কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ: দ্রোণ পর্বের সারসংক্ষেপ || পর্ব–২

[১ম পর্ব পড়ুন]

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের একাদশ দিনে দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করার উদ্দেশ্যে পাণ্ডব ব্যূহের গভীরে প্রবেশ করেন এবং ঠিক যুধিষ্ঠিরের রথের সামনে উপস্থিত হন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে অর্জুন সেখানে উপস্থিত হয়ে দ্রোণাচার্যের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেন। সেদিন শিবিরে প্রত্যাবর্তনের পর কৌরব বাহিনীর রাজরাজড়ারা শলাপরামর্শ করার জন্য একত্রিত হন। দ্রোণাচার্য দুর্যোধনকে বলেন যে, অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থাকলে যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করা অসম্ভব এবং এই বিষয়ে তিনি দুর্যোধনকে আগেই জানিয়েছিলেন। তিনি দুর্যোধনকে পরামর্শ দেন যে, কৌরব বাহিনীর কেউ অর্জুনকে যুদ্ধে আহ্বান করে যুদ্ধক্ষেত্রের দূর প্রান্তে নিয়ে যাক। অর্জুন কখনো যুদ্ধের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতেন না। সুতরাং দ্রোণাচার্যের হিসেব ছিল এরকম: অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রের এক প্রান্তে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকবেন এবং সেই সুযোগে তিনি যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করে ফেলবেন।

দ্রোণাচার্যের বক্তব্য শুনে ত্রিগার্তার রাজা সুশর্মা মন্তব্য করেন, তারা কখনো অর্জুনের ক্ষতি করেননি, কিন্তু অর্জুন বরাবর তাদের ক্ষতি করে এসেছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, হয় তার নেতৃত্বে ত্রিগার্তার সৈন্যরা অর্জুনকে বধ করবে, নয়তো তারা সকলে অর্জুনের হাতে নিহত হবেন। সুশর্মা এই কঠোর প্রতিজ্ঞা করার পর তার ভাই সত্যরথ, সত্যবর্মা, সত্যব্রত, সত্যেষু ও সত্যকর্মার নেতৃত্বে ১০,০০০ রথী একই প্রতিজ্ঞা করেন। এরপর কৌরব বাহিনীর আরো ২০,০০০ রথী অনুরূপ প্রতিজ্ঞা করেন। এই কঠোর প্রতিজ্ঞাকারীরা ‘সংশপ্তক’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

যুদ্ধের দ্বাদশ দিন: সংশপ্তকদের মরণপণ লড়াই, দ্রোণাচার্যের বীরত্ব এবং ভগদত্তের অন্তিম লড়াই

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দ্বাদশ দিন ভোরে উভয় পক্ষের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত হয় এবং সংশপ্তকরা যুদ্ধক্ষেত্রের দক্ষিণ কোণে অবস্থান গ্রহণ করে অর্জুনকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আহ্বান জানায়। অর্জুন সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য যুধিষ্ঠিরের অনুমতি প্রার্থনা করেন। যুধিষ্ঠির প্রত্যুত্তরে বলেন যে, দ্রোণাচার্য তাকে বন্দি করার পরিকল্পনা করেছেন এবং এই পরিস্থিতিতে অর্জুনের উচিত এমনভাবে কাজ করা যাতে দ্রোণাচার্যের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। অর্জুন পাঞ্চালের রাজপুত্র সত্যজিৎকে যুধিষ্ঠিরের রক্ষী নিযুক্ত করেন এবং যুধিষ্ঠিরকে পরামর্শ দেন যে, সত্যজিৎ যুদ্ধে নিহত হলে যুধিষ্ঠির যেন সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পশ্চাৎপসরণ করেন। এরপর যুধিষ্ঠির অর্জুনকে সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার অনুমতি প্রদান করেন।

সংশপ্তকরা অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ‘অর্ধচন্দ্রব্যূহ’ গঠন করেছিল, অর্থাৎ তাদেরকে অর্ধচন্দ্রের আকারে সজ্জিত করা হয়েছিল। সংশপ্তকরা সানন্দে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদেরকে দেখে অর্জুন কৃষ্ণের কাছে মন্তব্য করেন যে, “দেখো, দেবকীনন্দন! ত্রিগার্তার এই যোদ্ধারা (যারা যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছে) এমন এক সময়ে আনন্দে পরিপূর্ণ, যেসময় তাদের ক্রন্দনরত অবস্থায় থাকার কথা। কিংবা নিঃসন্দেহে এটি তাদের জন্য আনন্দের সময়, কারণ তারা সেই চমৎকার অঞ্চল (স্বর্গ) লাভ করবে যা ভীরুদের প্রাপ্য নয়।” এই মন্তব্য করার পর অর্জুন তার দেবপ্রদত্ত শঙ্খ ‘দেবদত্ত’ উঠিয়ে খুব জোরে শঙ্খধ্বনি করেন এবং সেটির তীব্র আওয়াজের ফলে সংশপ্তকরা মুহূর্তের জন্য সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু শীঘ্রই তারা সংজ্ঞা ফিরে পায় এবং একযোগে অর্জুনের ওপর আক্রমণ চালায়। অর্জুন ও সংশপ্তকদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

চিত্রকর্মে অর্জুন ও সংশপ্তকদের মধ্যেকার যুদ্ধ; Source: Ramanarayanadatta Shastri/Wikimedia Commons

এদিকে অর্জুন সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যাত্রা করার পরপরই দ্রোণাচার্য কৌরব সৈন্যদেরকে নিয়ে ‘গরুড়ব্যূহ’ গঠন করেন, অর্থাৎ কৌরব বাহিনীকে একটি গরুড়/ঈগলের আকারে সজ্জিত করেন। সেটিকে প্রতিহত করার জন্য যুধিষ্ঠির পাণ্ডব সৈন্যদেরকে নিয়ে ‘অর্ধচন্দ্রব্যূহ’ গঠন করেন, অর্থাৎ পাণ্ডব বাহিনীকে অর্ধচন্দ্রের আকারে সজ্জিত করেন। উভয় পক্ষের ব্যূহ গঠনের পরপরই তাদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায় এবং দ্রোণাচার্য সরাসরি যুধিষ্ঠিরের দিকে অগ্রসর হন।

কৌরবদের ব্যূহ দেখে এবং অর্জুনের অনুপস্থিতির কারণে যুধিষ্ঠির নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি ধৃষ্টদ্যুম্নকে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন যেন দ্রোণাচার্য তাকে বন্দি করতে না পারেন। প্রত্যুত্তরে ধৃষ্টদ্যুম্ন যুধিষ্ঠিরকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, তিনি জীবিত থাকতে দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠিরকে বন্দি করতে পারবেন না। যুধিষ্ঠিরকে আশ্বস্ত করে ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তার দিকে অগ্রসর হন এবং তার গতিরোধ করেন।

যুদ্ধের শুরুতেই ধৃষ্টদ্যুম্নের সঙ্গে সাক্ষাৎকে দ্রোণাচার্য অশুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্মই হয়েছিল দ্রোণাচার্যকে বধ করার উদ্দেশ্যে। এমতাবস্থায় দুর্মুখ (দুর্যোধনের ভাই) ধৃষ্টদ্যুম্নের দিকে অগ্রসর হন এবং তার বিরুদ্ধে দ্বৈরথ যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই ফাঁকে দ্রোণাচার্য আবার যুধিষ্ঠিরের দিকে অগ্রসর হন এবং তার তীরে বিপুল সংখ্যক পাণ্ডব সৈন্য নিহত হয়। পাণ্ডব বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি করতে করতে দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠিরের কাছাকাছি এসে পৌঁছান এবং তার ওপর তীরবর্ষণ করেন।

এসময় যুধিষ্ঠিরের রক্ষী সত্যজিৎ অগ্রসর হয়ে দ্রোণাচার্যের গতিরোধ করেন এবং তার বিরুদ্ধে দ্বৈরথ যুদ্ধে লিপ্ত হন। একটি তীব্র কিন্তু সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর সত্যজিতের তীরের আঘাতে দ্রোণাচার্যের রথের সারথি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে এবং রথটির ঝাণ্ডা কাটা পড়ে। এরপর দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে সত্যজিতের ধনুক কাটা পড়ে, কিন্তু সত্যজিৎ আরেকটি ধনুক উঠিয়ে দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। এসময় পাণ্ডব রথী বৃক এসে সত্যজিতের সঙ্গে যোগ দেন এবং দ্রোণাচার্যকে আক্রমণ করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে সত্যজিৎ ও বৃকের ধনুকদ্বয় কাটা পড়ে। এরপর দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে বৃকের রথের সারথি ও রথের সঙ্গে যুক্ত ঘোড়াগুলো নিহত হয় এবং বৃক নিজেও নিহত হন।

এসময় সত্যজিৎ আরেকটি ধনুক উঠিয়ে দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে বারবার তার ধনুক কাটা পড়তে থাকে, কিন্তু তিনি নতুন ধনুক নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে সত্যজিৎ নিহত হন। দ্রোণাচার্যের হাতে সত্যজিৎ নিহত হওয়ার পরপরই ইতিপূর্বে অর্জুন কর্তৃক প্রদত্ত পরামর্শ অনুসারে যুধিষ্ঠির সেখান থেকে পশ্চাৎপসরণ করেন। যুধিষ্ঠিরের পশ্চাৎপসরণের পর দ্রোণাচার্য যাতে তার পশ্চাদ্ধাবন করতে না পারেন, সেজন্য পাঞ্চাল, কৈকেয়া, মৎস্য, চেদি, করুষ ও কোশল রাজ্যের সৈন্যরা একযোগে দ্রোণাচার্যের ওপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু দ্রোণাচার্যের তীরে বহুসংখ্যক পাণ্ডব সৈন্য নিহত হয়।

চিত্রকর্মে কৌরব বাহিনীর প্রধান সেনাপতি দ্রোণাচার্য; Source: Ramanarayanadatta Shastri/Wikimedia Commons

এমতাবস্থায় শতানীকের (মৎস্য রাজ্যের রাজা বিরাটের ভাই) নেতৃত্বে মৎস্য রাজ্যের সৈন্যরা দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়, কিন্তু দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে শতানীক নিহত হন এবং এটি দেখে মৎস্য রাজ্যের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পশ্চাৎপসরণ করতে শুরু করে। এরপর দ্রোণাচার্য বাকি পাণ্ডব সৈন্যদের ওপর আক্রমণ চালান এবং তাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেন। এসময় যুধিষ্ঠির সেদিকে ফিরে আসেন এবং তার নেতৃত্বে শীর্ষ পাণ্ডব যোদ্ধারা একযোগে দ্রোণাচার্যের দিকে অগ্রসর হন। যুধিষ্ঠির, সাত্যকি, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, যুধমন্যু, উত্তমৌজ, ক্ষত্রদেব, চেকিতন, ক্ষত্রধর্ম, বসুদেব ও অন্যান্য শীর্ষ পাণ্ডব যোদ্ধা একযোগে দ্রোণাচার্যের ওপর তীরবর্ষণ করতে থাকেন।

দ্রোণাচার্য তাদের ওপর পাল্টা তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং তার তীরের আঘাতে দৃধাসেন, রাজা ক্ষেম, বসুদেব ও ক্ষত্রদেব নিহত হন। একই সময়ে দ্রোণাচার্যের তীরে সাত্যকি, শিখণ্ডী, যুধমন্যু, উত্তমৌজ, ক্ষেমবর্মা ও সুদক্ষিণ বিদ্ধ হন। এরপর দ্রোণাচার্য ক্ষিপ্রগতিতে যুধিষ্ঠিরের দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু যুধিষ্ঠির দ্রুত সেখান থেকে পশ্চাৎপসরণ করেন। এসময় রাজপুত্র পাঞ্চাল দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হন, কিন্তু দ্রোণাচার্যের তীরের আঘাতে পাঞ্চালের রথের সারথি ও রথের সঙ্গে যুক্ত ঘোড়াগুলো নিহত হয় এবং পাঞ্চাল নিজেও নিহত হন।

দ্রোণাচার্যের হাতে পাঞ্চাল নিহত হওয়ার পর পাণ্ডব সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে দ্রোণাচার্যকে আক্রমণ করে এবং কৌরব সৈন্যরা তাকে সহায়তা করার জন্য অগ্রসর হয়। এসময় দ্রোণাচার্যের তীরে বিপুল সংখ্যক পাণ্ডব সৈন্য নিহত হয়। এরপর দ্রোণাচার্যের নিকট সাত্যকি, চেকিতনের ছেলে, সেনাবিন্দু, সুবর্চা এবং পাণ্ডব বাহিনীর বহুসংখ্যক শীর্ষ রথী পরাজিত হন। দ্রোণাচার্যের নেতৃত্বে কৌরব সৈন্যরা পাণ্ডব বাহিনীর প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে এবং পাণ্ডব সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পশ্চাৎপসরণ করতে শুরু করে।

পাণ্ডব বাহিনীর দুরবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দুর্যোধন আনন্দিত হন এবং কর্ণের কাছে মন্তব্য করেন যে, পাণ্ডব সৈন্যরা যেভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে, তারা আর কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হবে না। কিন্তু কর্ণ দুর্যোধনকে এই বলে সতর্ক করে দেন যে, পাণ্ডবরা প্রতিশোধের জন্য যুদ্ধ করছে এবং তারা এত সহজে যুদ্ধ বন্ধ করবে না। তিনি যোগ করেন যে, সমগ্র পাণ্ডব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা দ্রোণাচার্যের জন্য কঠিন এবং এজন্য তাদের উচিত দ্রোণাচার্যকে সহায়তা করা, নয়ত পাণ্ডবরা একযোগে আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করে ফেলতে পারে। কর্ণের বক্তব্য শুনে দুর্যোধন তার ভাইদের সঙ্গে নিয়ে দ্রোণাচার্যকে সহায়তা করার জন্য অগ্রসর হন।

ইতোমধ্যে পাণ্ডব বাহিনীর শীর্ষ যোদ্ধারা তাদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া সৈন্যদের পুনরায় সংগঠিত করতে সক্ষম হন এবং কৌরব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হন। কৌরব ও পাণ্ডব বাহিনীর শীর্ষ যোদ্ধারা একে অপরের বিরুদ্ধে দ্বৈরথ যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং এর ফলে এসময় বহুসংখ্যক দ্বৈরথ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসময় ভীমরথের (দুর্যোধনের ভাই) হাতে পাণ্ডব রথী শাল্ব নিহত হন এবং ভুরিশ্রবার হাতে পাণ্ডব রথী মণিমাৎ নিহত হন। অন্যদিকে, শতানীকের (নকুল ও দ্রৌপদীর ছেলে) হাতে কৌরব রথী ভূতকর্মা নিহত হন। কিন্তু অবশিষ্ট দ্বৈরথগুলোর ফলাফল মহাভারতে উল্লেখ করা হয়নি।

চিত্রকর্মে ভীম ও দুর্যোধনের মধ্যেকার দ্বৈরথ যুদ্ধ; Source: Ramanarayanadatta Shastri/Wikimedia Commons

এসময় ভীম কৌরবদের হস্তীবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন এবং তার তীরে কৌরবদের বহুসংখ্যক হাতি নিহত হয়। এমতাবস্থায় দুর্যোধন অগ্রসর হয়ে ভীমের বিরুদ্ধে দ্বৈরথ যুদ্ধে লিপ্ত হন। একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর ভীমের তীরের আঘাতে দুর্যোধনের ধনুক ও রথের ঝাণ্ডা কাটা পড়ে। এটি দেখে অঙ্গ রাজ্যের রাজা একটি হাতিতে চড়ে দুর্যোধনকে সহায়তা করার জন্য ভীমের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। উল্লেখ্য, কর্ণও ‘অঙ্গরাজ’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন কুরু রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অঙ্গপ্রদেশের রাজা। এসময় অঙ্গ অঞ্চলটি বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত ছিল এবং এরকম একটি খণ্ড কুরু রাজ্যের অধীনস্থ ছিল। কর্ণ ছিলেন উক্ত অঙ্গ রাজ্যের রাজা। আর এখানে বর্ণিত অঙ্গের রাজা ছিলেন অঙ্গের অন্য একটি খণ্ডের রাজা।

অঙ্গের রাজাকে অগ্রসর হতে দেখে ভীম তাকে আক্রমণ করেন এবং ভীমের তীরের আঘাতে অঙ্গের রাজাকে বহনকারী হাতিটি নিহত হয়। নিহত হাতিটি মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় অঙ্গের রাজাও পড়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি মাটিতে পড়ার আগেই ভীম ক্ষিপ্রগতিতে তীর চালিয়ে তাকেও হত্যা করেন। ভীমের হাতে অঙ্গের রাজা নিহত হওয়ার পর অঙ্গের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং পশ্চাৎপসরণ করতে শুরু করে।

ভগদত্তের নিকট ভীম, সাত্যকি ও অভিমন্যুর পরাজয়

ভীমের নিকট অঙ্গের সৈন্যদের পরাজয়ের পর প্রাগজ্যোতিষের রাজা ভগদত্ত তার অতিকায় হাতিতে চড়ে ক্ষিপ্রগতিতে ভীমের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। উক্ত হাতিটির পায়ের নিচে চাপা পড়ে ভীমের রথ পিষ্ট হয় এবং ভীম লাফিয়ে রথ থেকে নেমে আত্মরক্ষা করেন। এরপর তিনি দ্রুত ভগদত্তের হাতিটির শরীরের নিচের অংশে আঘাত করতে শুরু করেন। কিন্তু হাতিটি ভীমকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে এবং ভীমকে পিষ্ট করার প্রচেষ্টা চালায়। ভীম কোনোক্রমে নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হন এবং ক্ষিপ্রগতিতে সেখান থেকে পশ্চাৎপসরণ করেন। এভাবে ভগদত্তের নিকট ভীম পরাজিত হন এবং পাণ্ডব সৈন্যরা ধারণা করতে থাকে যে, ভীম যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

ভগদত্তের নিকট ভীমের পরাজয়ের পর যুধিষ্ঠিরের নেতৃত্বে পাঞ্চালের সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে ভগদত্তকে ঘিরে ফেলে এবং যুধিষ্ঠির ভগদত্তের ওপর তীরবর্ষণ করেন, কিন্তু ভগদত্ত উক্ত তীরবৃষ্টি প্রতিহত করেন এবং তার তীরে ও তার হাতির পায়ের নিচে চাপা পড়ে বহুসংখ্যক পাণ্ডব সৈন্য নিহত হয়। এমতাবস্থায় দশর্নার রাজা একটি হাতিতে চড়ে ভগদত্তের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। দশর্নার রাজার হাতিটি ভগদত্তের হাতিটিকে আক্রমণ করে, কিন্তু ভগদত্তের হাতিটি ঐ হাতিটিকে হত্যা করে। এসময় দশর্নার রাজা তার হাতি থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ভগদত্ত কর্তৃক নিক্ষিপ্ত ৭টি বর্শার আঘাতে তিনি নিহত হন।

ভগদত্তের হাতে দশর্নার রাজা পরাজিত ও নিহত হওয়ার পর যুধিষ্ঠিরের নেতৃত্বে শীর্ষ পাণ্ডব যোদ্ধারা ভগদত্তের ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, কিন্তু সেটি অগ্রাহ্য করে ভগদত্ত তার হাতিটিকে ক্ষিপ্রগতিতে সাত্যকির রথের দিকে পরিচালিত করেন। তার হাতি সাত্যকির রথটিকে শূঁড়ের সাহায্যে পেঁচিয়ে ধরে সেটিকে বহু দূরে নিক্ষেপ করে এবং রথটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অবশ্য সাত্যকি ভগদত্তের হাতি তার রথটিকে আক্রমণ করার আগেই কোনোক্রমে রথ থেকে লাফিয়ে নেমে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হন এবং ক্ষিপ্রগতিতে সেখান থেকে পশ্চাৎপসরণ করেন। এভাবে ভগদত্তের নিকট সাত্যকির পরাজয় ঘটে।

ভার‍তের কর্ণাটক প্রদেশের বেলুর শহরে অবস্থিত একটি মন্দিরের গায়ে খোদিত ভীম ও ভগদত্তের যুদ্ধের দৃশ্য; Source: Bhoomi/Wikimedia Commons

সাত্যকিকে পরাজিত করার পর ভগদত্ত তাকে ঘিরে পাণ্ডব রথীরা যে বেষ্টনীর সৃষ্টি করেছিলেন সেটি ভেঙে বেরিয়ে আসেন এবং তার তীরে ও তার হাতির পায়ের নিচে চাপা পড়ে বিপুল সংখ্যক পাণ্ডব সৈন্য নিহত হয়। এমতাবস্থায় ভীম একটি রথে চড়ে আবার ভগদত্তের দিকে অগ্রসর হন এবং ভগদত্ত তার হাতিতে চড়ে ভীমের দিকে ছুটে যান। ভগদত্তের অতিকায় হাতিটিকে দেখে ভীমের রথের সঙ্গে যুক্ত ঘোড়াগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং রথটির সারথি ঘোড়াগুলোর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নিয়ন্ত্রণহীন ঘোড়াগুলো ভীমের রথটিকে টেনে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ, অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয় বারের মতো ভীম ভগদত্তের নিকট পরাজিত হন।

ভগদত্তের নিকট ভীমের পরাজয়ের পর পাণ্ডব রথী রুচিপর্ব ভগদত্তের দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু ভগদত্তের তীরের আঘাতে তিনি নিহত হন। ভগদত্তের হাতে রুচিপর্ব নিহত হওয়ার পর অভিমন্যু, উপপাণ্ডবগণ, চেকিতন, দৃষ্টকেতু ও যুযুৎসু একযোগে ভগদত্তকে আক্রমণ করেন এবং তার ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। ভগদত্ত তার হাতিটিকে যুযুৎসুর রথের দিকে পরিচালিত করেন এবং তার হাতির পায়ের নিচে চাপা পড়ে যুযুৎসুর রথের সঙ্গে যুক্ত ঘোড়াগুলো ও রথের সারথি নিহত হয়। অবশ্য যুযুৎসু ক্ষিপ্রগতিতে তার রথ থেকে লাফিয়ে নেমে আত্মরক্ষা করেন এবং আরেকটি রথে আরোহণ করেন। অভিমন্যু, উপপাণ্ডবগণ, দৃষ্টকেতু ও যুযুৎসু ভগদত্ত ও তার হাতির ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ অব্যাহত রাখেন, কিন্তু হাতিটি তার শূঁড়ের সাহায্যে তাদের রথগুলোকে পেঁচিয়ে ধরে সেগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এরপর ভগদত্তের তীরে ও তার হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে পাণ্ডব বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিহত হয় এবং পাণ্ডব সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পশ্চাৎপসরণ করতে শুরু করে।

এসময় অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রের দক্ষিণ কোণে সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। ভগদত্ত পাণ্ডব বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করছেন, এটি দেখতে পেয়ে অর্জুন ভগদত্তের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু এসময় ১০ হাজার সংশপ্তক যোদ্ধা অর্জুনকে ডেকে যুদ্ধের আহ্বান জানায়। এর ফলে অর্জুন দোটানায় পড়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত আগে সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আকস্মিকভাবে রথ ঘুরিয়ে সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। সংশপ্তকরা অর্জুনের ওপর বিপুল সংখ্যক তীর নিক্ষেপ করে এবং তাদের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে অর্জুনের রথের সারথি কৃষ্ণ আহত হন। এটি দেখে অর্জুন ক্রোধান্বিত হন এবং মন্ত্র উচ্চারণ করে সংশপ্তকদের বিরুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেন। অর্জুন কর্তৃক ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের ফলে তাকে যুদ্ধে আহ্বানকারী ১০ হাজার সংশপ্তক যোদ্ধার প্রায় সকলেই নিহত হয়। এভাবে সংশপ্তকদের পরাজিত করার পর অর্জুন ভগদত্তের দিকে অগ্রসর হন।

কিন্তু এসময় সুশর্মা ও তার ভাইয়েরা অর্জুনকে ডেকে যুদ্ধের আহ্বান জানান। অর্জুন আবার দোটানায় পড়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত আগে সুশর্মা ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আবারো রথ ঘুরিয়ে সুশর্মা ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। অর্জুনের তীরের আঘাতে সুশর্মা বিদ্ধ হন এবং তার ধনুক ও রথের ঝাণ্ডা কাটা পড়ে। এরপর অর্জুনের তীরের আঘাতে সুশর্মার ভাইয়েরা নিহত হন। সুশর্মা অর্জুনের দিকে একটি বিশেষ ধরনের তীর এবং কৃষ্ণের দিকে একটি বর্শা নিক্ষেপ করেন, কিন্তু অর্জুনের তীরের আঘাতে সেগুলো কাটা পড়ে। এরপর অর্জুনের তীরের আঘাতে সুশর্মা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এভাবে সুশর্মা ও তার ভাইদের পরাজিত করার পর অর্জুন ভগদত্তের দিকে অগ্রসর হন।

অর্জুন–ভগদত্ত যুদ্ধ: কৃষ্ণের হস্তক্ষেপ এবং ভগদত্তের পতন

কৌরব সৈন্যদের ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করতে করতে অর্জুন ভগদত্তের দিকে অগ্রসর হন এবং তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ভগদত্ত অর্জুনের ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, কিন্তু অর্জুন তীরের সাহায্যে উক্ত তীরবৃষ্টি প্রতিহত করেন। এরপর ভগদত্ত অর্জুনের ওপর আরো তীব্র তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং তার তীরের আঘাতে অর্জুন ও কৃষ্ণ উভয়েই বিদ্ধ হন। ভগদত্ত তার হাতিটিকে অর্জুনের রথের দিকে পরিচালিত করেন, কিন্তু কৃষ্ণ ক্ষিপ্রগতিতে রথটিকে সরিয়ে নেন এবং এর ফলে হাতিটি অর্জুনকে আক্রমণ করার সুযোগ পায়নি। কৃষ্ণ অর্জুনের রথটিকে এমনভাবে সরিয়েছিলেন যে, সেটি ভগদত্তের ছুটন্ত হাতির পিছনে অবস্থান করছিল। সেসময় অর্জুন চাইলে পিছন থেকে আক্রমণ চালিয়ে ভগদত্ত ও তার হাতিটিকে হত্যা করতে পারতেন, কিন্তু সেটি হতো যুদ্ধের নিয়মের লঙ্ঘন। এজন্য অর্জুন এভাবে ভগদত্ত ও তার হাতিটিকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকেন।

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে অবস্থিত কৃষ্ণ ও অর্জুনের ভাস্কর্য; Source: Wikimedia Commons

এদিকে ভগদত্তের হাতিটি অর্জুনের রথটিকে আক্রমণ করতে না পেরে সামনে থাকা অন্যান্য পাণ্ডব সৈন্যদের আক্রমণ করে এবং সেটির হাতে পাণ্ডব বাহিনীর বহুসংখ্যক হাতি ও ঘোড়া নিহত এবং রথ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এরপর ভগদত্ত হাতিটিকে ঘুরিয়ে আবার অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি অর্জুন ও কৃষ্ণের ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং তার নিক্ষিপ্ত তীর কৃষ্ণের শরীরে ভেদ করে মাটিতে গেঁথে যায়। এরপর অর্জুনের তীরের আঘাতে ভগদত্তের ধনুক কাটা পড়ে এবং তার হাতিটির সুরক্ষা প্রদানকারী যোদ্ধা নিহত হয়। ভগদত্ত অর্জুনের দিকে ১৪টি বর্শা নিক্ষেপ করেন, কিন্তু অর্জুনের তীরের আঘাতে সেগুলো কাটা পড়ে। এরপর অর্জুনের তীরের আঘাতে ভগদত্তের হাতিটির বর্ম কাটা পড়ে এবং অর্জুনের তীরে হাতিটি আহত হয়। ভগদত্ত কৃষ্ণের দিকে একটি বিশেষ ধরনের তীর নিক্ষেপ করেন, কিন্তু অর্জুনের তীরের আঘাতে সেটি কাটা পড়ে। এরপর অর্জুনের তীরের আঘাতে ভগদত্তের হাতিটির ওপরে থাকা ঝাণ্ডা কাটা পড়ে এবং ভগদত্ত নিজেও বিদ্ধ হন। ভগদত্ত অর্জুনের দিকে কয়েকটি বর্শা নিক্ষেপ করেন এবং সেগুলোর আঘাতে অর্জুনের মাথার মুকুট নিচে পড়ে যায়।

অর্জুন মুকুটটি তুলে নিজের মাথায় পরিধান করেন এবং ভগদত্তের উদ্দেশ্যে হুমকির স্বরে বলে ওঠেন যে, “ভালো করে পৃথিবীটাকে দেখে নিন!” (অর্থাৎ, অর্জুন ইঙ্গিত করেন যে, ভগদত্তের সময় শেষ হয়ে এসেছে) অর্জুনের বক্তব্য শুনে ভগদত্ত ক্রোধান্বিত হন এবং একটি ধনুক উঠিয়ে অর্জুন ও কৃষ্ণের ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকেন। কিন্তু শীঘ্রই অর্জুনের তীরের আঘাতে ভগদত্তের ধনুক ও তূণীরগুলো কাটা পড়ে এবং ভগদত্ত নিজেও তীরবিদ্ধ হন। এরপর ক্ষিপ্ত ভগদত্ত মন্ত্র উচ্চারণ করে অর্জুনের বিরুদ্ধে বৈষ্ণবাস্ত্র প্রয়োগ করেন। ভগদত্তের বাবা নরকাসুর দেবতা বিষ্ণুর কাছ থেকে এই অস্ত্রটি পেয়েছিলেন এবং এটির সাহায্যে এমনকি দেবতাদেরকেও হত্যা করা সম্ভব ছিল। এমতাবস্থায় ভগদত্তের এই দিব্যাস্ত্রটিকে অর্জুনের দিকে ছুটে আসতে দেখে কৃষ্ণ সারথির আসন থেকে উঠে দাঁড়ান এবং অস্ত্রটি একটি মালায় রূপান্তরিত হয়ে কৃষ্ণের গলায় পতিত হয়। এর মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন।

এরপর অর্জুন ভগদত্তের হাতির দিকে একটি বিশেষ ধরনের তীর নিক্ষেপ করেন এবং সেটির আঘাতে উক্ত হাতিটি নিহত হয়। এসময় ভগদত্ত ক্ষিপ্রগতিতে আরেকটি ধনুক তুলে নিয়েছিলেন, কিন্তু অর্জুনের তীরের আঘাতে তিনি নিহত হন এবং তার হাতিটির পিঠ থেকে নিচে পড়ে যান। এভাবে অর্জুনের হাতে ভগদত্ত নিহত হন। ভগদত্তের মৃত্যুর পর অর্জুন তার মৃতদেহটির চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করেন এবং এর মধ্য দিয়ে ভগদত্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

ভীষ্মের পতনের পর ভগদত্তের মৃত্যু ছিল কৌরবদের জন্য একটি বড় ধরনের ক্ষতি এবং পাণ্ডবদের জন্য একটি বড় ধরনের বিজয়। অর্জুনের জন্য এটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের কৃতিত্ব, কারণ অর্জুন ব্যতীত পাণ্ডব বাহিনীর সকল শীর্ষ যোদ্ধাই (যাদের মধ্যে ছিলেন ভীম, সাত্যকি, অভিমন্যু এবং ঘটোৎকচ) ভগদত্তের নিকট পরাজিত হয়েছিলেন। অর্জুন ও ভগদত্তের মধ্যেকার যুদ্ধের পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, অর্জুন ভগদত্তের চেয়ে অধিকতর দক্ষ ধনুর্ধর ছিলেন।

চিত্রকর্মে অর্জুনের হাতে ভগদত্তের মৃত্যুর দৃশ্য; Source: Ramanarayanadatta Shastri/Wikimedia Commons

কিন্তু ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্জুনের রথ, রথের সঙ্গে যুক্ত ঘোড়াগুলো, তার ধনুক ও মুকুট সবই ছিল দেবতাদের দেয়া এবং সেগুলোকে ধ্বংস করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তদুপরি, অর্জুনের রথের সারথি ছিলেন কৃষ্ণ এবং অর্জুন ও ভগদত্তের মধ্যে যুদ্ধ চলাকালে তিনি দুইবার অর্জুনের প্রাণ রক্ষা করেন (প্রথমবার ভগদত্তের হাতিটির পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়া থেকে অর্জুনকে রক্ষা করে এবং দ্বিতীয়বার ভগদত্তের বৈষ্ণবাস্ত্র থেকে অর্জুনকে রক্ষা করে)। অর্জুন অত্যন্ত দক্ষ ধনুর্ধর ছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণ তার সারথি হিসেবে না থাকলে হয় তাকে ভগদত্তের হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হতে হতো, নয়ত তিনি ভগদত্তের বৈষ্ণবাস্ত্রের আঘাতে নিহত হতেন। কৃষ্ণ অর্জুনকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন এবং অর্জুন ভগদত্তের বিরুদ্ধে বিজয়ী হন। সুতরাং অর্জুনের এই বিজয়ের মূল কৃতিত্ব ছিল কৃষ্ণের।

অবশ্য এক্ষেত্রে অর্জুনও একইসঙ্গে তার চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ভগদত্তকে পিছন থেকে আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেটি থেকে বিরত থেকে যুদ্ধের নিয়ম পালন করেছেন এবং এভাবে এক অতি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাড় দিয়েছেন। একইভাবে ভগদত্ত নিহত হওয়ার পর তিনি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। এটি অর্জুনের চরিত্রের মহৎ দিকগুলোকেই ফুটিয়ে তুলেছে।

Related Articles