দনবাসে তুর্কি ড্রোনের ব্যবহার এবং রুশ–ইউক্রেনীয় দ্বন্দ্ব || পর্ব–২

[১ম পর্ব পড়ুন]

দনবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইকের পর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া

ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইকের ফলে দনেৎস্কের হাউইটজার ধ্বংস হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে রাশিয়া, দনেৎস্ক ও লুহানস্ক কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন থেকে বিরত থাকে। রুশ দৈনিক পত্রিকা ‘কমেরসান্ত’–এর একটি প্রশ্নের উত্তরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ মন্তব্য করেন যে, দনবাসে দনেৎস্কের সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীর বায়রাক্তার ড্রোন ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্যটি তারা যাচাই করে দেখছেন। এই পর্যায়ে লাভরভ সরাসরি তুরস্কের বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন, কিন্তু সাধারণভাবে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রকে আহ্বান জানান। রুশ রাষ্ট্রপতির মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কভ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু তুরস্ক কর্তৃক ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীকে এই ধরনের অস্ত্র সরবরাহ দনবাসের সংযোগরেখা বরাবর পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং উক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের এই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২৬ অক্টোবর ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক দনেৎস্কের বিরুদ্ধে তুর্কি–নির্মিত কমব্যাট ড্রোন ব্যবহারের সংবাদটির পাশাপাশি আরেকটি সংবাদ প্রচারমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেটি হচ্ছে, ইউক্রেনীয় সৈন্যরা দনেৎস্ক ও ইউক্রেনীয়–নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী ‘ধূসর অঞ্চল’/’গ্রে জোন’ বা ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ অবস্থিত স্তারোমারিয়েভকা গ্রাম দখল করে নিয়েছে। ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল স্টাফ প্রথমে এই সংবাদটি অস্বীকার করে, কিন্তু পরবর্তীতে দনেৎস্কের রাষ্ট্রপ্রধান দেনিস পুশিলিন রুশ প্রচারমাধ্যমকে প্রদত্ত একটি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, ইউক্রেনীয় সৈন্যরা স্তারোমারিয়েভকা দখল করে নিয়েছে এবং সেখানে ৩৭ জন রুশ বেসামরিক নাগরিক বসবাস করে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া দনবাসের অধিবাসীদের রুশ নাগরিকত্ব প্রদান করছে এবং দনবাস অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ অধিবাসীর মতো স্তারোমারিয়েভকা গ্রামের অধিবাসীরাও রুশ নাগরিকত্ব লাভ করেছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও ইউক্রেনীয় সৈন্যদের স্তারোমারিয়েভকা দখলের বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং একে ইউক্রেনীয় ‘উস্কানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

উল্লেখ্য, ২৭ অক্টোবর ইউক্রেন সংক্রান্ত ‘ত্রিপক্ষীয় সংযোগ গ্রুপে’র (রাশিয়া, ইউক্রেন ও ‘অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপ’/’ওএসসিই’–এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কূটনৈতিক কাঠামো, যেটির মূল উদ্দেশ্য কূটনীতির মাধ্যমে দনবাস যুদ্ধের অবসান ঘটানো) একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং উক্ত বৈঠকের ঠিক আগেই ইউক্রেন উপরে বর্ণিত ঘটনা দুইটি ঘটায়। বৈঠকে দনেৎস্কের প্রতিনিধি নাতালিয়া নিকোনরোভা মন্তব্য করেন যে, ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক ড্রোনের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য এবং দনবাসের সংযোগরেখা অস্থিতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি সূক্ষ্ম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। রুশ প্রতিনিধি বোরিস গ্রিজলভ মন্তব্য করেন যে, ইউক্রেন সংযোগরেখা বরাবর উত্তেজনা বৃদ্ধি করে চলেছে।

মানচিত্রে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং দনবাস অঞ্চল; Source: Insider Paper

উল্লেখ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স ইউক্রেন কর্তৃক দনবাসে ড্রোন ব্যবহারের নিন্দা জানিয়েছে এবং এর ফলে দনবাসের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে বলে সতর্কবাণী প্রদান করেছে। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, মিনস্ক প্রোটোকল অনুযায়ী, দনবাসে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য মোতায়েনকৃত ওএসসিইর ‘স্পেশাল মনিটরিং মিশন’ ছাড়া অন্য কোনো পক্ষ ড্রোন ব্যবহার করতে পারবে না, কিন্তু কার্যত উভয় পক্ষই ড্রোন ব্যবহার করছে। জার্মান সরকার উভয় পক্ষকে গঠনমূলক উপায়ে দনবাস দ্বন্দ্ব নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাশিয়া, ইউক্রেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রতিনিধিরা কূটনৈতিকভাবে দনবাস সঙ্কট নিরসনের উদ্দেশ্যে গঠিত কূটনৈতিক কাঠামো ‘নরম্যান্ডি ফরম্যাটে’ অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং এক্ষেত্রে জার্মানি ও ফ্রান্স মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। বস্তুত রুশ–ইউক্রেনীয় দ্বন্দ্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো (প্রধানত জার্মানি ও ফ্রান্স) সাধারণভাবে ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে এসেছে, এজন্য জার্মানি ও ফ্রান্স কর্তৃক দনবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইকের নিন্দা জানানোর বিষয়টি কার্যত দনবাস সঙ্কটের একটি নতুন দিক।

অবশ্য ইউক্রেন দৃঢ়ভাবে জার্মানি ও ফ্রান্সের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। জার্মানিতে নিযুক্ত ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূত আন্দ্রি মেলনিক মন্তব্য করেছেন যে, ইউক্রেন জার্মানির এই সমালোচনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, দনবাসে ড্রোনের ব্যবহারের ফলে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হচ্ছে না এবং ইউক্রেন আক্রমণ পরিচালনার জন্য নয়, বরং শত্রুপক্ষের কার্যক্রমের জবাব দেয়ার জন্য ড্রোন ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনীয় প্রচারমাধ্যম সাধারণভাবে দনবাসে পরিচালিত ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইককে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করেছে এবং এটির পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। তদুপরি, ২৮ অক্টোবর মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘আটলান্টিক কাউন্সিলে’ (অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউক্রেনও যেটির অর্থায়ন করে থাকে) ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবার লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং উক্ত নিবন্ধে তিনি দনবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনাকে সমর্থন করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি তুর্কি–ইউক্রেনীয় জোট গঠনের পক্ষে মতামত দেন।

২৮ অক্টোবর রুশ–সমর্থিত গণপ্রজাতন্ত্রী লুহানস্কের সশস্ত্রবাহিনীর গোলাবর্ষণের ফলে দনবাসে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ‘কেমিক্যাল ট্রুপসে’র একটি সোভিয়েত–নির্মিত ‘এআরএস–১৪’ যান ধ্বংস হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনাকে ২৬ অক্টোবরে পরিচালিত ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইকে দনেৎস্কের হাউইটজার ধ্বংসের প্রত্যুত্তর হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। তদুপরি, রুশ সরকার ঘোষণা করেছে যে, আগামী ১ নভেম্বর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছে কয়লা রপ্তানি বন্ধ করবে। দনবাসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একেও ইউক্রেন কর্তৃক দনবাসে ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার প্রত্যুত্তর হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

লুহানস্ক সৈন্যদের গোলাবর্ষণের ফলে বিধ্বস্ত ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ‘এআরএস–১৪’ যান; Source: The RAGE X/Twitter

রুশ সামরিক বিশ্লেষকের মতামত

রুশ দৈনিক পত্রিকা ‘মস্কোভস্কি কমসোমলেৎস’কে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে রুশ সামরিক বিশ্লেষক আলেক্সান্দর মিখাইলোভস্কি দনবাসে পরিচালিত ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইক সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, এই আক্রমণ ছিল মূলত পরীক্ষামূলক। প্রায় ছয় মাস আগে থেকে দনবাসে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের তুর্কি–নির্মিত ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ কমব্যাট ড্রোন ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এই আক্রমণের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, ইউক্রেনীয়রা এখন ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার জন্য প্রস্তুত এবং দনবাসের রুশ–সমর্থিত প্রজাতন্ত্র দুইটির এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমে ফাঁকফোকর রয়েছে।

মিখাইলোভস্কির মতে, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনীয়দের রণকৌশল হচ্ছে ছোট ছোট আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে দনেৎস্ক ও লুহানস্কের ভূখণ্ডকে বিভাজিত করা, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সীমান্ত রুদ্ধ করে দেয়া এবং এরপর নিয়মিতভাবে প্রজাতন্ত্রগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করা। ইউক্রেন যদি প্রজাতন্ত্রগুলোর ওপর পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ চালায়, সেক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো তাদের আর্মার্ড বহরের অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হবে, যাতে ইউক্রেনীয় যুদ্ধবিমান নিরাপদে প্রজাতন্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারে। অবশ্য মিখাইলোভস্কি দনবাসে পরিচালিত সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইককে মূলত ‘শক্তি প্রদর্শন’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।

রুশ সাংবাদিকের দৃষ্টিতে দনবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইকের কারণ

অবশ্য রুশ দৈনিক পত্রিকা ‘কমসোমলস্কায়া প্রাভদা’র সামরিক বিষয়ক সাংবাদিক দিমিত্রি স্তেশিন মনে করেন যে, ‘শক্তি প্রদর্শনে’র পাশাপাশি দনেৎস্কের আর্টিলারি ইউনিটের ওপর সম্প্রতি পরিচালিত ড্রোন স্ট্রাইকের পশ্চাতে আরো বেশকিছু কারণ রয়েছে। স্তেশিনের ভাষ্যমতে, ইউক্রেন কর্তৃক উক্ত ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার পশ্চাতে অন্তত ৫টি কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি, কয়েকটি বা সবগুলোই ইউক্রেনের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখেছে।

একটি যৌথ মহড়া চলাকালে মার্কিন ও ইউক্রেনীয় সৈন্যরা; Source: Efrem Lukatsky/AP via The San Diego Union-Tribune

প্রথমত, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের প্রধান ‘মিত্র’ রাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন ছাড়া দনবাসে ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। তদুপরি, ইউক্রেন উক্ত আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে তুর্কি–নির্মিত ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ ড্রোন ব্যবহার করেছে এবং উক্ত ড্রোনটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তুর্কি সামরিক শিল্পের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বর্তমানে তুর্কি–মার্কিন সম্পর্কে বিভিন্ন জটিলতা বিরাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত মৌন সম্মতি ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের এরকম স্পর্শকাতর তুর্কি–নির্মিত সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করার কথা নয়। সুতরাং ধারণা করা যেতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র দনবাসে উক্ত ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার জন্য ইউক্রেনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনুমতি প্রদান করেছে, কিংবা তারা নিজেরাই ইউক্রেনকে এই আক্রমণ পরিচালনা করতে উৎসাহিত করেছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন স্থাপিত হয়েছে এবং পাইপলাইনটি পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এমতাবস্থায় দনবাসে একটি গুরুতর সঙ্কট সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো মিত্র জার্মানি সাধারণভাবে ইউক্রেনকে সমর্থন করতে বাধ্য হবে এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ‘নর্ড স্ট্রিম ২’–এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন নিজে থেকে দনবাসে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী বলে প্রতীয়মান হয় না, কারণ ইতিপূর্বে ২০০৮ সালে মার্কিন প্ররোচনায় জর্জিয়া দক্ষিণ ওসেতিয়ায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করেছিল, কিন্তু রাশিয়া দক্ষিণ ওসেতিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে যুক্তরাষ্ট্র জর্জিয়াকে সরাসরি সহায়তা প্রদান থেকে বিরত থাকে এবং এর ফলে রুশ–জর্জীয় যুদ্ধে জর্জিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। অবশ্য বর্তমানে ইউক্রেনে মার্কিন প্রভাব অত্যন্ত প্রবল এবং এজন্য মার্কিন নির্দেশনা অনুসরণ করতে ইউক্রেন বহুলাংশে বাধ্য।

দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন কর্তৃক দনবাসে ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পশ্চাতে তুরস্কের ভূমিকাও থাকতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক–প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং ইউক্রেন তুরস্কের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ ড্রোন ক্রয় ও ইউক্রেনে তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে উক্ত ড্রোন উৎপাদনের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তুর্কি–ইউক্রেনীয় যৌথ ড্রোন উৎপাদন প্রকল্প সাফল্যমণ্ডিত হলে বিশ্বব্যাপী উক্ত ড্রোনের বাজার সৃষ্টিতে ইউক্রেনেরও তুরস্কের সমপরিমাণ স্বার্থ থাকবে। তদুপরি, ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনী কার্যকরভাবে তুর্কি–নির্মিত কমব্যাট ড্রোন ব্যবহার করতে সক্ষম কিনা, সেটিও পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল।

মানচিত্রে তুর্কি–নির্মিত ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ কমব্যাট ড্রোনের ক্রেতা রাষ্ট্রসমূহ (নীল রঙে চিহ্নিত); Source: Cengizsogutlu/Wikimedia Commons

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে আর্মেনীয়–আজারবাইজানি যুদ্ধে তুর্কি–নির্মিত ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ ড্রোনের বিস্তৃত সামরিক সাফল্য তুর্কি সমরশিল্পের জন্য একটি কার্যকরী ‘বিজ্ঞাপন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরাসি পত্রিকা ‘লা মঁদ’–এর ভাষ্য অনুযায়ী, উক্ত যুদ্ধের পর তুর্কি কমব্যাট ড্রোন ‘হট কেকে’র মতো ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে। এই যুদ্ধের পর তুর্কমেনিস্তান, পোল্যান্ড ও মরক্কো তুরস্কের কাছ থেকে ‘বায়রাক্তার টিবি–২’ ড্রোন ক্রয় করেছে, কিরগিজস্তান উক্ত ড্রোন ক্রয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং আলবেনিয়া, ইথিওপিয়া, ইরাক, ওমান, কাজাখস্তান, বুলগেরিয়া, লাতভিয়া, সার্বিয়া, সৌদি আরব, হাঙ্গেরি প্রভৃতি রাষ্ট্র উক্ত ড্রোন ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

কিন্তু রুশ ও আর্মেনীয় গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ এবং বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের আর্মেনীয়–আজারবাইজানি যুদ্ধে ব্যবহৃত তুর্কি–নির্মিত ড্রোনগুলো পরিচালনা করেছিল আজারবাইজানে মোতায়েনকৃত তুর্কি ড্রোন অপারেটররা এবং তুর্কি সামরিক বিশ্লেষক জান কাসাপোলুর মতে, আজারবাইজানি সশস্ত্রবাহিনী তুরস্কের কাছ থেকে কেবল যে ড্রোন ক্রয় করেছে তা নয়, তুরস্কের সঙ্গে বহু সংখ্যক যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তারা তুর্কিদের ড্রোনযুদ্ধ সংক্রান্ত রণনীতি সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করেছে। অর্থাৎ, তুর্কি–নির্মিত ড্রোন ব্যবহার করে আজারবাইজান যেরকম সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে, অন্য রাষ্ট্রগুলো যে উক্ত ড্রোন ব্যবহার করে একই রকম সাফল্য অর্জন করতে পারবে, সেটির কোনো নিশ্চয়তা নেই। তদুপরি, এই যুদ্ধের পর যেসব রাষ্ট্র তুর্কি–নির্মিত ড্রোন ক্রয় করেছে, তারা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করেনি। সুতরাং উক্ত রাষ্ট্রগুলো যে একই রকম কার্যকারিতার সঙ্গে তুর্কি–নির্মিত ড্রোন ব্যবহার করতে পারবে, সেটির কোনো প্রমাণ নেই।

এক্ষেত্রে ইউক্রেন কর্তৃক দনবাসে তুর্কি–নির্মিত ড্রোনের সাহায্যে পরিচালিত আক্রমণ উক্ত ড্রোনের জন্য একটি নতুন ‘বিজ্ঞাপন’ হিসেবে কাজ করেছে। ইউক্রেন উক্ত ড্রোন ব্যবহার করে দনেৎস্কের একটি আর্টিলারি ইউনিট ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে তুর্কি–নির্মিত ড্রোন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। এর ফলে অন্যান্য রাষ্ট্র তুর্কি–নির্মিত ড্রোন ক্রয় করতে আরো উৎসাহিত হবে। ভবিষ্যতে ইউক্রেনে তুরস্ক ও ইউক্রেন যৌথভাবে উক্ত ড্রোন উৎপাদন শুরু করলে বহির্বিশ্বে ড্রোন রপ্তানির মাধ্যমে তুরস্কের পাশাপাশি ইউক্রেনও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

রুশ–সমর্থিত গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্কের রাজধানী দনেৎস্ক শহরের বাইরে একটি ট্যাঙ্কের ওপরে একদল দনেৎস্ক সৈন্য; Source: Aleksandr Ermochenko/Reuters via Business Insider

তৃতীয়ত, ইউক্রেন কর্তৃক দনবাসে ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনা ‘পরীক্ষামূলক’ হতে পারে। দনেৎস্ক ও লুহানস্কের ড্রোনবিরোধী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম আছে কিনা বা থাকলে সেটি কতটুকু কার্যকরী, সেটি পরীক্ষা করে দেখার উদ্দেশ্যে তারা এই আক্রমণ চালিয়ে থাকতে পারে। ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীর ভাষ্যমতে, তাদের ড্রোন আক্রমণ পরিচালনার জন্য দনেৎস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করেনি, কিন্তু তাদের এই বক্তব্যের সত্যতা কতটুকু সেটি যাচাই করার উপায় নেই। অবশ্য এটি সত্যি বা মিথ্যা যাই হয়ে থাকুক না কেন, ইউক্রেন সাফল্যজনকভাবে দনেৎস্কের অভ্যন্তরে ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনা করে এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে যে, দনবাসের রুশ–সমর্থিত প্রজাতন্ত্র দুইটির এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম খুবই দুর্বল এবং সেখানে ড্রোন আক্রমণ পরিচালনা করা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।

এমতাবস্থায় যতদিন পর্যন্ত দনেৎস্ক ও লুহানস্কের এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ইউক্রেন প্রায় বিনা বাধায় প্রজাতন্ত্র দুইটির ভূখণ্ডের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ড্রোন আক্রমণ পরিচালনা করতে পারবে। এর ফলে চলমান সীমিত মাত্রার যুদ্ধে রুশ–সমর্থিত প্রজাতন্ত্র দুইটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের জন্য আগের মতো প্রায় নির্বিঘ্নে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের ওপর গোলাবর্ষণ করার সুযোগ বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে। অবশ্য নিকট ভবিষ্যতে ইউক্রেন দনবাসে তাদের ড্রোনবহর কীভাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিবে, সেটির ওপরেই সবকিছু নির্ভর করছে।

চতুর্থত, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন এখনই দনবাসের রুশ–সমর্থিত প্রজাতন্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ আরম্ভ করতে আগ্রহী নয়। ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনী বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে, তাদের সৈন্যদের মনোবল তুলনামূলকভাবে কম, ইতিপূর্বে সাধারণ ‘কনস্ক্রিপ্ট’ সৈন্য ও নব্য নাৎসি স্বেচ্ছাসেবক সৈন্যদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে এবং ইউক্রেনীয় তরুণদের সিংহভাগ সশস্ত্রবাহিনীতে যোগ দিতে ও বিশেষ করে পূর্ব ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহী নয়। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন দনবাসে নিজেদের জন্য রক্তক্ষয়ী একটি স্থল আক্রমণ পরিচালনা করতে আগ্রহী হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। কিন্তু ইউক্রেনের নানাবিধ অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্য এবং রুশবিরোধিতার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে নিয়মিত সহায়তা আদায়ের জন্য ইউক্রেনের এতদঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ড্রোন স্ট্রাইক তাদের জন্য একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের স্লোভিয়ানস্কে চলমান যুদ্ধের সময় গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘কসাক জাতীয় রক্ষীবাহিনী’র একদল সদস্য; Source: Yevgen Nasadyuk/Wikimedia Commons

যুগোস্লাভিয়া, লিবিয়া ও সিরিয়ায় পশ্চিমা বিশ্ব যেরকম স্থল আক্রমণ না চালিয়ে কেবল এয়ারস্ট্রাইকের মাধ্যমে যুদ্ধ করেছে, ইউক্রেন দনবাসে সেরকম রণকৌশল অবলম্বন করতে পারে। দনবাসের প্রজাতন্ত্র দুইটির ওপর নিয়মিতভাবে ড্রোন স্ট্রাইক পরিচালনার মাধ্যমে তারা প্রজাতন্ত্র দুইটিকে সার্বক্ষণিক চাপের মধ্যে রাখতে, রাশিয়াকে এতদঞ্চলে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখতে, ইউক্রেনীয় জনসাধারণকে ছোট ছোট কিন্তু বহুসংখ্যক বিজয়ের সংবাদ প্রদান করতে এবং নিজেদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করতে পারে। দীর্ঘ বা অন্তত মধ্যম মেয়াদে দনবাসে ইউক্রেনের উদ্দেশ্য এরকম হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে ২৬ অক্টোবরের ড্রোন স্ট্রাইকটি ছিল এই নতুন ধরনের যুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ।

সর্বোপরি, দনবাসে ইউক্রেনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে এই অঞ্চলটিকে জনহীন বিরান ভূমিতে পরিণত করা। ইতিপূর্বে ইউক্রেন দনবাসে সাফল্যের সঙ্গে এই কৌশল ব্যবহার করেছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে দনেৎস্ক সৈন্যরা ইউক্রেনের দনেৎস্ক প্রদেশের স্লোভিয়ানস্ক শহর দখল করে নেয়, কিন্তু ইউক্রেনীয় সৈন্যরা শহরটিকে অবরোধ করে ফেলে। প্রায় দেড় মাসব্যাপী এই অবরোধ চলমান ছিল। প্রথমেই ইউক্রেনীয়রা শহরটির অধিবাসীদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় সেবাসমূহ (যেমন: পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ) বন্ধ করে দেয়। এর ফলে শহরটির অধিবাসীদের ৮৫% শহরটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা শহরটি পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়।

দনেৎস্ক ও লুহানস্ক প্রজাতন্ত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রেও ইউক্রেন অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে এবং এক্ষেত্রে তুর্কি–নির্মিত অ্যাটাক ড্রোন তাদের জন্য একটি কার্যকরী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ক্রমাগত ড্রোন স্ট্রাইক চালিয়ে ইউক্রেনীয়রা প্রজাতন্ত্র দুইটির বেসামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করতে পারে, যাতে করে এতদঞ্চলের অধিবাসীদের সিংহভাগ (যাদের অধিকাংশের রুশ নাগরিকত্ব রয়েছে) নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যেতে বাধ্য হয়। বস্তুত ইউক্রেনীয়দের ভূখণ্ড প্রয়োজন এবং অধিকাংশ অধিবাসী এই অঞ্চল ত্যাগ করলে সেটিকে তারা লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করবে, কারণ এই অঞ্চলটি রুশপন্থী ইউক্রেনীয়দের একটি শক্ত ঘাঁটি। এমতাবস্থায় উক্ত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ইউক্রেন তুর্কি–নির্মিত ড্রোনকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।

রুশ ও ইউক্রেনীয় সামরিক–রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

দনবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইক সম্পর্কে ইউক্রেনীয় সামরিক বিশ্লেষক কর্নেল ওলেগ ঝদামভ মন্তব্য করেছেন যে, বায়রাক্তার ব্যবহারের মাধ্যমে ইউক্রেন দেখিয়েছে যে, তারা পরাজয় বরণ করতে ও ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। তিনি আরো মন্তব্য করেন যে, ইউক্রেন কেবল তুরস্ক থেকে ড্রোন ক্রয় করছে না, তারা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে উক্ত ড্রোন উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে। ফলে ইউক্রেনীয় সরকারের পক্ষে ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ড্রোন সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

রুশ–নির্মিত ‘ক্রাসুখা’ ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ড্রোন ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হয়। ইউক্রেনীয় ড্রোন আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে রুশরা দনবাসে সিস্টেমটি মোতায়েন করতে পারে; Source: Vitaly Kuzmin/Wikimedia Commons

রাশিয়ায় অবস্থিত ‘ন্যাশনাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হায়ার স্কুল অফ ইকোনমিক্সে’র অন্তর্ভুক্ত ‘সেন্টার ফর কম্প্রিহেন্সিভ ইউরোপিয়ান অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে’র উপ–পরিচালক ভাসিলি কাশিনের ভাষ্যমতে, দনবাসে ড্রোন ব্যবহার একটি নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হলে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গৃহীত হবে। এর ফলে দনবাসের রুশ–সমর্থিত প্রজাতন্ত্র দুইটির এয়ার ডিফেন্সকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে তোলার প্রয়োজন হবে। এজন্য হয় প্রজাতন্ত্র দুইটির এয়ার ডিফেন্স ফোর্সকে ব্যাপকভাবে আধুনিক সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত করতে হবে, নয়ত তাদের এয়ার ডিফেন্স সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে রুশ সশস্ত্রবাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।

মস্কোভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি মস্কো সেন্টারে’র লেখক ও সাংবাদিক কনস্তান্তিন স্কোরকিন রুশ পত্রিকা ‘কমারসান্ত’কে প্রদত্ত একটি সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন যে, ইউক্রেনের কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেনীয়দের মধ্যে যুদ্ধ সম্পর্কে উৎসাহ সৃষ্টি। কারাবাখ যুদ্ধে (২০২০ সালে সংঘটিত আর্মেনীয়–আজারবাইজানি যুদ্ধে) তুর্কি ড্রোন বিশেষ সাফল্য অর্জন করেছে এবং এগুলোর সম্ভাবনাকে প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে ইউক্রেন উক্ত ড্রোন ব্যবহার করেছে। আজারবাইজানের বিজয় ইউক্রেনীয়দের অনুপ্রাণিত করেছে এবং এটিকে তারা তাদের ভূখণ্ড (দনেৎস্ক ও লুহানস্ক) পুনর্দখলের জন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করছে। আজারবাইজান যেরকম পরাজয় স্বীকার করেনি, দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং সঠিক সময়ে আঘাত হেনেছে, ইউক্রেনও অনুরূপ প্রক্রিয়া দনবাসের ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে ইচ্ছুক। অবশ্য স্কোরকিনের মতে, এরকম সাদৃশ্য বিচার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ প্রকৃতিগতভাবে কারাবাখ ও দনবাসের সংঘাত দুইটি আলাদা, কিন্তু ইউক্রেন ‘সহজ সমাধান’ খুঁজছে।

রুশ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘রাশান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলে’র তুরস্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং আঙ্কারাভিত্তিক রুশ গবেষক ও সাংবাদিক তিমুর আখমেতভের ভাষ্য অনুযায়ী, তুর্কি সরকারের সমালোচকরা বিশেষ করে তুরস্কের প্রান্তে অবস্থিত যুদ্ধকবলিত অঞ্চলগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে তুর্কি সরকারকে অধিকতর সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তার মতে, দনবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন স্ট্রাইকের ফলে মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যবর্তী সম্পর্কে একটি নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে, আর সেটি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়।

Related Articles