যদিও সৌন্দর্যের সার্বজনীন কোনো সংজ্ঞা নেই, তবুও আমরা প্রায়ই সৌন্দর্যকে সংজ্ঞায়িত করতে চেষ্টা করি। কারো মাঝে এই এই বৈশিষ্ট্য থাকলেই কেবল তাকে সুন্দর বলা যাবে, না থাকলে সে অসুন্দরের তালিকায় পড়বে- এরকম সংজ্ঞায়ন কি আমরা চাইলেই করতে পারি? মোটেও না এবং এরকম করা উচিৎও নয়। সেই প্রেক্ষিতে আজকে এমনই একজন নারীর সাথে পরিচিত হবো যাকে নির্দয়ভাবে খেতাব দেয়া হয়েছিলো ‘পৃথিবীর কুৎসিততম নারী’ হিসেবে। তিনি এ সমস্ত সংজ্ঞায়নে ভ্রক্ষেপ না করে প্রমাণ করেছেন প্রথমে দর্শনধারী, পরে গুণ বিচারী প্রবাদটা সেকেলে, অযৌক্তিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। আত্মপ্রত্যয়ী এই মার্কিন নারীর নাম লিজি ভালসাকেজ।

লিজি ভালসাকেজ, Source: bbc.com

ভিন্নরকম সৌন্দর্য

লিজির সৌন্দর্য ও অবয়ব আমাদের মতো নয়। শীর্ণকায় সম্পূর্ণ মেদবিহীন একজন নারী। এই বাহ্যিক অবয়বের পেছনে রয়েছে বিরল এক রোগ। নাম Marfanoid–progeroid–lipodystrophy syndrome (মারফানয়েড–প্রোজেরয়েড–লিপোডিসট্রফি সিনড্রোম)। জন্ম থেকেই তিনি এ রোগে আক্রান্ত। এ রোগে আক্রান্তদের শরীরে মেদ হয় না। অ্যাডিপোজ টিস্যু না থাকার কারণে শরীরে শক্তি সঞ্চিত হয় না, ওজনও বাড়ে না।

২৯ বছর বয়সী একজন নারীর সর্বনিম্ন ওজন থাকা উচিত ৫৪ কেজি। কিন্তু লিজির ওজন মাত্র ২৯ কেজি। অনেক চেষ্টার পরও নিজের ওজন বৃদ্ধি করতে পারেননি। যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন তার পক্ষে ২৯ কেজির বেশি ওজন বৃদ্ধি করা সম্ভবও হবে না। সারা পৃথিবীতে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র দুজন। লিজি ভালসাকেজ এবং আবি সলোমন নামের আরেকজন নারী। সেবা কিংবা কোনো চিকিৎসায় এই রোগ ভালো হবার নয়। লিজি ভালসাকেজ উচ্চতায় পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি।

শরীরে শক্তি সঞ্চিত না হওয়ায় ১৫-২০ মিনিট পরপর একবার করে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। দুটি চোখের একটি পুরোপুরি নষ্ট। জন্ম থেকেই ডান চোখে দেখতে পান না। মারফান সিন্ড্রোমের প্রকোপে অপর চোখের দৃষ্টিও ক্ষীণ। তবে এ রোগ তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মস্তিষ্ক ও অস্থির গঠনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তার শারিরীক অসহায়ত্বগুলো যেন খ্যাতিলোভী ইউটিউবারের মনে কোনো দয়ার উদ্রেক ঘটাতে পারেনি, তাকে নিয়ে ‘পৃথিবীর কুৎসিততম নারী’ শিরোনামে ভিডিও বানিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়াই লাগলো।

প্রাথমিক জীবন

জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৮৯ সালের ১৩ই মার্চ। মাতৃগর্ভে প্রায় ৩৮ সপ্তাহ থাকার পরে সাধারণত শিশুর জন্ম হয়। কিন্তু মায়ের সমস্যার কারণে চার সপ্তাহের প্রি-ম্যাচিওর শিশু হিসেবে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। ওজন ছিল মাত্র ২ পাউন্ড ১১ আউন্স। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান, স্বাভাবিকভাবে প্রথম সন্তান জন্মের সময় বাবা-মা উভয়েই খুব আনন্দিত ও রোমাঞ্চিত থাকেন। কিন্তু আনন্দ মাটি করে চিকিৎসকরা জানালেন, লিজি কোনোদিন কথা বলতে পারবে না, হাঁটাচলা করতে পারবে না, এমনকি নিজে নিজে হামাগুড়িও দিতে পারবে না। এমন সতর্কবাণী বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দিলেও আশাহত করতে পারেনি। বরং তারা জোর দিয়েই বললো “আমাদের সন্তানকে আমরা দেখতে চাই, বাসায় নিয়ে আমাদের সাধ্যমতো তাকে প্রতিপালন করতে চাই। আমাদের সন্তানকে আমাদের কাছে তুলে দিন।”

ছোটবেলার লিজি, Source: bbc.com

বাহ্যিক অবয়বের জন্য তিনি ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড বুলিং বা টিটকারির শিকার হয়েছিলেন। আশেপাশের মানুষদের থেকেই নয়, মারাত্মকভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকারও হয়েছেন। প্রায় প্রতিটি মানুষই বুলিংয়ের তিক্ততার মুখামুখি হয়। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এটি ছিল মাত্রাতিরিক্ত। এছাড়া মানুষের আচরণেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন। স্কুলে প্রথম দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, “স্কুলে গেলাম, পিঠে ছিল স্কুল ব্যাগ, ব্যাগটা ছোটদের জন্য হলেও আমার পিঠে সেটা আমার চেয়েও অনেক বড় ছিল। এর কারণে দেখতে মনে হচ্ছিল আমি যেন কচ্ছপ আর আমার ব্যাগটা কচ্ছপের উপরের খোলস। আমার ক্লাসমেটের দিকে তকিয়ে মুচকি হাসলাম। সে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি একটা ডাইনি। আমার মতো ভয়ানক কিছু যেন সে কখনো দেখেনি।”

প্রথম দিন স্কুল থেকে ফিরে তিনি ভেবেছিলেন, সামনের দিনগুলো হয়তো ভালো যাবে। কিন্তু তার ধারণা ছিল ভুল। প্রতিনিয়ত তার আশপাশ হয়ে উঠছিলো কঠিন ও ভয়ানক। স্কুল থেকে বাসায় এসে বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করতেন, কেন তার সাথে এমন হচ্ছে? আশেপাশের কেউ কেন তাকে পছন্দ করে না?

বাবা-মায়ের কোলে ছোট্ট লিজি, Source: JAMES AMBLER/BARCROFT USA

টার্নিং পয়েন্ট

১৭ বছর বয়স পর্যন্ত তাকে নিয়ে আলোচনার মতো কিছুই ঘটেনি। নিজের সুখ-দুঃখ নিয়ে সাধারণ একজন মেয়ে ছিলেন। একদিনের ঘটনা তার জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। সময়টা ২০০৬ সাল। তিনি তখন হাইস্কুলে পড়েন। একদিন ইউটিউবে বসেন গান শোনার জন্য। এমন সময় একটি নতুন ভিডিও দেখতে পেলেন। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল ‘World’s Ugliest Woman’। ভিডিওটি ক্লিক করে দেখলেন ভিডিওটি তাকে নিয়েই তৈরি করা হয়েছে। ৮ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটি ইতোমধ্যে প্রায় চার মিলিয়ন বার দেখা হয়ে গেছে। নিচে হাজার হাজার কমেন্ট। মানুষ কমেন্টে বলছে “Lizzie, please, please just do the world of favor, put a gun to your head and kill yourself.”

বিরাট এক ধাক্কা খেলেন। সারা রাত কেঁদে কাটালেন। কারো সাথেই এ বিষয়ে কথা বলতে পারলেন না। ছোটবেলা থেকেই বুলিংয়ের শিকার হয়ে আসছেন, তবে এমন ভয়ংকর আক্রমণের শিকার আগে কখনো হননি। তিনি ভেঙ্গে না পড়ে জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে নতুনভাবে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছেন। ৮ সেকেন্ডের সেই ভিডিও ক্লিপটিই তার জীবন পুরোপুরিভাবে পালটে দিয়েছিল।

মায়ের সাথে লিজি; © Barcoft U

লক্ষ্য

যে চারটি লক্ষ্য স্থির করেছিলেন সেগুলো হলো-

১) একজন সুবক্তা হওয়া;
২) নিজের লেখা বই প্রকাশ করা;
৩) স্নাতক হওয়া ও নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করা এবং
৪) পরিবার তৈরি করা।

এ লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে গত দশ বছরে লিজি প্রায় শতভাগ সফল হয়েছেন। ২০১২ সালে আমেরিকার টেক্সাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কমিউনিকেশন স্টাডিজে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। জনসচেতনতা, এন্টি-বুলিং, মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য ইত্যাদি নিয়ে তিনি প্রেরণা উদ্দীপক বক্তব্য দিয়ে থাকেন। ২০১৪ সালে TEDtalk সংগঠনের আহবানে বক্তৃতা দিয়েছেন যার শিরোনাম ছিল ‘How Do YOU Define Yourself’। ভেরিফাইড নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল আছে, যার সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা এ মুহূর্তে আট লক্ষের কাছাকাছি।

লিজির পুরো পরিবারের ছবি। (বাম থেকে) লিজির বাবা লুপ, মা রিটা, লিজি, বোন ম্যারিনা ভালসাকেজ, ভাই ক্রিস ভালসাকেজ; © Barcoft U

বই

এখন পর্যন্ত চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি বই যৌথভাবে লেখা। বাকি তিনটি এককভাবে নিজের লেখা। ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় ‘Lizzie Beautiful: The Lizzie Velásque’ বইটি। এটি তার মা লিখেছেন। তবে এতে লিজির ছোটবেলার বিভিন্ন চিঠিপত্র সংযুক্তির ফলে একে যৌথ লেখকের বই হিসেবেই গণ্য করা হয়। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় লিজির দ্বিতীয় বই ‘Be Beautiful, Be You’। এতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য খুঁজে নিয়ে তার পরিচর্যা করতে হয়। পরের বইটি বের হয় ২০১৪ সালে, নাম ‘Choosing Happiness’। এতে তার জীবনে চলার পথে বাধাবিপত্তি কীভাবে জয় করেছেন সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত বইটির নাম ‘Dare to be Kind’। এখানে তিনি আলোচনা করেছেন অসহিষ্ণুতাকে অবলম্বন করে সমাজ থেকে বুলিং কীভাবে মুছে ফেলা যায় সে বিষয়ে।

Source: Amazon

সেরা কিছু উক্তি

তার প্রত্যেকটি বই ও বক্তৃতার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে প্রেরণা দেয়া। তার কিছু প্রেরণাদায়ক উক্তি এখানে তুলে ধরা হলো।

  • আপনি যেমন, ঠিক তেমনটা হওয়াই সুন্দর। সবার মতো না হওয়াটাই ভালো। যে বিষয়টা আপনাকে অনন্য করে তোলে, সেটাই আপনাকে আসলে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। কারণ, সে বিষয়টাই মূলত আপনাকে আপনি বানিয়েছে। আপনি যেমন, ঠিক সেভাবেই আপনাকে এই বিশ্বের খুব প্রয়োজন। এটাই সত্য; খুব সহজ এবং সাধারণ কথা।
  • আমি সবসময় বলে থাকি যে, বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তনটা কিন্তু একজনকে দিয়েই শুরু হয়। সেই ব্যক্তিটি আপনিও হতে পারেন। তাই নিজেকে ঠিক নিজের প্রতিচ্ছবির মতো গড়ে তোলাটা শিখতে হবে। এই বিশ্বকে পরিচর্যা করার শক্তি ও ইচ্ছা শক্তি অর্জন করতে চাইলে নিজেদের পরিচর্যা কীভাবে করতে হয় সে শিল্পটা আগে আয়ত্ব করতে হবে।
  • সত্যিকারের সৌন্দর্য হলো নিজের স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কার করা এবং স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত হওয়া।
  • আমার কাছে চূড়ান্ত সুখ মানে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, যেখানে গিয়ে আপনার চলার পথ ফুরিয়ে যাবে। আমার কাছে চূড়ান্ত সুখ মানে একটি লম্বা সফর, নিজেকে সুখী রাখতে যার প্রতিটি দিনকেই বেছে নিতে হবে।
  • শুধুমাত্র নিজের মতো হওয়াই সফলতার জন্য যথেষ্ট।
  • যে সময়টি আপনি অতিবাহিত করছেন তা সবচেয়ে সেরা হবে, না সবচেয়ে খারাপ হবে- সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আপনার হাতেই।

লিজি ভালসাকেজ সুন্দর। তার সৌন্দর্য আমাদের সাদা চোখে ধরা পড়ে না। তার সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে তার কৃতিত্বে, মন ও মননে।

ফিচার ইমেজ: Getty Images