খেলাধুলা

4 মিনিট লাগবে পড়তে

কুখ্যাত বডিলাইন সিরিজ এবং এক হতভাগ্য লারউডের গল্প

Published

4 মিনিট লাগবে পড়তে to read

Search Icon Search Icon Search Icon
Papiya Devi Ashru

Papiya Devi Ashru

Contributor

ইতিহাস যেমন মানুষ সৃষ্টি করে, মানুষও তৈরি করে ইতিহাস। ইতিহাসের পথচলায় কেউ পান অমরত্বের সুধা, আর কেউ হন ইতিহাসের নির্মম পরিণতির শিকার। এমনই এক সত্যিকার গল্প নিয়ে তৈরি আজকের এই লেখা।
ক্রিকেটকে জেন্টলম্যান স্পোর্টস হিসেবে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেই স্পিরিটকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল বডিলাইন সিরিজ। ক্রিকেটের ইতিহাসে যাকে কালো অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৩২- ৩৩ সালে অষ্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার অনুষ্ঠিত অ্যাশেজ সিরিজ ‘বডিলাইন সিরিজ’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। আর ইংলিশ বোলার লারউড ছিলেন সেই সিরিজের কলঙ্কিত এক নাম। কী হয়েছিল সেই সিরিজে? কেনই বা একে বডিলাইন সিরিজ বলা হচ্ছে? লারউড, আসলেই কি দোষী? নাকি সে ছিল ক্রিকেট রাজনীতির শিকার? তেমনি এক অনুসন্ধানের চেষ্টা আজকের এই লেখায়।

১৯৩০-এ ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া সেই সিরিজ জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে, যেখানে স্যার ডন ব্রাডম্যান সেই সিরিজে করেছিলেন সর্বোচ্চ ৯৭৪ রান। কাজেই পরের সিরিজে ইংল্যান্ডের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। ব্র্যাডম্যানকে থামানো আর অ্যাশেজ জয় একই সুতোয় গাঁথা। যেকোনো উপায়েই হোক, তাকে আটকাতে হবে। আর তার জন্য ইংল্যান্ড তৈরি করে এক অনন্য কৌশল যার থেকে জন্ম নিল ক্রিকেটের এক বিতর্কিত ইতিহাসের।

বিতর্কিত বডিলাইন সিরিজের টুকরো কোলাজ

১৯৩২ সালের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ডের পরের সিরিজ। অ্যাশেজ জিততে মরিয়া ইংল্যান্ড। আর তাই ইংল্যান্ডের ক্যাপ্টেন নির্বাচিত করা হলো ধুরন্ধর ক্রিকেট-মস্তিষ্ক ডগলাস জার্ডিনকে। সিরিজ জিততে হলে পরাস্ত করতে হবে ক্রিকেটের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ব্র্যাডম্যানকে।

বডিলাইন সিরিজের ইংল্যান্ডর দলপতি ডগলাস জার্ডিন

সফরে ইংলিশ দলটিতে পেসার ছিলেন পাঁচজন। লারউড, বিল এবং মরিস টেট প্রচন্ড গতিতে বল করতে পারতেন। সাথে গাবি অ্যালেন আর হ্যামন্ডের মিডিয়াম পেস নিয়ে ঐ ইংল্যান্ড দলের ছিল বেশ শক্তিশালী পেস আক্রমণ। কিন্তু জার্ডিনের তুরুপের তাস ছিল নটিংহ্যামের এক কয়লা খনির সাবেক শ্রমিক হ্যারল্ড লারউড, যিনি বল করতে পারতেন সাংঘাতিক জোরে।

ইংল্যান্ড ক্রিকেটার হ্যারল্ড লারউড

জার্ডিন তার বোলারদের নিয়ে আলোচনায় বসেন কিভাবে ব্র্যাডম্যানকে আটকানো যায়। আগের অ্যাশেজেই ব্র্যাডম্যানের লেগ স্ট্যাম্পের লাফিয়ে ওঠা বল খেলতে সমস্যা হচ্ছিল। সেই হিসেব মাথায় রেখেই দলনেতা তৈরি করেন কর্মপরিকল্পনা যা এল বডিলাইন বা ফার্স্ট লেগ থিওরি হিসেব পরিচিতি লাভ করে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে বোলারদের উপর। সেই পরিকল্পনার মূল কথাই ছিলো অজি ব্যাটসম্যানদেরকে ক্রমাগত লেগ স্ট্যাম্প বরাবর বল করে যাওয়া।

১৯৩২ সালের টেস্ট সিরিজে ঘোষিত ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেট দল

প্রথম টেস্টের আগে এক প্রস্তুতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। ‘অস্ট্রেলিয়ান একাদশ’-এর নেতৃত্বে ছিলেন বিল উডফুল। জার্ডিনকে ঐ ম্যাচ বিশ্রাম দেয়া হয়। ইংল্যান্ড দলের নেতৃত্ব দেন জার্ডিনের ডেপুটি বব ওয়াইট। সেই ম্যাচেই ইংল্যান্ড তাদের পূর্বপরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে আরম্ভ করে। শর্ট লেগ, গালি, ফাইনলেগ, স্লিপে একগাঁদা ফিল্ডার রেখে শরীর লক্ষ্য করে প্রচন্ড গতির বাউন্সার আর লেগস্ট্যাম্পের উপর ক্রমাগত বল করে যেতে লাগলো ইংলিশ বোলাররা। অস্ট্রেলিয়ানরা রান করা বাদ দিয়ে শরীর বাঁচাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

সিডনীতে শুরু হলো প্রথম টেস্ট। পরিকল্পনা মাফিক ইংলিশ বোলররা লেগ স্ট্যাম্প লক্ষ্য করে অনবরত বাউন্সার করে যেতে লাগলো। লারউডের মারাত্মক জোরে বল করা অস্ট্রেলিয়ানদের স্বস্তিতে রাখেনি মোটেই। লারউডের বলের অবিশ্বাস্য গতি চমকে দিয়েছিল ক্রিকেট কিংবদন্তী ডন ব্র্যাডম্যানকেও। এই টেস্টের প্রথম ইনিংসে স্ট্যান ম্যাককেবের অপরাজিত ১৮৭ রানের বদৌলতে অস্ট্রেলিয়া করে ৩৬০ রান। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে লারউডের বিধ্বংসী বোলিংয়ের সামনে অজি ব্যাটসম্যাসের কেউই দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। অজিরা অল আউট হয়ে যায় ১৬৪ রানে। দুই ইনিংস মিলে লারউডের শিকার সংখ্যা ১০, তার মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে পান ২৮ রানে ৫ উইকেট। প্রথম ইনিংসে হারবার্ট সাটক্লিফ, ওয়াল্টার হ্যামন্ড আর পতৌদির নবাবের সেঞ্চুরিতে ৫২৪ রান করা ইংল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র এক রান। ফলাফল ১০ উইকেটের ইংল্যান্ডের বিশাল জয়।

বডিলাইন সিরিজের ৩য় টেস্টে মাথায় মারাত্মক আঘাত পান অস্ট্রেলিয়ার ব্যটসম্যান ওল্ডফিল্ড

প্রথম ম্যাচটা ইংল্যান্ড জিতলেও দ্বিতীয় টেস্টটা জিতে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু তৃতীয় টেস্টের বিতর্ক চরমে উঠে। অস্ট্রেলিয়ার দুজন ব্যাটসম্যান খেলার সময় মারাত্মক আঘাত পান। তখন অবশ্য লারউড বল করছিলেন না। কিন্তু ইংল্যান্ডের কৌশলের প্রতিবাদে অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া আর ক্রিকেট সমর্থকদের মধ্যে বিক্ষোভের ঝড় উঠল। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ান সমর্থকরা দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিতে পারেন এমন আশঙ্কাও দেখা দিল।

বডিলাইন টেস্ট সিরিজে লারউডের সেই বিখ্যাত বোলিং অ্যাকশন

তবে মাঠে দর্শকদের দুয়ো লারউডকে টলাতে পারেনি। ইংল্যান্ডের মতো দলে সুযোগ পাওয়া, ক্যাপ্টেনের প্রচন্ড বিশ্বাস ও আস্থা তার উপর। এর মর্যাদা তো তাকে দিতেই হবে। তাই দর্শকদের ব্যঙ্গ তাকে আরো তাতিয়ে দিতে লাগলো। ইংরেজ ফাস্ট বোলারদের দ্রুতগতির নিখুঁত ও আগ্রাসী বোলিংয়ের দাপটে ইংলিশরা সেই সিরিজ জিতে নেয় ৪-১ এ।

ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা কতটা সফল ছিল তা অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের বডিলাইন সিরিজের আগে এবং পরে তাদের ব্যাটিং গড়ের (গ্রাফে দেখানো) তারতম্য থেকে সুস্পষ্ট

এই সিরিজে ডগলাস জার্ডিন, লারউডকে দিয়ে বডিলাইন থিওরি প্রয়োগ করে ব্র্যাডম্যানকে বেঁধে ফেলেন। কারণ স্যার ডনের ওই সিরিজে গড় ছিল মাত্র ৫৬.৫৭ যেখানে তার পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ারের গড় ছিল ৯৯.৪। ওই সিরিজে লারউড একাই নেন ৩৩ উইকেট, যার মধ্যে চারবার আউট করেন ডন ব্র্যাডম্যানকে।

ডন ব্র্যাডম্যান ও লারউড

এই বডিলাইন নিয়ে পুরো সিরিজ জুড়ে চলে নানা তর্ক-বিতর্ক। যদিও বডিলাইন বোলিং এই সিরিজের আগেও ছিল। তবে এই সিরিজের আগে সার্থকভাবে এর প্রয়োগ কোনো দলই করতে পারেনি। সেসময় ক্রিকেটের আইনেও তা আইন বহির্ভূত ছিল না, ছিল না বাউন্সার প্রয়োগের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা লেগ সাইডে সর্বোচ্চ কত জন ফিল্ডার রাখা যাবে তারও কোনো বিধি-নিষেধ।

নরমাল বোলিং আর বডিলাইন বোলিং ডেলিভারির মধ্যকার তফাৎ

তবে কেন বডিলাইনকে কুখ্যাত বলা হচ্ছে? তার যথার্থ কারণও রয়েছে। সেসময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যাটসম্যানদের জন্য ছিল না এখনকার মতো নিরাপত্তা সরঞ্জামের এতো ব্যবহার। এলবো গার্ড, থাই বা চেস্ট গার্ডের প্রচলন হয় আরো পরে। হেলমেটের প্রচলন হয় ১৯৭০ সালের দিকে। সেই অরক্ষণীয় সময়ে লারউড-ভোসরা চার-পাঁচজন ফিল্ডার দিয়ে লেগ সাইডে ব্যাটসম্যানকে ঘিরে ধরে তার শরীর লক্ষ্য করে নিখুঁত লাইন লেন্থে ক্রমাগত ছুড়ে গেছেন একেকটি গোলা। ঘন্টায় ৯০ মাইল বেগে ছুটে আসা বল শরীরে লাগলে সেটা শুধু যন্ত্রণাদায়কই ছিল না, ব্যাটসম্যানকে মারাত্মক জখমও করতে পারত!

ইংরেজরা এর নাম দিলেন ফাস্ট লেগ থিওরি। আর অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এই ধরনের বোলিংকে ‘বডিলাইন’ বলে অভিহিত করল। অ্যাডিলেড সিরিজ চলাকালীন সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড এমসিসির কাছে ইংল্যান্ডের বডিলাইন কৌশলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এই অখেলোয়াড়ি মানসিকতার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার বন্ধুত্বে ফাটল ধরাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় এবং বডিলাইন আইন পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করে। এই তারবার্তা খবরের শিরোনাম হলো উভয় দেশেই।

বডিলাইন সিরিজ নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট

এমসিসি কর্তৃপক্ষ বিপজ্জনক এই বোলিং কৌশল বন্ধ করতে আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরও দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তাপ কিছুতেই কমছিল না। ইংল্যান্ড ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ এই অস্বস্তি ঢাকতে এমন একজনকে খুঁজতে থাকে যাকে বলির পাঁঠা বানানো যায়। আর পেয়েও গেলো সেই ব্যক্তিকে। তিনি আর কেউ নন, ক্রিকেটে শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধি লারউডের ঘাড়েই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দেয়া হয়।

কিন্তু তিনি কি দোষী ছিলেন? একজন নতুন বোলার সদ্য ইংল্যান্ড দলে সুয়োগ পেয়েছে, যিনি শুধু ক্যাপ্টেনের নির্দেশই পালন করছিলেন, তাকে কেন দোষী করা হলো তা আজও অজানা। হয়তো বা তিনি অভিজাত বংশের প্রতিনিধি নন বলে ইংলিশ কর্তৃপক্ষের তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সহজ হয়েছিল।

বোর্ড থেকে লারউডকে জানিয়ে দেয়া হলো ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতে হলে তাকে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কাছেই ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে লেখা সেই চিঠিতে লারউড সই করেননি। কোনোদিন আর খেলেননি ইংল্যান্ডের হয়েও। এভাবেই নির্মম পরিণতির শিকার হলেন একজন হ্যারল্ড লারউড। এমন একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে অত্যন্ত নিষ্ঠারভাবে ছুড়ে ফেলা হলো ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

তথ্যসূত্র

১) bbc.com

২) প্রথম আলো

৩) espncricinfo.com/bodyline/content/story/148537.html

৪) en.wikipedia.org/wiki/English_cricket_team_in_Australia_in_1932%E2%80%9333

৫) abcofcricket.com/A_Legend_Is_Born/Bodyline/bodyline.htm

এই লেখা নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?

Fascinated
Informed
Happy
Sad
Angry
Amused

মন্তব্যসমূহ