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ভারত সবচেয়ে বড় অংশীদার। নেপালের পক্ষ থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানিপন্য ভারতে পাঠানো হয় প্রতি বছর। নেপালের জ্বালানি কিংবা ওষুধ থেকে শুরু করে প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের যোগান দিয়ে থাকে ভারত।

আমদানি-নির্ভর নেপালের অর্থনীতির একটি বড় অংশ আসে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে। এক্ষেত্রেও ভারত নেপালের ত্রাতার ভূমিকা পালন করছে। এই বছর নেপাল ভারত থেকে প্রায় ৩০৫ মিলিয়ন নেপালি রূপি রেমিট্যান্স হিসেবে আয় করেছে। অবশ্য ভারতও বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আয় করে নেপাল থেকে।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম সবসময়ই একটি বড় নির্ধারক। ভারত এবং নেপাল– উভয় দেশেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যগরিষ্ঠ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুটি পৌরাণিক চরিত্র রাম এবং সীতার সাথে যৌথভাবে ভারত এবং নেপালের নাম জড়িয়ে আছে। এছাড়াও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও ভারতের সাথে নেপালের বিরাট মিল রয়েছে। উভয় দেশেরই জনগণের খাদ্যাভাস প্রায় একই ধরনের। নেপালে সবচেয়ে বেশি পর্যটক কিংবা তীর্থযাত্রীর আগমন ঘটে ভারত থেকে। ভারতের বলিউডের তৈরি চলচ্চিত্রগুলো নেপালেও ভীষণ জনপ্রিয়। উল্টোভাবে নেপালের তৈরি চলচ্চিত্র ও গান উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতেও বেশ জনপ্রিয়।

অর্থনৈতিকভাবে নেপাল ভারতের উপর নির্ভরশীল হলেও ২০১৫ সালের একটি ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে।

২০১৫ সালে সংবিধান সংশোধন ও আইন প্রণয়নে ফলে উদ্ভূত বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে নেপালের উপর। এই অবরোধ আরোপের ফলে নেপালের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই নেপাল ভারতের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করে। এই সুযোগে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ চীন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সেই সময়ে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালের ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে ভারতের অবরোধ আরোপ করা ছিল ভারতীয় বৈদেশিক নীতিনির্ধারকদের বিরাট বড় ভুল, যার খেসারত ভারতকে দিতে হচ্ছে এখন।

২০১৫ সালে যেবার ভূমিকম্পে অবকাঠামোগতভাবে বিধ্বস্ত নেপালের উপর যেসময় ভারত অবরোধ আরোপ করলো, কাকতালীয়ভাবে সেসময়ই চীন ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প শুরু করে। এই প্রকল্পের অধীনে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে বিরাট অংকের অর্থ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছিল, যা নেপালের জন্য বড্ড দরকার ছিল সেসময়। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সালে ভারতের তীব্র বিরোধিতার পরেও নেপাল ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ দেয়।

২০১৬ সালে চীনের সাথে নেপাল একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুসারে নেপালকে চীনের চারটি সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার দেয়া হয়। চীনের চারটি সমুদ্র বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের ঘটনা ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে নেপালের জন্য বেশ তাৎপর্যময় ঘটনা। কারণ আগে যোগাযোগের সুবিধার জন্য কলকাতা বন্দরের সম্পূর্ণ মুখাপেক্ষী ছিল নেপাল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে কলকাতা বন্দরের বিকল্প হিসেবে চীনের চারটি বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিব্বতের সাথে রেল সংযোগ পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেলে কলকাতার থেকেও দ্রুততম সময়ে নেপাল চীন থেকে পণ্য আমদানি করতে পারবে। চীন এবং নেপালের বাণিজ্যের মূল বাধা হিসেবে যে যোগাযোগব্যবস্থাকে দায়ী করা হচ্ছিল, বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে তা দূর করে ফেলা হবে।

ৃয়য়মময়মসম

চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নেপালের পররাষ্ট্রনৈতিক পালাবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে; image source: medium.com

চীনের আধিপত্যের অন্যতম প্রধান অস্ত্র বিনিয়োগ। বর্তমানে নেপালে ৯০ শতাংশেরও বেশি বিনিয়োগ চীনের দখলে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত বছর নেপালে গিয়ে ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। শত শত মিলিয়ন ইউয়ান ঢালা হচ্ছে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের খাতে। চীন দ্রুত নেপালের সাথে তিব্বতের মাধ্যমে রেল সংযোগ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালাচ্ছে, যেটি নেপালের অর্থনীতিকে নতুন রূপ দান করবে। এর ফলে চীন ও নেপালের বাণিজ্য বেড়ে যাবে অনেকাংশে, ভারতের উপর থেকে নেপালের নির্ভরশীলতা একেবারে কমে আসবে।

সাংস্কৃতিক দিক থেকে চীন ও নেপালের পার্থক্য অনেক। দুটি দেশ দুটি ভিন্ন সভ্যতার উত্তরাধিকারী। দুই দেশের সাংস্কৃতিক ব্যবধান কমিয়ে আনার লক্ষ্যে নেপালের স্কুলগুলোতে মান্দারিন ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য, যেখানে মান্দারিন ভাষা শেখানো শিক্ষকদের বেতনের ব্যয়ভার চীন গ্রহণ করেছে। এই মান্দারিন ভাষাশিক্ষা প্রকল্প যে নেপালের উপর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চাপিয়ে দেয়া, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।

চীনের এসব পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেপালকে নিয়ে ভারতও নতুন করে ভাবছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে নেপালের আর্থিক সহায়তার জন্য ৩৭৫ কোটি ভারতীয় রূপি রাখা হয়েছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সেটা বাড়িয়ে ১,০৫০ কোটি রূপি করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় তিনটি স্কুল তৈরি করে দেয়ার কথা বলেছে ভারত, যেগুলোর ব্যয় ধরা হয়েছে সম্মিলিতভাবে ১০ কোটি ৭১ লক্ষ নেপালি রূপি। কিন্তু এসব বিনিয়োগ চীনের বিশাল বিনিয়োগের তুলনায় অতি নগণ্য।

চীনের বিনিয়োগ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা উন্নয়ন করার জায়গা করে দিচ্ছে। কিন্তু এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চীনা ঋণের ফাঁদে পড়ে শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতা বন্দর হারানোর মতো ঘটনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ চীনের আধিপত্য বিস্তারের একটি মাধ্যম, চীনা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার যন্ত্র। নেপাল এই প্রকল্পের ব্যয়ভার বহন করতে পারবে নাকি ‘চীনা ঋণের ফাঁদে আটকে পরা’ দেশগুলোর পরিণতি বরণ করবে, তা সময়ই বলে দেবে।

শুধু যে অর্থনৈতিক কারণে নেপাল বিকল্প খুঁজে নিতে বাধ্য হয়েছে, এমনটি কিন্তু নয়। রাজনৈতিকভাবে বর্তমান কমিউনিস্ট পার্টি শাসনক্ষেত্রে নয়া দিল্লির আধিপত্য দেখতে চায় না। কিন্তু ভারতকে একেবারে হুট করে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ যেহেতু নেপালের হাতে নেই, তাই চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াটাকে সেই আপাত সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছে। এতে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করে চলা যাবে নেপালের পক্ষে। চীন অর্থনৈতিকভাবে নেপালকে সাহায্য করতে পারবে, তাই ভারত এখন চাইলেও অবরোধ কিংবা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নেপালকে আটকে রাখতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত অঞ্চলকে নিজেদের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করে নেপালের নতুন মানচিত্র প্রকাশ কিংবা নেপাল-ভারত সীমান্তে নেপালের নতুন করে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

আআবমম

অর্থনৈতিকভাবে ভারতের উপর এখনও বেশ নির্ভরশীল থাকায় চীনের পাশে একেবারে ঝুঁকে না পড়ে নেপালকে ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করতে হবে; image source: asia.nikkei.com

নিজেদের বলয় থেকে নেপালকে হারানো ভারতের জন্য দুশ্চিন্তাই বয়ে আনবে। ভারত ‘নেইবার ফার্স্ট’ নীতি অনুসারে তার প্রতিবেশী দেশ নেপালকে সহায়তা করেছে, আবার অসময়ে বেকায়দায় ফেলার মতো অদূরদর্শী কাজও করেছে। ২০১৫ সালে অবরোধ আরোপের ঘটনার ফল ভোগ করতে হচ্ছে ভারতকে, সামনেও করতে হবে। শোষণমূলক নীতি পরিহার করে ঠিকমতো আচরণ করলে হয়তো নেপালকে বিকল্প খুঁজতে হতো না, ভারতকেও দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে মিত্রহীন করতে চীনের যে প্রাণপণ চেষ্টা, তা সফল করতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে চীন।

Related Articles