টরন্টো ভ্যান হামলা: নেপথ্যে কী?

গত ২৩ এপ্রিল টরন্টোতে পথচারীদের উপর ভ্যান তুলে দিলে ১০ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়। ঘটনাটি পশ্চিমা বিশ্বে বেশ আলোচনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। হামলার এ পদ্ধতি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। হামলাকারীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তার নাম আলেক মিনাসিয়ান। হামলা করার কিছু পূর্বে তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসও দেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই আলেক মিনাসিয়ান? কেনই বা তিনি এতগুলো মানুষের উপর এভাবে ভ্যান তুলে দিয়ে হত্যা করলেন? ফেসবুকে দেওয়া তার পোস্টটি কী ছিল এবং এর থেকেই বা কী বোঝা যায়?

আলেক মিনাসিয়ান কে?

আলেক মিনাসিয়ান টরন্টোর রিচমন্ডের অধিবাসী। ২৫ বছর বয়সী মিনাসিয়ানের লিংকডইন এর প্রোফাইল থেকে জানা যায়, তিনি সেনেকা কলেজের একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবেও পরিচয় দেন। তিনি বিভিন্ন অ্যাপ তৈরির কাজ করতেন।

কলেজের সহপাঠীরা তাকে সামাজিকভাবে ‘উদ্ভট’ বলে বর্ণনা করে। হামলা চালানোর আগের সপ্তাহেই তিনি কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। সহপাঠীরা জানান, স্কুলে তিনি সাধারণত একাকী থাকতেন এবং প্রায়ই হাত ও মাথা চুলকাতেন, যা কিনা ‘অবসেসিভে কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার’ এর একটি লক্ষণ।

আলেক মিনাসিয়ান; Source: Toronto Star

কিছু সহপাঠীর মতে, তিনি কখনো চরমপন্থী অভিমত অথবা সহিংস আচরণ প্রকাশ করেননি। আরি ব্লাফ নামে তার এক স্কুলের সহপাঠী জানান, তার আচরণ অদ্ভুত ছিল এবং তার আশেপাশের মানুষ এতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতো না। তবে তার মাঝে সহিংসতার কোনো লক্ষণ দেখেননি তিনি।

একজন সহপাঠী তাকে খুব মেধাবী বলে মত প্রকাশ করে এবং মিনাসিয়ান এমন কিছু করতে পারে বলে তার ধারণাতেই নেই। স্কুলে মিনাসিয়ান একজন আইটিতে দক্ষ শিক্ষার্থী বলে পরিচিত ছিলেন।

২০১৭ সালের শেষের দিকে তিনি কিছুদিন কানাডার সশস্ত্র বাহিনীতেও কাজ করেছেন বলে প্রকাশ করেছে রয়টার্স। ১৬ দিনের প্রশিক্ষণের পর তিনি স্বেচ্ছায় তা ছেড়ে দেন বলে জানান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।

২৩ এপ্রিল কী ঘটেছিল?

মিনাসিয়ান ২৩ এপ্রিল একটি ভ্যান নিয়ে পথচারীদের ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। পথচারীদের মতে, তিনি ঘণ্টায় প্রায় ৭০ মাইল বেগে জনবহুল রাস্তাটিতে প্রায় এক মাইলের বেশি অতিক্রম করেন। স্থানীয় সময় ১টা ৩০ মিনিটে তারা দেখতে পান, একজন নারী এবং বয়স্ক লোক প্রচণ্ড বেগে আসা ভ্যানের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন।

অবশেষে যখন প্রতিবন্ধক পেয়ে মিনাসিয়ান থামতে বাধ্য হন, তখন ইতিমধ্যে তার পেছনে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পুলিশ তাকে ধরতে গেলে তিনি কিছু একটা তাদের দিকে তাক করে গুলি চালানোর ভয় দেখান এবং জানান, তার কাছে বন্দুক আছে। তবে পুলিশ এতে ভয় না পেয়ে জানান, “আমি পরোয়া করি না, বেরিয়ে আসুন।”

ঘটনাস্থলে পুলিশ; Source: REUTERS/Chris Donovan

কোনোরকম গুলি না করেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। যদিও তিনি ‘আমাকে মেরে ফেলুন’ বলে চিৎকার করছিলেন।

টরন্টোর পুলিশ চিফ জানান, মিনাসিয়ান পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে আগে থেকে পরিচিত কেউ নন। তবে তারা মনে করছে, তার কর্মকাণ্ড অবশ্যই ইচ্ছাকৃত ছিল। এছাড়া কানাডার সিবিসি প্রকাশ করে, তিনি কোনো পরিচিত সন্ত্রাসী দলের সাথেও যুক্ত না।

মিনাসিয়ান ফেসবুকে কী পোস্ট করেছিলেন?

হামলার অভিপ্রায় সম্পর্কে পুলিশ কিছু না জানালেও মিনাসিয়ান হামলার কিছু পূর্বেই ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি এলিয়ট রজার (২২) নামে একজনের প্রশংসা করেন যে ২০১৪ সালে ৬ জনকে হত্যা করেছিল।

তার ফেসবুকের স্ট্যাটাসটি ছিল, “ইনসেল বিদ্রোহ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আমরা সকল চ্যাড ও স্টেসিদের পরাস্ত করবো। সকল প্রশংসা মহত্তম ভদ্রলোক এলিয়ট রজারের।”

মিনাসিয়ানের স্ট্যাটাস; Source: Toronto Star

ইনসেল আসলে কী?

বর্তমানে ইনসেল আসলে ম্যাসেজ সাইট রেডিটের একটি নিষিদ্ধ গ্রুপ, যেখানে পুরুষরা নারীদের দোষারোপ করে নিজেদের যৌন কার্যকলাপের অভাবের কথা আলোচনা করত। এটি এলিয়ট রজার ব্যবহার করত যার কথা মিনাসিয়ান তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন। চ্যাড ও স্টেসি বলতে আকর্ষণীয় পুরুষ ও নারীদের বোঝায়, যাদেরকে ‘ইনসেলদের’ থেকে উত্তম মনে করা হয় এবং এরা ইনসেলদের জন্য দুষ্প্রাপ্য।

হামলার অভিপ্রায় কী ছিল?

এ হামলার অভিপ্রায় নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পুলিশ হামলার অভিপ্রায় নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে মিনাসিয়ানের ফেসবুক পোস্ট ও এলিয়ট রজারের প্রসশংসা দেখে তাকে নারীদের প্রতি বিরাগভাজন মনে করার কারণ রয়েছে। এলিয়ট রজারও হামলা করার আগে করা এক ভিডিওতে নারীদের উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেন।

পুলিশ জানায়, যারা ২৩ এপ্রিলের হামলার শিকার হয়েছেন তাদের অধিকাংশই নারী। তবে মিনাসিয়ান যে নারীদের উপর রাগান্বিত ছিলেন, সে ব্যাপারটি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

টরন্টো পুলিশের গোয়েন্দা সার্জেন্ট গ্রাহাম বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি হামলার কিছু পূর্বে ফেসবুকে অর্থপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বলে জানা গেছে।” কর্তৃপক্ষ এখনও এ হামলার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে।

গত ২৪ এপ্রিল পুলিশ টরন্টোর উত্তরে তার শহরতলীর দোতলা বাসায় প্রবেশ করে। পুরো বাড়িটি পুলিশের গাড়িতে ঘেরাও করে ফেলে

মিনাসিয়ান কীভাবে আদালতে আসেন?

মিনাসিয়ানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের শুনানির জন্য তাকে ২৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার আদালতে আনা হয়। সাদা জাম্পস্যুট পরিহিত মিনাসিয়ানের মাথা কামানো ছিল। তিনি তার হাত পিছনে ধরে রেখেছিলেন। তাকে খুব কমই আবেগপ্রবণ দেখাচ্ছিল।

তাকে ১০ মে জামিনের শুনানির জন্য আবার আদালতে হাজির করানো পর্যন্ত হেফাজতে রাখা হবে। হামলায় আক্রান্ত বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে। তার উপর ১০ জনের হত্যা ও ১৩ জনকে হত্যা করার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়।

আদালতে মিনাসিয়ান; Source: THE CANADIAN PRESS/Alexandra Newbould

তার আত্মীয় হিসেবে বিবেচিত বিচারকক্ষের প্রথমসারিতে বসা এক ব্যক্তিকে কান্না করতে দেখা যায়। তার কিছু বলার ছিল কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি সাংবাদিকদেরকে জবাবে বলেন, ‘দুঃখিত’।

হামলার কারণ সঠিকভাবে উদঘাটিত হওয়ার আগে নির্দিষ্ট করে এর অভিপ্রায়ের ব্যাপারে কোনো সুরাহা করা কঠিন। তবে এবিসি নিউজ জানায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এটিকে সন্ত্রাসবাদের চেয়ে মানসিক অসুস্থতার কারণ হিসেবেই গণ্য করছেন।

Featured Image Source: Galit Rodan/The Canadian Press via AP 

Related Articles