খেমার রুজ শাসন ও গণহত্যা: কম্বোডিয়ার মানুষের ভুলে যাওয়ার মতো ইতিহাস

আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, ১৯৭০ সালে প্রিন্স নরোদম সিহানুকের সরকার আমেরিকারের মদদে সংগঠিত হওয়া এক সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায়, সামরিক জান্তা সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয় কম্বোডিয়ায়। এরপর পাঁচ বছর ধরে চলে গৃহযুদ্ধ। আমেরিকা, দক্ষিণ ভিয়েতনাম কিংবা চীন ও উত্তর ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এই গৃহযুদ্ধে নিজেদের পছন্দের মতাদর্শের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। পাঁচ বছরের যুদ্ধ শেষে ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে রাজধানী নম পেনের পতন হয়, খেমার রুজ ও প্রিন্স নরোদম সিহানুকের সম্মিলিত জোট জয়লাভ করে। জয়লাভ করার পর দেখা যায়, খেমার রুজরা তাদের জোটের আরেক অংশীদার প্রিন্স নরোদম সিহানুককে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে তাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ক্যারিশম্যাটিক নেতা পল পটকে ক্ষমতায় আসীন করে। পল পট ছিলেন কট্টর মার্ক্সিস্ট। তিনি কম্বোডিয়ার শাসনক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর এক অদ্ভুত নীতি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হন, যেটি স্বনির্ভরতার পরিবর্তে কম্বোডিয়ার সাধারণ মানুষের ভাগ্যে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।

নচজআকবককআ
প্রিন্স নরোদম সিহানুকের পতনের পর সামরিক জান্তা সরকার কম্বোডিয়ার শাসনক্ষমতা দখল করে;
image source: youngpioneertours.com

প্রিন্স নরোদম সিহানুক যখন কম্বোডিয়া শাসন করতেন, তখন সংগ্রামের জন্য পল পট ও তার সঙ্গীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে, যেখানে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বসবাস করত। এই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন ছিল একেবারে সাধারণ। তারা পুরো গোষ্ঠীর মানুষজন একত্রে জঙ্গল সাফ করে চাষবাস করত, এবং শ্রমের পরিমাণ অনুযায়ী উৎপাদিত ফসলের ভাগ গ্রহণ করত। লেনদেনের জন্য তারা কোনো মুদ্রা ব্যবহার করত না। বিনিময়প্রথার মাধ্যমে তারা একে অপরকে সহযোগিতা করত। এই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষগুলোর বাড়তি সম্পদের লোভ ছিল না, তারা ধর্মপালনেও তেমন মনোযোগী ছিল না। কমিউনিস্ট নেতা পল পট ও তার সহযোগী কমরেডরা যখন এই বিষয়টি দেখলেন, তখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন- কোনোদিন ক্ষমতা দখল করতে পারলে পুরো কম্বোডিয়াতে এই ‘মডেল’ প্রয়োগ করবেন। অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সোভিয়েত নেতারা এ ধরনের সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যেখানে একটি কমিউনের সকল সদস্য ফসল উৎপাদনে অংশগ্রহণ করত, এবং শ্রম অনুযায়ী ফসলের অংশ লাভ করত।

মচকআকআকআ
কুখ্যাত খেমার রুজ নেতা পল পট; image source: britannica.com

পল পট ও কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ক্ষমতা দখলের পর সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পদ রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করবে, সমস্ত ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের বিলোপ সাধন করা হবে। সম্পদ অধিগ্রহণের পর এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি সাধনের পর শহরে অবস্থানরত বিশাল সংখ্যক মানুষকে গ্রামে পাঠানো হবে চাষাবাদের জন্য। পল পটের ধারণা ছিল, পুরো কম্বোডিয়ায় যে পরিমাণ চাষাবাদের উপযোগী ফসলি জমি রয়েছে, তা যদি সবাই মিলে শ্রম দিয়ে চাষাবাদ করা যায়, তাহলে দেশটির স্বনির্ভরতা অর্জন করতে খুব বেশি সময়ের দরকার হবে না। কিন্তু তাদের এই পরিকল্পনা ছিল পুরোপুরি ভুল। ইতিহাসে দেখা গিয়েছে, কৃষির পাশাপাশি যেসব দেশ শিল্পখাতের উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছে, তারাই স্বনির্ভরতার পথে দ্রুত হাঁটতে পেরেছে। শিল্পখাতকে একেবারে অবজ্ঞা করায় কম্বোডিয়াও খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি। দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক অবকাঠামো এই হঠাৎ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারায় একেবারে বিপর্যয় নেমে আসে।

১৯৭৫ সালের ১৭ এপ্রিল, যেদিন খেমার রুজরা বিজয়ীর বেশে রাজধানী নম পেনে পা রাখে, সেদিন থেকেই এই ‘সকল ব্যক্তিকে গ্রামে নিয়ে চাষাবাদে সংযুক্ত করা’র প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সেদিন দুপুরবেলা কমিউনিস্টরা বন্দুক হাতে শহরের প্রতিটি বাড়ি, স্কুল এবং হাসপাতাল– মোট কথা এমন জায়গা যেখানে মানুষ অবস্থান করতে পারে, সেসব জায়গায় গিয়ে সকল অধিবাসী, ছাত্র ও রোগীকে বের করে নিয়ে আসে। এরপর মাথার পেছনে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাদেরকে গ্রামের উদ্দেশ্যে হাঁটতে বাধ্য করে। হাসপাতালগুলোতে থাকা অসংখ্য রোগী চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। কথিত আছে, খেমার রুজরা পরিবারের সদস্যদের আলাদা করে ফেলেছিল। এর ফলে অসংখ্য শিশু দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। তারা এতটাই নির্মমতা প্রদর্শন করেছিল যে, যারা শারীরিক দুর্বলতা কিংবা অন্যান্য কারণে দ্রুত হাঁটতে পারছিল না, তাদের গুলি করে হত্যা করেছিল। শহরে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের ফরাসি দূতাবাসের সামনে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হয়। এরপর ট্রাকে করে তাদেরকে থাইল্যান্ডের সীমান্তে ফেলে আসা হয়েছিল।

হচওওআপ
ক্ষমতা দখলের পর পল পট কৃষিবিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন; image source: bbc.com

এরপর কম্বোডিয়ান সমাজে বিশুদ্ধতা আনার জন্য শুরু হয় এক নির্মম অভিযান। শ্রেণীহীন এক সমাজের স্বপ্ন দেখা কমিউনিস্টরা যেকোনো ধরনের ধার্মিক, শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী মানুষকে ‘রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে, এবং তাদের বিনা বিচারে গণহারে হত্যা করা হয়। কম্বোডিয়ায় বেশিরভাগ মানুষ ছিল বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। কমিউনিস্টরা গণহারে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনার পবিত্র স্থান ধ্বংস করতে শুরু করে, ধর্মীয় ব্যক্তিদের বেছে বেছে হত্যা করে, নয়তো কৃষিকাজের জন্য গ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ মেনে নিতে পারেননি। তারা এর প্রতিবাদ করলে নির্বিচারে হত্যা করা হয় তাদের। এছাড়াও কম্বোডিয়ার সমাজে বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ স্থান ছিল। তাদেরকে সমাজের উঁচু শ্রেণীর ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। যেহেতু খেমার রুজদের স্বপ্ন ছিল একটি শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, তাই তারা সমাজের উঁচু শ্রেণী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমস্ত পেশার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

জচকতবক
খেমার রুজদের হাতে অসংখ্য নিরপরাধ কম্বোডিয়ান নাগরিক মারা যান; image source: english.cambodiadaily.com

খেমার রুজদের শাসনের প্রতি যাদের আস্থা ছিল না বা সন্দেহ পোষণ করতেন, এমন মানুষদের সংশোধনের জন্য ‘রি-এডুকেশন ক্যাম্প’ স্থাপন করা হয়। এই রি-এডুকেশন ক্যাম্পগুলোতে সাধারণত যারা যাদের পাঠানো হতো, তাদের খুব কম সংখ্যক মানুষই জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতেন। পুরো কম্বোডিয়া জুড়ে অসংখ্য লেবার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে কম্বোডিয়ান জনগণকে রাখা হতো। এসব ক্যাম্প ছিল অপরিষ্কার ও নোংরা, গাদাগাদি করে থাকায় ছোঁয়াচে রোগগুলো খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হতো। নতুন সমাজ বিনির্মাণের জন্য খেমার রুজরা সমাজের উঁচু শ্রেণীর পেশাজীবীদের হত্যা করতে গিয়ে গণহারে ডাক্তাদেরও হত্যা করেছিল। এরপর পর্যাপ্ত ডাক্তার ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের অভাবে সাধারণ রোগগুলোতে গণহারে মানুষ মরতে শুরু করে। খেমার রুজদের বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দটিও করতে পারত না। কারণ বিরুদ্ধমত এত কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছিল যে সামান্য অভিযোগও মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট ছিল।

অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত ওষুধ, ক্রমাগত দমন-নিপীড়ন, গণহত্যা ইত্যাদি কারণে গণহারে মানুষ মারা যেতে থাকে। ঠিক কী পরিমাণ মানুষ মারা গিয়েছিল– এটা নিয়ে এখনও তর্ক আছে। তবে এই বিষয়ে সবাই একমত যে পনের লক্ষ থেকে ত্রিশ লক্ষের মতো মানুষ মারা গিয়েছিলেন খেমার রুজদের হাতে। মাত্র চার বছরে এই বিপুল পরিমাণ মানুষ গণহত্যার শিকার হওয়ার খবর যখন বাইরের বিশ্বে প্রচারিত হয়, তখন দেশটির ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে পতিত হয়। অবশেষে ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামিরা কম্বোডিয়ায় আক্রমণ করলে এই অপশাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু এতে সংকট দূরীভূত না হয়ে আরও গভীর আকার ধারণ করে। ভিয়েতনামিরা কম্বোডিয়া দখল করে নিজেদের মনমতো সরকার স্থাপন করে দিয়ে গেলেও খেমার রুজরা আবারও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গিয়ে অবস্থান নেয়, এবং ক্ষমতা পুনর্দখলের জন্য গৃহযুদ্ধ শুরু করে। এই গৃহযুদ্ধ স্থায়ী হয় প্রায় এক দশক।

Related Articles