ইউক্রেনের ঘটনাবলি সংক্রান্ত ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষণ | পর্ব–২

২০২২ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয় সীমান্তে রুশ সৈন্য সমাবেশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্ক ও গণপ্রজাতন্ত্রী লুহানস্কের সীমান্তে ইউক্রেনীয় সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে একদিকে রাশিয়া, দনেৎস্ক ও লুহানস্ক এবং অন্যদিকে ইউক্রেন ও ন্যাটোর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন দনেৎস্ক ও লুহানস্কের বিরুদ্ধে একটি আক্রমণাভিযান শুরু করে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যেকার উত্তেজনার মাত্রা তীব্রতর হয়ে ওঠে। ২১ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া দনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান এবং রাষ্ট্রদ্বয়ের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি’ সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন রুশ জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি ভাষণে এই ঘোষণা প্রদান করেন এবং ইউক্রেনে চলমান ঘটনাবলি সম্পর্কে সবিস্তারে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন।

উক্ত ভাষণটিতে ইউক্রেনীয় সঙ্কট, রুশ–ইউক্রেনীয় সম্পর্ক এবং ইউক্রেনীয় সঙ্কটে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা সম্পর্কে পুতিনের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্ফুটিত হয়েছে। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলমান নতুন স্নায়ুযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গরূপে অনুধাবন করার জন্য পুতিনের এই ভাষণটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। এই নিবন্ধে উক্ত ভাষণটির অনুবাদ করা হয়েছে এবং ভাষণটির বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ও মতামত প্রদান করা হয়েছে। নিচের ইটালিক অক্ষরে প্রদত্ত অংশগুলো পুতিনের প্রদত্ত ভাষণের অংশ এবং তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে আবদ্ধ বিবরণগুলো উক্ত ভাষণ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা/মতামত।

ভাষণ

[১ম পর্ব পড়ুন]

ইতিহাসে ফিরে এসে আমি পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, ১৯২২ সালে প্রাক্তন রুশ সাম্রাজ্যের স্থলে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা দেখিয়েছে যে, কনফেডারেশনের অনুরূপ নিরাকার নীতিমালার ভিত্তিতে এত বড় এবং জটিল ভূখণ্ড রক্ষা করা বা শাসন করা অসম্ভব ছিল। সেগুলো ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত এবং ঐতিহাসিক প্রথা থেকে বিচ্ছিন্ন।

এটি যৌক্তিক যে, লাল সন্ত্রাস ও স্তালিনের একনায়কতন্ত্রের দিকে দ্রুত অগ্রযাত্রা, কমিউনিস্ট আদর্শের আধিপত্য ও ক্ষমতার ওপর কমিউনিস্ট পার্টির একচ্ছত্র অধিকার, জাতীয়করণ ও পরিকল্পিত অর্থনীতি – এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত কিন্তু অকার্যকর সরকার পরিচালনার নীতিগুলোকে কেবল একটি ঘোষণায় রূপান্তরিত করে। প্রকৃতপক্ষে ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রগুলোর কোনো সার্বভৌম অধিকার ছিল না। এর বাস্তবিক ফলাফল ছিল একটি কঠোরভাবে কেন্দ্রীভূত ও সর্বাত্মকভাবে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি।

মানচিত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত প্রজাতন্ত্রগুলো; Source: Perry-Castaneda Library/University of Texas at Austin/Wikimedia Commons

বস্তুত স্তালিন যেটা পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছিলেন, সেটি লেনিনের সরকার পরিচালনার নীতি ছিল না, বরং সেটি ছিল তার নিজস্ব সরকার পরিচালনার নীতি। কিন্তু তিনি মূল নথিগুলোয়, সংবিধানে প্রাসঙ্গিক সংশোধন আনয়ন করেননি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেপথ্যে থাকা লেনিনের নীতিমালা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করেননি। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, সেটার কোনো দরকার ছিল না, কারণ সর্বগ্রাসী সরকারব্যবস্থার অধীনে সবকিছুই ঠিকঠাক কাজ করছিল বলে মনে হচ্ছিল, এবং বাইরে থেকে এটিকে চমৎকার, আকর্ষণীয় এবং এমনকি অতি–গণতান্ত্রিক বলেও মনে হচ্ছিল।

তা সত্ত্বেও এটি খুবই দুঃখজনক যে, আমাদের রাষ্ট্রের মৌলিক ও আনুষ্ঠানিক আইনগত ভিত্তিগুলো থেকে বিপ্লবের ফলে উদ্ভূত ঘৃণ্য ও কাল্পনিক খামখেয়ালিগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ করা হয়নি, যেগুলো যে কোনো স্বাভাবিক রাষ্ট্রের জন্য সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক। যেমনটা আমাদের দেশে ইতিপূর্বে প্রায়ই ঘটেছে, ভবিষ্যতের কথা কেউ চিন্তা করেনি।

[সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাকালে জাতীয়তা সংক্রান্ত সমস্যা ছিল বলশেভিক নেতৃবৃন্দের জন্য একটি বড় সমস্যা। উক্ত সমস্যার সমাধান কেমন হওয়া উচিত, সেই বিষয়ে তদানীন্তন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির লেনিন এবং রুশ কমিউনিস্ট পার্টির (বলশেভিক) মহাসচিব ইয়োসেব স্তালিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য ছিল। শেষ পর্যন্ত লেনিন কর্তৃক প্রণীত জাতীয়তা নীতি সোভিয়েত সরকারের আনুষ্ঠানিক জাতীয়তা সংক্রান্ত নীতি হিসেবে গৃহীত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি কনফেডারেশনে পরিণত হয়।

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্রমশ স্তালিনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। স্তালিন আনুষ্ঠানিকভাবে লেনিন কর্তৃক প্রণীত জাতীয়তা নীতিকে বজায় রাখেন, কিন্তু তার শাসনামলে সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রকৃত শাসনক্ষমতা মস্কোয় কেন্দ্রীভূত হয় এবং এর ফলে কার্যত সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেকটা এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত প্রজাতন্ত্রগুলোয় উভয় স্থানেই কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল, ফলে প্রজাতন্ত্রগুলো কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করতো না। তদুপরি, ১৯৩০–এর দশকের মাঝামাঝিতে সোভিয়েত ইউনিয়নে শুরু হওয়া ‘বৃহৎ শুদ্ধি অভিযানে’র (Great Purge) ফলে প্রজাতন্ত্রগুলোর স্বাতন্ত্র‍্যবাদী/জাতীয়তাবাদী কমিউনিস্ট নেতারা হয় নির্মূল হয় নয়তো কারাগারে অন্তরীণ হয়। এর ফলে প্রজাতন্ত্রগুলোর কার্যত সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গে ‘অমর রেজিমেন্টে’র র‍্যালিতে রুশরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত তাদের পূর্বপুরুষদের ছবি প্রদর্শন করছে। আধুনিক রাশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং রুশ রাষ্ট্রের একটি সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; Source: Vasyatka1/Wikimedia Commons

এভাবে স্তালিন সোভিয়েত ইউনিয়নে কার্যত তার নিজের প্রণীত জাতীয়তা নীতি বাস্তবায়ন করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে লেনিন কর্তৃক প্রণীত জাতীয়তা নীতিকে বজায় রাখেন। সোভিয়েত সংবিধানে ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রগুলোকে সোভিয়েত রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে অধিকার দেয়া হয়েছিল, স্তালিন সেটিকে অপসারণ করেননি। এর ফলে ১৯৮০–এর দশক নাগাদ যখন ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রগুলোর ওপর থেকে মস্কোর নিয়ন্ত্রণ খর্ব হতে শুরু করে, তখন প্রজাতন্ত্রগুলোর জাতীয়তাবাদীরা ক্রমশ সোভিয়েত সংবিধানে প্রদত্ত রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং এটি সোভিয়েত রাষ্ট্রের ভাঙনের আইনগত ভিত্তিতে রূপ নেয়। পুতিনের ভাষ্যমতে, আনুষ্ঠানিকভাবে লেনিনীয় জাতীয়তা নীতি বজায় রাখার স্তালিনের এই সিদ্ধান্ত ছিল সোভিয়েত রাষ্ট্রের জন্য পরোক্ষভাবে ধ্বংসাত্মক]

প্রতীয়মান হয় যে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা এই মর্মে আস্থাশীল ছিলেন যে তারা একটি দৃঢ় সরকারব্যবস্থা সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের নীতিমালা জাতিগত সমস্যাটিকে চিরতরে সমাধান করে ফেলেছে। কিন্তু বিকৃতিকরণ, ভ্রান্ত ধারণা এবং জনমতের সঙ্গে কারসাজি করার চরম মূল্য দিতে হয়। জাতীয়তাবাদী উচ্চাভিলাষের ভাইরাস এখনো আমাদের সঙ্গেই রয়েছে, এবং জাতীয়তাবাদের ব্যাধির প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতাকে ধ্বংস করার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে যে বিস্ফোরক স্থাপন করা হয়েছিল সেটির কাঁটা টিকটিক করছিল। যেমনটা আমি ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, সেই বিস্ফোরকটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকার।

১৯৮০–এর দশকের মাঝামাঝিতে ক্রমবর্ধমান আর্থ–সামাজিক সমস্যাবলি এবং পরিকল্পিত অর্থনীতির আপাত সঙ্কট জাতিগত সমস্যাটির প্রকোপ বৃদ্ধি করে, যেটি প্রকৃতপক্ষে সোভিয়েত জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষা বা অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর ভিত্তিতে ঘটেনি, বরং মূলত স্থানীয় অভিজাতদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ভিত্তিতে ঘটেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রথমে অর্থনীতিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকারকে সুচিন্তিত ও ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে রূপান্তরিত করার পরিবর্তে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ কেবল জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত লেনিনবাদী নীতির পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে খোলাখুলি দ্বিচারিতাপূর্ণ আলাপচারিতায় লিপ্ত হয়।

তদুপরি, কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে চলমান ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে বিবদমান পক্ষগুলোর প্রত্যেকে নিজস্ব সমর্থনের ভিত্তি বর্ধিত করার উদ্দেশ্যে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারাগুলোকে উস্কে দিতে ও উৎসাহিত করতে শুরু করে, তাদেরকে নিজস্ব স্বার্থে চালিত করে এবং তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থকদের সকল ইচ্ছা পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। বাজার অর্থনীতি কিংবা পরিকল্পিত অর্থনীতির ভিত্তিতে গণতন্ত্র ও একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিষয়ক কৃত্রিম ও জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে এবং জনসাধারণের দুর্দশা ও বিস্তৃত ঘাটতির বাস্তবিকতার মধ্যে ক্ষমতাসীনদের কেউই দেশের অপরিহার্য করুণ পরিণতির কথা চিন্তা করছিল না।

এরপর তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে সৃষ্ট পথে পরিপূর্ণরূপে চলতে শুরু করে এবং তাদের নিজেদের দলের মধ্যেকার জাতীয়তাবাদী অভিজাতদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলোকে তুষ্ট করতে শুরু করে। কিন্তু এটা করার সময় তারা ভুলে গিয়েছিল যে, কমিউনিস্ট পার্টির কাছে আর — ঈশ্বরকে ধন্যবাদ — রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও স্তালিনবাদী ধাঁচের একনায়কতন্ত্রের মতো ক্ষমতা ও দেশকে ধরে রাখার হাতিয়ার ছিল না, এবং সকলের চোখের সামনে কমিউনিস্ট পার্টির কুখ্যাত পথপ্রদর্শনকারী ভূমিকা ভোরের শিশিরের মতো মিলিয়ে যাচ্ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রাক্তন সোভিয়েত ভূখণ্ডকে পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয় – রাশিয়া (লাল রঙে চিহ্নিত), মধ্য এশিয়া (সবুজ রঙে চিহ্নিত), পূর্ব ইউরোপ (হলুদ রঙে চিহ্নিত), দক্ষিণ ককেশাস (গোলাপি রঙে চিহ্নিত) এবং বাল্টিক অঞ্চল (নীল রঙে চিহ্নিত); Source: Aris Katsaris/Wikimedia Commons

এরপর ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনারি অধিবেশনে একটি সত্যিকারের ঘাতক নথি অনুমোদন লাভ করে, আধুনিক পরিস্থিতিতে পার্টির তথাকথিত জাতীয়তা নীতি। নিম্নলিখিত ধারাগুলো এটির অন্তর্ভুক্ত ছিল, আমি উদ্ধৃত করছি: “সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রগুলোর সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদার উপযুক্ত সকল অধিকার থাকবে।”

পরবর্তী পয়েন্ট: “সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রগুলোর সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতাকাঠামোগুলো তাদের ভূখণ্ডে সোভিয়েত সরকারের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং স্থগিত রাখতে পারবে।”

এবং চূড়ান্তভাবে: “সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিটি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব নাগরিকত্ব থাকবে, যেটি সেখানকার সকল অধিবাসীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।”

এই রূপকল্প ও সিদ্ধান্তগুলোর ফলাফল কী হবে, সেটি কি পরিষ্কার ছিল না?

এখন রাষ্ট্র বা সাংবিধানিক আইন সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করা বা নাগরিকত্বের ধারণাকে সংজ্ঞায়িত করার সময় বা স্থান নয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে: সেই জটিল পরিস্থিতিতে দেশকে আরো বেশি করে আন্দোলিত করার কেন প্রয়োজন হয়েছিল? বাস্তবতাগুলো রয়ে গেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের দুই বছর আগেই প্রকৃতপক্ষে এটির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। এখন উগ্রপন্থী ও জাতীয়তাবাদীরা, যাদের মধ্যে রয়েছে প্রধানত ইউক্রেনের উগ্রপন্থী ও জাতীয়তাবাদীরা, স্বাধীনতা অর্জনের কৃতিত্ব দাবি করছে। আমরা যেরকম দেখতে পাই, এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল। বলশেভিক নেতাদের এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের ঐতিহাসিক, কৌশলগত ভুলগুলোর আমাদের ঐক্যবদ্ধ দেশের ভাঙনের জন্য দায়ী, যে ভুলগুলো রাষ্ট্রগঠন এবং অর্থনৈতিক ও জাতিগত নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক রাশিয়ার পতনের দায় তাদের বিবেকে রয়েছে।

[ভাষণের এই অংশে পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সংক্রান্ত একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তার বক্তব্য অনুসারে, ১৯৮০–এর দশক নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নে বিভিন্ন আর্থ–সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো সোভিয়েত রাষ্ট্রের পতন ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তার মতে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের পতনের মূল কারণ ছিল ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রগুলোর স্থানীয় নেতৃবৃন্দের ক্ষমতালিপ্সা এবং কেন্দ্রীর নেতৃবৃন্দের অদূরদর্শিতা ও অকর্মণ্যতা। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সোভিয়েত ইউনিয়নের জনসাধারণ রাষ্ট্রের ভাঙন চায়নি, বরং রাষ্ট্রটির ভাঙনের দায় ছিল মূলত সোভিয়েত অভিজাতশ্রেণির।

জার্মানিতে একটি রুশপন্থী র‍্যালিতে রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির পতাকা প্রদর্শিত হচ্ছে। রুশ জাতীয়তাবাদীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমর্থক নয়, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখণ্ড ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব ফিরে পেতে ইচ্ছুক; Source: Deutsche Welle

পুতিনের এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ১৯৯১ সালের ১৭ মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব থাকবে কিনা সেটির ওপর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং সোভিয়েত জনসাধারণের ৭৭.৮৫% সোভিয়েত ইউনিয়নকে বজায় রাখার পক্ষে ভোট দেয়। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সোভিয়েত জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কমিউনিজমের আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং তদানীন্তন সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে অনেকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হোক, এরকমটা তাদের কাম্য ছিল না। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি অকমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক ফেডারেশন হিসেবে বজায় রাখতে ইচ্ছুক ছিল।

কিন্তু সোভিয়েত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সোভিয়েত জনসাধারণের এই ইচ্ছাকে বাস্তব রূপ দিতে পারেনি, কারণ তাদের নিজেদের মধ্যেকার তীব্র ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল এবং মস্কোর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রগুলোয় জাতীয়তাবাদীদের ও সুযোগসন্ধানী স্থানীয় নেতাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে উঠেছিল। এর ফলে ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রগুলো একে একে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শুরু করে এবং ১৯৯১ সালের ৮ ডিসেম্বর রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশের শীর্ষ নেতারা ‘বেলোভেঝ চুক্তি’তে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে কার্যত সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটান। সুতরাং, পুতিন কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা রয়েছে।

অবশ্য এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের জন্য কেন্দ্রীয় ও প্রজাতান্ত্রিক নেতাদের উচ্চাভিলাষ ও অদূরদর্শিতা যেরকম দায়ী ছিল, সেরকমভাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ভাঙনের নেপথ্যে আরো নানাবিধ কারণ ছিল। সোভিয়েত অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান স্থবিরতা ও অনুৎপাদনশীলতা, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার প্রতি সোভিয়েত জনসাধারণের বীতশ্রদ্ধ মনোভাব, সোভিয়েত ইউনিয়নের অ–রুশ জাতিগুলোর সঙ্গে রুশ জাতির এবং অ–রুশ জাতিগুলোর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নিরসনের ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্বের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার ফলে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ওপর বিপুল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ, প্রলম্বিত আফগান যুদ্ধে বিজয় লাভে ব্যর্থতার ফলে সোভিয়েত সশস্ত্রবাহিনীর কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সংশয় — এগুলোর সবই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছিল। এগুলোর মধ্যে কোনটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রধান কারণ ছিল, সেটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে এবং এই বিতর্কের অবসান ঘটতে এখনো অনেক দেরি।

উল্লেখ্য, ভাষণের এই অংশে পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ‘ঐতিহাসিক রাশিয়ার পতন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থাৎ, পুতিন কমিউনিস্টদের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করছেন না। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেখছেন রুশ রাষ্ট্রেরই একটি ভিন্নধর্মী সংস্করণ হিসেবে। পুতিনের এই দৃষ্টিভঙ্গি রুশ জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২২ সালে রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা বিশ্ব এই মর্মে প্রচারণা চালাচ্ছে যে, পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু এর অর্থ এমনটা ধরে নেয়া উচিত নয় যে, পুতিন প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখণ্ডে কমিউনিজম ফিরিয়ে আনতে চান। কার্যত রাশিয়ার ক্ষমতার লড়াইয়ে কমিউনিস্টরা পুতিনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। বস্তুত পুতিন এবং রুশ জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পুনঃপ্রতিষ্ঠার অর্থ প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখণ্ডে কমিউনিজমের পুনঃস্থাপন নয়, বরং প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডগুলোর ওপর রুশ নিয়ন্ত্রণ স্থাপন]

এইসব অবিচার, মিথ্যাচার এবং খোলাখুলিভাবে রাশিয়ার লুণ্ঠন সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছিল, আমাদের জনগণ সেটিকে স্বীকার করে নিয়েছিল এবং নবগঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। রাশিয়া কেবল এই দেশগুলোকে স্বীকৃতিই দেয়নি, নিজে খুবই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও সে তার সিআইএস সহযোগীদের সাহায্য করেছিল। এর মধ্যে ছিল আমাদের ইউক্রেনীয় সহকর্মীরা, যারা স্বাধীনতা ঘোষণার পরের মূহুর্ত থেকে অনেক বার আর্থিক সহায়তার জন্য আমাদের মুখাপেক্ষী হয়েছে। আমাদের দেশ ইউক্রেনের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই সহায়তা প্রদান করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে, আমাদের জ্বালানির মূল্যের একটি সরল হিসেবের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হয়েছে যে, ১৯৯১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাদির পাশাপাশি যে ভর্তুকিপ্রাপ্ত ঋণ দিয়েছে, ইউক্রেনীয় বাজেটে তার সামগ্রিক পরিমাণ ছিল ২৫,০০০ কোটি মার্কিন ডলার। শুধু তাই নয়, এর বাইরে আরো ব্যাপার রয়েছে। ১৯৯১ সালের শেষ নাগাদ অন্যান্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক তহবিলগুলোর কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০,০০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রাথমিকভাবে এটি ঠিক হয়েছিল যে, সবগুলো প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্র পারস্পরিক সংহতি দেখিয়ে এবং নিজ নিজ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অনুপাতে একত্রে এই ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু রাশিয়া সকল সোভিয়েত ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেয় এবং ২০১৭ সাল নাগাদ এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে।

ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের একটি র‍্যালি; Source: Efrem Lukatsky/AP/Pool via The Times of Israel

এর বিনিময়ে নবগঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সোভিয়েত বৈদেশিক সম্পদের অংশবিশেষ রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে ইউক্রেনের সঙ্গে এই মর্মে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু কিয়েভ এই চুক্তিগুলো অনুমোদন করেনি এবং পরবর্তীতে হীরাকভাণ্ডার, স্বর্ণমজুদ ও বিদেশে থাকা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদের অংশ দাবি করার মাধ্যমে উক্ত চুক্তিগুলো পালন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

যাই হোক, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও রাশিয়া বরাবরই উন্মুক্ততা ও সততার সঙ্গে, এবং আমি যেটা ইতোমধ্যেই বলেছি, ইউক্রেনের স্বার্থের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করেছে। আমরা নানাবিধ ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম। ২০১১ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫,০০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। আমি উল্লেখ করতে চাই যে, মহামারীর আগে ২০১৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত সবগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্মিলিত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল এই সংখ্যার চেয়ে কম।

একই সময়ে এটি আশ্চর্যজনক ছিল যে, ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বরাবরই রাশিয়ার সঙ্গে এমনভাবে কাজ করেছে যাতে তাদের সকল অধিকার ও সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত হয়, কিন্তু তারা নিজেরা সকল দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকে। কিয়েভের কর্মকর্তারা অংশীদারিত্বকে একটি পরজীবী মনোভাব দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিল এবং সময়ে সময়ে অত্যন্ত হঠকারী আচরণ করতো। এক্ষেত্রে জ্বালানি সংক্রান্ত ট্রানজিটের বিষয়ে অনবরত ব্ল্যাকমেইল এবং তারা যে আক্ষরিক অর্থেই গ্যাস চুরি করতো সেই বিষয়টি উল্লেখ করাই যথেষ্ট।

আমি যোগ করতে পারি যে, কিয়েভ রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতো এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পাবে, এটি দাবি করে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের হুমকি দিয়ে সুবিধা আদায়ের জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে ব্ল্যাকমেইল করতো।

একই সময়ে, আমি এটির ওপর জোর দিতে চাই যে, ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে একত্রিত করে এরকম সকল কিছুকে অস্বীকার করার মাধ্যমে এবং ইউক্রেনে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের, পুরো প্রজন্মের মানসিকতা ও ঐতিহাসিক স্মৃতিকে বিকৃত করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রসত্তা গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। এটি আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, ইউক্রেনীয় সমাজে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে, যেটি দ্রুত আগ্রাসী রুশবিদ্বেষ ও নব্য–নাৎসিবাদে রূপ নেয়। এর ফলে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদী ও নব্য নাৎসিরা উত্তর ককেশাসের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোয় যোগদান করে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্রমশ জোরেসোরে ভৌগোলিক দাবি উত্থাপন করে।

এক্ষেত্রে বহিঃশক্তিগুলোর একটি ভূমিকা ছিল, যারা এনজিও ও বিশেষ সংস্থাগুলোর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে ইউক্রেনে তাদের অনুসারীদেরকে পুষ্ট করেছে এবং তাদের প্রতিনিধিদেরকে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

[সিআইএস: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উদ্ভূত রাষ্ট্রগুলোর সিংহভাগের সমন্বয়ে ‘Содру́жество Незави́симых Госуда́рств’ (‘সাদ্রুঝেস্তভা নিজাভিসিমিখ গোসুদার্স্তভ’) বা ‘Commonwealth of Independent States’ (CIS) গঠিত হয়। সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উদ্ভূত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। বর্তমানে রাশিয়া, বেলারুশ, মলদোভা, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান সিআইএস–এর সদস্য। তুর্কমেনিস্তান সংস্থাটিতে ‘সহযোগী রাষ্ট্র’ হিসেবে এবং মঙ্গোলিয়া সংস্থাটিতে ‘পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে রয়েছে। ইতিপূর্বে জর্জিয়া সংস্থাটির সদস্য এবং ইউক্রেন সংস্থাটির সহযোগী রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু তারা সংস্থাটি থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন (ডানে) এবং ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ (বামে); Source: Kommersant via NBC News

ভাষণের এই অংশে পুতিন ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত রুশ–ইউক্রেনীয় সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেছেন এবং এক্ষেত্রে রাশিয়ার একনিষ্ঠতা ও ইউক্রেনের ‘অসততা’র বিষয়টি তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত ইউক্রেন মোট চার জন রাষ্ট্রপতির অধীনে ছিল — লিওনিদ ক্রাভচুক (১৯৯১–১৯৯৪), লিওনিদ কুচমা (১৯৯৪–২০০৫), ভিক্তর ইয়ুশ্চেঙ্কো (২০০৫–২০১০) এবং ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ (২০১০–২০১৪)। ক্রাভচুক ও ইয়ুশ্চেঙ্কো স্পষ্টভাবে পশ্চিমাপন্থী ছিলেন এবং ইউক্রেনকে রুশ প্রভাব বলয় থেকে সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে, কুচমা ও ইয়ানুকোভিচ সাধারণভাবে রুশঘেঁষা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার পক্ষপাতী ছিলেন। পুতিনের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি কেবল ক্রাভচুক ও ইয়ুশ্চেঙ্কোর নীতির প্রতি নয়, কুচমা ও ইয়ানুকোভিচের নীতির প্রতিও অসন্তুষ্ট, কারণ তিনি ইউক্রেনের ক্ষমতার পালাবদল নির্বিশেষে ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসততা প্রদর্শনের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।

পুতিনের ভাষ্যমতে, ইউক্রেনে উগ্র জাতীয়তাবাদ, রুশবিদ্বেষ ও নব্য–নাৎসিবাদের উত্থান ইউক্রেনীয় সরকার কর্তৃক অনুসৃত নীতির ফল। পুতিনের এই বক্তব্যে সত্যতা রয়েছে। ১৯৯১ সালের আগে ইউক্রেন কখনো লম্বা সময় ধরে স্বাধীন ছিল না এবং রুশ ও ইউক্রেনীয় জাতিদ্বয়ের মধ্যেকার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে একটি স্বতন্ত্র ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় রাখা কঠিন ছিল। এমতাবস্থায় স্বাধীনতা লাভের পর ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবোধকে জোরদার করার উদ্দেশ্যে ইউক্রেনীয় সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কিছু থেকে ইউক্রেনকে পৃথক করার চেষ্টা করে। রুশ ও ইউক্রেনীয় জাতিদ্বয়ের ইতিহাস যেহেতু অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, সেহেতু স্বতন্ত্র ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে ইউক্রেনীয় সরকার ইউক্রেনীয় ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিক থেকে উপস্থাপন করতে শুরু করে।

উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনীয় রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকগুলোয় রাশিয়াকে একটি ‘দখলদার’, ‘ঔপনিবেশিক’ ও ‘সাম্রাজ্যবাদী’ শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং ইউক্রেনীয়রা একটি ‘হাজার বছরের পুরনো’ জাতি, এরকম একটি ধারণার বিস্তার ঘটানো হয়। ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদরা দাবি করতে থাকেন যে, ইউক্রেন প্রাচীন ‘কিয়েভস্কায়া রুশ’ রাষ্ট্রের প্রকৃত উত্তরসূরী এবং মস্কোকেন্দ্রিক রাশিয়া কিয়েভস্কায়া রুশের ঐতিহ্যকে ‘চুরি’ করেছে। ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইউক্রেনীয়রা একটি ‘খাঁটি’ ইউরোপীয় ও স্লাভিক জাতি, অন্যদিকে, রুশরা একটি ‘এশিয়াটিক’, ‘মঙ্গোলয়েড’ ও ‘পশ্চাৎপদ’ জাতি। বস্তুত আধুনিক ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে রুশবিদ্বেষ। ইউক্রেনের স্বাধীনতা লাভের পর ইউক্রেনের নতুন প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই ধরনের চিন্তাধারা আত্মস্থ করে বেড়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও নব্য–নাৎসিবাদের বিস্তার সহজ হয়ে উঠেছে।

অবশ্য ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু ইতিপূর্বে যেখানে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা ইউক্রেনের জনসাধারণের একটি ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেটি উল্লেখযোগ্য হারে বিস্তার লাভ করেছে। যেহেতু ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিতে রাশিয়া ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় শত্রু, সেহেতু রুশদের কাছে (এবং পুতিনের কাছে) ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদ অগ্রহণযোগ্য।

উত্তর ককেশাসের ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো’য় ইউক্রেনীয়দের অংশগ্রহণ: ১৯৯০ এবং ২০০০–এর দশকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত মুসলিম–অধ্যুষিত উত্তর ককেশিয়ান প্রজাতন্ত্র চেচনিয়ায় স্থানীয় স্বাধীনতাকামী/বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাশিয়া ও রুশপন্থী চেচেনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। রুশ সরকারের দৃষ্টিতে, চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ‘সন্ত্রাসবাদী’, কারণ তারা রাশিয়ার অভ্যন্তরে বেসামরিক জনসাধারণের ওপর বহুবার আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘ইউএনএ–ইউএনএসও’র (Українська Національна Асамблея-Українська Народна Самооборона, ‘উক্রাইনস্কা নাসিওনালনা আসাম্বলেয়া–উক্রাইনস্কা নারোদনা সামুবরোনা’) অন্তত কয়েক শত সদস্য চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মিলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের ভৌগোলিক দাবি: ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের বক্তব্য অনুসারে, দক্ষিণ রাশিয়ার বিস্তৃত অংশ প্রকৃতপক্ষে ‘ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড’। তারা রাশিয়ার কুরস্ক, ভরোনেঝ, রোস্তভ প্রভৃতি অঞ্চলকে একটি ‘বৃহত্তর ইউক্রেন’ রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে ইচ্ছুক]

This is the second part of a Bengali article that provides a translation of the speech of Russian President Vladimir Putin that he delivered on 21 February 2022 regarding the events in Ukraine. The translation includes a brief commentary.

Source of the featured image: Thibault Camus/Pool via Al Jazeera

Related Articles