কর্ণাটক নির্বাচন: সেই থোড়-বড়ি-খাড়া রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্তি কবে?

প্রবল ঢক্কানিনাদের পর অবশেষে ১৫ মে ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের রাজ্য কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরুলো। এই নির্বাচনের প্রধান তিনটি প্রতিযোগী দল কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবং জনতা দল (সেকুলার)। জেডিএস প্রথম থেকেই দাবি জানিয়ে আসছিল যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গড়বে তারাই। এমনকি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ত্রিশংকু ফলের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক নেতাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেনি একটুও।

একক গরিষ্ঠতা পেল না কেউই

অবশেষে নির্বাচনের ফলাফল বেরুনোর পর দেখা গেল, ২২৪ আসন বিশিষ্ট কর্ণাটকের বিধানসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো দলই। সবচেয়ে বড় দল হিসেবে বিজেপি পেয়েছে ১০৪টি আসন; কংগ্রেস পেয়েছে ৭৮টি আসন আর জেডিএস ৩৮টি আসন। অর্থাৎ, ম্যাজিক ফিগার বা ১১৩টি আসনে পৌঁছাতে পারেনি কেউই।

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পার সঙ্গে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী; Source: Twitter/@vijayrupanibjp

কিন্তু কংগ্রেস এবং জেডিএস যদি জোট বাঁধে, তবে তারা ওই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারবে আর সরকার গড়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো বাধা থাকবে না। অপরদিকে, বিজেপির পক্ষে এই ফলাফল বেশ হতাশাজনক। কারণ, এত লড়েও তারা মাত্র কয়েকটি আসন কম পেয়ে সরাসরি সরকার গড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। সাম্প্রতিক অতীতে মণিপুর এবং গোয়াতে কংগ্রেস বৃহত্তম দল হিসেবে শেষ করলেও বিজেপি তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়ে ফেলে তাদের উন্নততর সাংগঠনিক কার্যশক্তির কারণে। এবার কংগ্রেসের পালা তা ফিরিয়ে দেওয়ার। যদিও মণিপুর এবং গোয়া পর্বে যারা কংগ্রেসের ব্যর্থতা দেখে হাসাহাসি করেছিল, সেই বিজেপির সমর্থকদের কর্ণাটকের ঘটনাপ্রবাহ দেখে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। কিন্তু রাজনীতি দু’মুখো তলোয়ার, সে কথা তাদের মানতেই হবে।

আরও দুর্বল হলো কংগ্রেস

বিজেপির নেতা, সমর্থকরা অবশ্য এই ভেবে আত্মপ্রসাদ অনুভব করছেন যে, কংগ্রেসকে অন্তত ধাক্কা দেওয়া গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগাগোড়াই ভারতকে কংগ্রেস-মুক্ত করার কথা বলে এসেছেন আর কর্ণাটকই যেহেতু কংগ্রেসের শাসনে শেষ বড় রাজ্য ছিল, তাই এখানে কংগ্রেসকে হারানো একটি মর্যাদার লড়াই হিসেবে নিয়েছিল বিজেপি। কংগ্রেস হয়তো ক্ষমতায় এরপরেও থাকবে, কিন্তু তার অবস্থান অবশ্যই দুর্বল হবে আগের থেকে; জেডিএস-এর মতো একটি আঞ্চলিক দলের কাছে মাথা নোয়াতে হবে তার।

তবে একই সঙ্গে, এই নির্বাচনের ফল বিজেপিকে দক্ষিণ ভারতেও বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দান করল, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। দক্ষিণে কর্ণাটক ছাড়াও বেশ কিছু রাজ্য রয়েছে যেখানে বিজেপি এই মোদীময় যুগেও সেরকম কল্কে পায় না। আর কর্ণাটকেও বিজেপি এর আগেও বৃহত্তম দল হিসেবে ফল করেছে কিন্তু স্থায়িত্ব দিতে পারেনি কোনোবারেই। আর স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়িত্ব দিতে তারা তখনই পারবে, যখন তাদের স্থানীয় নেতৃত্ব জোরদার হবে। কর্ণাটকের বিজেপির অন্দরে ঐক্য খুব সাংঘাতিক এ কথা বলা যাবে না আর দুর্নীতিতে অভিযুক্ত বি এস ইয়েদুরাপ্পার বাইরে গিয়েও তারা এখনও পর্যন্ত কোনো নতুন মুখ তুলে আনতে পারেনি, যিনি রাজ্য রাজনীতিতে সর্বস্তরে গৃহীত হতে পারেন।

জেডিএসকে এবার ভালো ফল করতেই হতো

বাকি রইল জেডিএস। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়ার এই দলটির জন্যে এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০০৮ এবং ২০১৩ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পরে বর্ষীয়ান এই নেতা এবং তার দলের কাছে এবারে ভালো ফল না করলে ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারত।

বিশেষ করে ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস এবং বিজেপি দুই দলকেই নাকানিচুবানি খাইয়েছিলেন দেবেগৌড়ার পুত্র এবং কর্ণাটকের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী। এরপর দুই জাতীয় দলের সঙ্গেই জনপ্রিয়তার দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে থাকে এই পরিবার-কেন্দ্রিক দলটি। জেডিএস-এর আরও একটি দুর্বলতা হচ্ছে দলটির ভৌগোলিক প্রসার সীমিত এবং প্রধানত ভোক্কালিগা সম্পদায়ের মধ্যেই তার আবেদন আবদ্ধ। এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটাতে জেডিএস নেতৃত্ব এবারের নির্বাচনে জোট বাঁধে উত্তরপ্রদেশের দলিত-কেন্দ্রিক দল বহুজন সমাজ পার্টি বা বিএসপি-র সঙ্গে। বিএসপি নেতা মায়াবতী গত কয়েকটি বড় নির্বাচনে নিজের রাজ্যেই মোদীর কাছে পর্যুদস্ত হলেও এবছরের গোড়ায় উত্তরপ্রদেশেই আঞ্চলিক বৈরী সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে দুটি উপনির্বাচনে সমঝোতা করে তার দল এবং দুটিতেই বিজেপি পরাজিত হয়।

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া; Source: Twitter/@siddaramaiah

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই এসপি-বিএসপি জোটের মধ্যেই সুপ্ত রয়েছে ২০১৯ সালের মোদী-বিরোধী জোটের সম্ভাবনা। কর্ণাটক নির্বাচনেও জেডিএস-বিএসপি জোটের মধ্যে দিয়ে যেন সেই সম্ভাবনা আরও একটু দৃঢ় হল। তবে ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যৎই জানে। আপাতত এই জোট জেডিএসকে যে বেশ উপকৃত করেছে এবং কংগ্রেস এবং বিজেপি দুই দলের দিকেই শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।

মায়াবতী আসাতে জেডিএস কংগ্রেস এবং বিজেপির ‘এলিটিস্ট’ রাজনীতিকে লক্ষ্য করে, আর তার সুফলও আসে হাতেনাতে। দলিত, কৃষক, অনগ্রসর মানুষ ইত্যাদি শ্রেণীর কাছে জেডিএস-এর আবেদন আরও পূর্ণতা পায়।

এবারে জুলিমিলি সরকার হলে তা কদ্দিন টিকবে কে বলতে পারে?

তবে জেডিএস-এর থেকে এবারে মুখ্যমন্ত্রী হলেও এই জুলিমিলি সরকার কতটা স্থায়ী হবে সে নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এর আগে ২০০৪ সালের নির্বাচনেও বিজেপি বৃহত্তম দল, কংগ্রেস দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং জেডিএস তৃতীয় ছিল- ঠিক যেমনটি এবারে হয়েছে। সেবারেও ‘সাম্প্রদায়িক’ বিজেপিকে ঠেকাতে জোট করে সরকার তৈরি করে কংগ্রেস এবং জেডিএস; বড় দল হিসেবে কংগ্রেস থেকে মুখ্যমন্ত্রী হন ধরম সিং। উপমুখ্যমন্ত্রী হন কুমারস্বামী। অথচ সেবারেও কিন্তু এবারের মতোই জেডিএস বলেছিল যে একাই সরকার গড়ব, কাউকে প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু সরকার গঠনের বছর দুই শেষ হওয়ার আগেই এই জোটের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়তে থাকে।

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধ্যক্ষ রাহুল গান্ধী; Source: Indian National Congress/Wikimedia Commons

এরপর কর্ণাটকের স্থানীয় নির্বাচনে জেতার পরে কংগ্রেস কোনোরকম জোটে যেতে অস্বীকার করে আর তারপরেই শুরু হয় সম্পর্কে টানাপোড়েন। ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে কুমারস্বামীর নেতৃত্বে কংগ্রেস জোট ভেঙে বেরিয়ে আসে জেডিএস এবং সুযোগসন্ধানী বিজেপির সঙ্গে তৈরি হয় নতুন জোটের সরকার। ঘটনার আকস্মিকতায় জেডিএস-এর জাতীয় সভাপতিত্ব থেকে ইস্তফা দেন দেবেগৌড়া, কিন্তু তাতেও কুমারস্বামীর পরিকল্পনা বদলায়নি।

তবে বিজেপির সঙ্গেও জেডিএস-এর সংসার টেকেনি বেশিদিন। দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল যে ক্ষমতায় থাকার প্রথম ২০ মাসের পর জেডিএস-এর কুমারস্বামীর থেকে মুখ্যমন্ত্রীত্বের পদ বিজেপির হাতে যাবে কিন্তু সময় যখন আগত, কুমারস্বামী পদ ছাড়তে গররাজি হন। আঠারো জন বিজেপি বিধায়ক পদত্যাগ করেন; কুমারস্বামীকে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত করে বিজেপি এবং সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া জেডিএস ছেড়ে যোগ দেন কংগ্রেসে। ফের একবার উল্টে পড়ে কর্ণাটকের সরকার; ২০০৮ সালে নতুন করে ভোট হয় আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি।

সেকুলারহয়েও জেডিএস অতীতে হাত মিলিয়েছে বিজেপির সঙ্গে; নীতীশকুমারও একই কাজ করেছেন বিহারে

কথা হচ্ছে, ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালে যে কাণ্ড করেছিল জেডিএস, তা এবারেও যে হবে না তার কি নিশ্চয়তা? এবারে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে যদি সরকারের মুখ্য নিয়ন্ত্রক দেবেগৌড়ার দল হয়, তবে যে তারা অত্যাগ্রহে কিছু করে বসবে না এমন দিব্যি কে দিতে পারে?

ভারতের শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় সভাপতি অমিত শাহ; Source: Twitter/@vijayrupanibjp

কংগ্রেস নিজেদের ডুবন্ত নৌকা বাঁচাতে জেডিএস-এর নেতৃত্ব মেনে নিলেও আগামী পাঁচ বছরের শাসনকালে সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়া কংগ্রেস সরকারের নিয়মনীতি নিয়েই জোটের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হবে না তাই বা কে বলতে পারে? আর জেডিএস নাম ‘সেকুলার’ হলেও যদি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে অতীতে বিজেপির সান্নিধ্য গ্রহণ করতে পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতেও তা নয় কেন?

বিহারে নীতিশকুমারের মতো ধর্মনিরপেক্ষ জোটের অন্যতম প্রধান মুখ যদি মেয়াদের মাঝখানে ডিগবাজি খেয়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ বিজেপির হাত ধরতে পারে, তবে কুমারস্বামীর ক্ষেত্রে তা হতে না পারার কিছু নেই।

কর্ণাটকের চর্বিতচর্বণ রাজনীতিতে নতুন চিন্তাভাবনার প্রয়োজন

আজ হয়তো সময় হয়েছে কর্ণাটকের রাজনীতিতে নতুন ভাবনাচিন্তা করার, যাতে এই ত্রয়ী বারংবার সাধারণ ভোটারদের দেওয়া মতকে নিয়ে ছেলেখেলা না করতে পারে। এব্যাপারে মনে আসে আমি আদমি পার্টির কথা। যদিও দিল্লিতে তৈরি হওয়া এই ‘অরাজনৈতিক’ দলটি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, কিন্তু ভারতের মতো তরুণ উদীয়মান দেশে যে  ধরনের নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন, তা ওই আমি আদমি পার্টির কাহিনীতেই লুকিয়ে রয়েছে। কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরু দেশের মধ্যে অন্যতম বড় এবং জনপ্রিয় কসমোপলিটান শহর; সেখানে ওই ধরনের রাজনৈতিক প্রয়াস চালানো অসম্ভব কিছু নয়; এমনকি সেরকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছেও অতীতে। প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও ভারতের নাগরিক সমাজকে এই চেষ্টা করে যেতেই হবে। নতুবা ওই স্বার্থপর রাজনৈতিক শ্রেণীর কাছে বারেবারেই অপমানিত এবং বিভ্রান্ত হতে হবে সাধারণ মানুষকে।

Featured Image Source: Hindustan Times

Related Articles