Welcome to Roar Media's archive of content published from 2014 to 2023. As of 2024, Roar Media has ceased editorial operations and will no longer publish new content on this website.
The company has transitioned to a content production studio, offering creative solutions for brands and agencies.
To learn more about this transition, read our latest announcement here. To visit the new Roar Media website, click here.

ইউক্রেনের ঘটনাবলি সংক্রান্ত ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষণ | পর্ব–৩

২০২২ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয় সীমান্তে রুশ সৈন্য সমাবেশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী দনেৎস্ক ও গণপ্রজাতন্ত্রী লুগানস্কের সীমান্তে ইউক্রেনীয় সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে একদিকে রাশিয়া, দনেৎস্ক ও লুগানস্ক এবং অন্যদিকে ইউক্রেন ও ন্যাটোর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন দনেৎস্ক ও লুগানস্কের বিরুদ্ধে একটি আক্রমণাভিযান শুরু করে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যেকার উত্তেজনার মাত্রা তীব্রতর হয়ে ওঠে। ২১ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া দনেৎস্ক ও লুগানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান এবং রাষ্ট্রদ্বয়ের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি’ সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন রুশ জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি ভাষণে এই ঘোষণা প্রদান করেন এবং ইউক্রেনে চলমান ঘটনাবলি সম্পর্কে সবিস্তারে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন।

উক্ত ভাষণটিতে ইউক্রেনীয় সঙ্কট, রুশ–ইউক্রেনীয় সম্পর্ক এবং ইউক্রেনীয় সঙ্কটে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা সম্পর্কে পুতিনের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্ফুটিত হয়েছে। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলমান নতুন স্নায়ুযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গরূপে অনুধাবন করার জন্য পুতিনের এই ভাষণটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। এই নিবন্ধে উক্ত ভাষণটির অনুবাদ করা হয়েছে এবং ভাষণটির বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ও মতামত প্রদান করা হয়েছে। নিচের ইটালিক অক্ষরে প্রদত্ত অংশগুলো পুতিনের প্রদত্ত ভাষণের অংশ এবং তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে আবদ্ধ বিবরণগুলো উক্ত ভাষণ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা/মতামত।

ভাষণ

[২য় পর্বের পর]

এটি লক্ষ করা উচিত যে, ইউক্রেনের প্রকৃতপক্ষে কখনোই প্রকৃত রাষ্ট্রীয়তার স্থিতিশীল ঐতিহ্য ছিল না। আর এজন্য ১৯৯১ সালে এটি কোনো চিন্তাভাবনা ব্যতিরেকে এমন সব বিদেশি রূপরেখার অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যেগুলোর সঙ্গে ইতিহাসের বা ইউক্রেনীয় বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহুবার ক্ষিপ্রগতিতে বিস্তারমান স্বার্থভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো এবং তাদের নিজস্ব স্বার্থের প্রয়োজনে পুনর্গঠিত করা হয়, যেগুলোর সঙ্গে ইউক্রেনীয় জনগণের স্বার্থের কোনো সংশ্রব ছিল না।

বস্তুত জনগণের কল্যাণের স্বার্থে উন্নততর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা গোষ্ঠীস্বার্থভিত্তিক ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথাকথিত পশ্চিমা সভ্যতামুখী সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল না এবং এখনো নয়। বরং এটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, ধনকুবেররা ইউক্রেনীয়দের কাছ থেকে যে শত শত কোটি ডলার চুরি করেছে ও পশ্চিমা ব্যাঙ্কগুলোয় তাদের অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছে সেগুলোকে রক্ষা করা এবং একইসঙ্গে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমন্বয় করা।

ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক পতাকা। এটি ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক; Source: Zscout370/Wikimedia Commons

[ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষ্যমতে, ইউক্রেন কখনোই একটি ‘প্রকৃত’ ও ‘স্থিতিশীল’ রাষ্ট্র ছিল না। এখানে ‘প্রকৃত’ ও ‘স্থিতিশীল’ শব্দ দুইটি লক্ষণীয়। পুতিন কিন্তু এটা বলেননি যে, ইউক্রেনে কখনোই কোনো ‘রাষ্ট্রীয়তা’ (statehood) ছিল না। বরং পুতিনের বক্তব্যের তাৎপর্য হচ্ছে, ইউক্রেনের ভূখণ্ডে অতীতে রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল ‘কৃত্রিম’ এবং ‘অস্থিতিশীল’। ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের ও পশ্চিমা বিশ্বের বক্তব্য অনুসারে, পুতিনের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাদের মতে, পুতিন ইতিহাস বিকৃত করছেন এবং এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। পুতিনের এই বক্তব্যের মধ্যে তারা রুশ সাম্রাজ্যবাদের নিদর্শন দেখতে পান।

তাদের দৃষ্টিকোণটি যে পুরোপুরি ভুল, এমন নয়। পুতিন এবং রুশ নীতিনির্ধারকরা প্রকৃতপক্ষেই ইউক্রেনকে পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বা পশ্চিমা প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে আগ্রহী নন। পুরোপুরি স্বাধীন বা পশ্চিমা বলয়ভুক্ত ইউক্রেনকে তারা রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। পুতিন এটি বহুবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত, কিন্তু সেক্ষেত্রে ইউক্রেন রুশবিরোধী কোনো সামরিক জোটের অংশ হতে পারবে না কিংবা রাশিয়ার জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকির সৃষ্টি করতে পারবে না। বলাই বাহুল্য, ইউক্রেন পুরোপুরিভাবে রুশ প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হলে রুশ নীতিনির্ধারকরা ও জাতীয়তাবাদীরা খুশি হবে, কিন্তু এটি তাদের জন্য আবশ্যক নয়। একটি স্বাধীন জোট–নিরপেক্ষ ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রও তাদের স্বার্থের জন্য অনুকূল।

অবশ্য ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, পুতিনের বক্তব্যকে ঢালাওভাবে ‘মিথ্যা’ বা ‘ইতিহাস বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় না। বিংশ শতাব্দীর আগে প্রকৃতপক্ষেই বর্তমান ইউক্রেনের ভূখণ্ডে জাতিগত ইউক্রেনীয়দের জন্য কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে ইউক্রেনের কিয়েভ শহরকে কেন্দ্র করে স্বাধীন রুশ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল, কিন্তু সেটি কেবল জাতিগত ইউক্রেনীয়দের রাষ্ট্র ছিল না, বরং বর্তমান রুশ, ইউক্রেনীয় ও বেলারুশীয় জাতিত্রয়ের পূর্বপুরুষরা সেই রাষ্ট্রের অধিবাসী ছিল। কার্যত সেসময় স্বতন্ত্র ইউক্রেনীয় জাতিসত্তারই কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অনুরূপভাবে, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে কসাকরা (একটি স্লাভিক সামরিক–কৃষি সম্প্রদায়) কতিপয় রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলেছিল, কিন্তু সেগুলো কখনো পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না এবং উক্ত রাষ্ট্রকাঠামোগুলোর প্রতিষ্ঠা ইউক্রেনীয় জাতীয়তার নামে হয়নি।

বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে বেশ কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এগুলোর মধ্যে ছিল: ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র (১৯১৭–১৯২০), ইউক্রেনীয় রাষ্ট্র (১৯১৮), পশ্চিম ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র (১৯১৮–১৯১৯), ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (১৯১৯–১৯২২) এবং ইউক্রেন (১৯৯১–বর্তমান)। সুতরাং, ইউক্রেনের ভূখণ্ডে অতীতে জাতিগত ইউক্রেনীয়দের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, পুতিন যেমনটা বলেছেন, এই রাষ্ট্রগুলো ছিল কৃত্রিম ও অস্থিতিশীল।

১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কেন্দ্রীয় শক্তি ও ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্রের মধ্যে ব্রেস্ত–লিতোভস্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র কার্যত জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়; Source: Wikimedia Commons

১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র বলশেভিক–নিয়ন্ত্রিত রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং এর পরপরই ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায়। ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ও ইউক্রেনীয় বলশেভিকরা কিয়েভ দখল করে নেয়। এমতাবস্থায় ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে ‘ব্রেস্ত–লিতোভস্ক চুক্তি’তে স্বাক্ষর করে এবং ফলশ্রুতিতে এটি কার্যত জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির একটি আশ্রিত রাষ্ট্রে (protectorate) পরিণত হয়। ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারি–মার্চে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি বলশেভিক–নিয়ন্ত্রিত রাশিয়াকে যুদ্ধে পরাজিত করে ইউক্রেন দখল করে নেয় এবং এপ্রিলে কেন্দ্রীয় শক্তি কর্তৃক সমর্থিত একটি অভ্যুত্থানের ফলে ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্রের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। কেন্দ্রীয় শক্তির দখলদারিত্বে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ‘ইউক্রেনীয় রাষ্ট্র’ নামক একটি ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, যেটি ছিল প্রকৃতপক্ষে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির একটি আশ্রিত রাষ্ট্র।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয়ের পর কেন্দ্রীয় শক্তি–নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনীয় রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয় এবং ১৯১৮ সালের নভেম্বর–ডিসেম্বরে ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত রাশিয়া ও ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্রের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯১৯ সাল নাগাদ ইউক্রেনীয় বলশেভিকরা ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ‘ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ নামক একটি স্বাধীন (কিন্তু কার্যত সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত) সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করে। এদিকে অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির পতনের ফলে বর্তমান ইউক্রেনের পশ্চিমাংশে ‘পশ্চিম ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় এবং ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রটি ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্রের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। কিন্তু শীঘ্রই ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র সোভিয়েত রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউক্রেনের নিকট পর্যুদস্ত হয় এবং এমতাবস্থায় রাষ্ট্রটি পোল্যান্ডের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়।

এসময় ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র কার্যত পোল্যান্ডের একটি আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং পোলিশ–সোভিয়েত যুদ্ধের পর ইউক্রেনের ভূখণ্ডের বৃহদাংশ সোভিয়েত ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউক্রেন সোভিয়েত ইউনিয়নে যোগদান করে। ইউক্রেনের ভূখণ্ডের অবশিষ্টাংশ পোল্যান্ড, রুমানিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯২০ সালে পোলিশ সৈন্যদের কিয়েভে প্রবেশ। পোলিশ–সোভিয়েত যুদ্ধের সময় ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র কার্যত পোল্যান্ডের আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়; Source: Wikimedia Commons

ইউক্রেনের ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে এটি স্পষ্ট যে, অতীতে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে আসলেই কোনো ‘প্রকৃত’ ও ‘স্থিতিশীল’ রাষ্ট্র ছিল না। ১৯১৮ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত সময়ে (যে সময়ে ইউক্রেনে বেশ কয়েকটি ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল) ইউক্রেনের ভূখণ্ড ছিল চরমভাবে অস্থিতিশীল এবং বৈদেশিক আক্রমণ, গৃহযুদ্ধ, বিপ্লব, অভ্যুত্থান ও অন্যান্য নানা ধরনের সহিংসতায় জর্জরিত। ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র প্রথমে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির এবং পরবর্তীতে পোল্যান্ডের আশ্রিত রাষ্ট্র ছিল, এবং অবশেষে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইউক্রেনীয় রাষ্ট্র জার্মানি ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির আশ্রিত রাষ্ট্র ছিল এবং কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। পশ্চিম ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্রের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয় এবং পরবর্তীতে পোল্যান্ড, রুমানিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়ার মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ছিল প্রকৃতপক্ষে বলশেভিক রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন এবং সেটিও পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। এমতাবস্থায় “ইউক্রেনের কখনোই প্রকৃত রাষ্ট্রীয়তার স্থিতিশীল ঐতিহ্য ছিল না” – পুতিনের এই বক্তব্যটি যতটাই অপ্রীতিকর হোক না কেন, এটি ঐতিহাসিক বাস্তবতারই প্রতিফলন মাত্র]

একেবারে শুরু থেকেই কিছু শিল্প ও আর্থিক সংগঠন এবং তাদের বেতনভুক্ত দলগুলো ও রাজনীতিবিদরা জাতীয়তাবাদী ও উগ্রপন্থীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অন্যরা রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র‍্যের পক্ষে থাকার দাবি করতো। দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষসহ তাদের যেসব নাগরিক এদের ঘোষিত আকাঙ্ক্ষাকে একনিষ্ঠতার সঙ্গে সমর্থন করতো, তাদের সহায়তায় এরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এই লোকগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত পদ লাভের পর তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটে যায় এবং এর পরিবর্তে উগ্রপন্থীদের পছন্দনীয় নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে ও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের প্রাক্তন মিত্রদের – যেসব গণসংগঠন দ্বিভাষাবাদ ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষে ছিল – ওপরেও জুলুম করতে শুরু করে। এই লোকগুলো এই বাস্তবতার সুযোগ নিয়েছে যে, তাদের ভোটারদের সিংহভাগ ছিল মধ্যপন্থী আইনমান্যকারী নাগরিক, যারা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করতো এবং যারা উগ্রপন্থীদের মতো আক্রমণাত্মক কার্যক্রম চালাতো না বা বেআইনি পন্থা ব্যবহার করতো না।

এদিকে উগ্রপন্থীরা তাদের কার্যকলাপের ক্ষেত্রে ক্রমশ নির্লজ্জ হয়ে উঠতে থাকে এবং প্রতি বছর তাদের দাবির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের জন্য দুর্বল কর্তৃপক্ষের ওপর তাদের মর্জি চাপিয়ে দেয়া সহজ ছিল, যে কর্তৃপক্ষ নিজেরাও জাতীয়তাবাদ ও দুর্নীতির ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল এবং যারা জনগণের প্রকৃত সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থগুলো আর ইউক্রেনের প্রকৃত সার্বভৌমত্বকে নানাবিধ নৃগোষ্ঠীগত জল্পনা–কল্পনা ও আনুষ্ঠানিক নৃগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিল।

ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের একটি র‍্যালিতে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানপন্থী ইউক্রেনীয় সংগঠন ‘ওইউএন’–এর পতাকা ও বিতর্কিত ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা স্তেপান বান্দেরার ছবি বহন করছে; Source: Channel 4

[স্বাধীনতা লাভের পর প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখণ্ডে অবস্থিত অন্যান্য নবগঠিত রাষ্ট্রের মতো ইউক্রেনেও রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করা হয়। এর ফলে ইউক্রেনীয় শিল্প ও আর্থিক ব্যবস্থা কিছুসংখ্যক ধনকুবেরের নিয়ন্ত্রাণাধীনে চলে আসে। একই সময়ে ইউক্রেনে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, কিন্তু শীঘ্রই এই ব্যবস্থাটি উক্ত ধনকুবেরদের নিয়ন্ত্রণাধীনে চলে যায়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দল পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন এবং উক্ত ধনকুবেররা সেই অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেনের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে বেশ কয়েকটি স্বার্থভিত্তিক গোষ্ঠীর (clan) সৃষ্টি হয় এবং ইউক্রেনীয় রাজনৈতিক দলগুলো ইউক্রেনীয় জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে কার্যত উক্ত গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে শুরু করে।

উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনের শীর্ষ ধনকুবের রিনাত আখমেতভ ইতিপূর্বে ইউক্রেনের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের দল ‘পার্তিয়া রেহিওনিভ’–এর (ইউক্রেনীয়: Партія регіонів) অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আরেক ইউক্রেনীয় ধনকুবের ইহোর কোলোময়স্কি ইতিপূর্বে প্রাক্তন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি ভিক্তর ইয়ুশ্চেঙ্কোর নির্বাচনী জোট ‘ব্লক নাশা উক্রায়না–নারোদনা সামুবরোনা’র (ইউক্রেনীয়: Блок Наша Україна–Народна Самооборона) ও প্রাক্তন ইউক্রেনীয় প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেঙ্কোর নেতৃত্বাধীন জোট ‘ব্লক ইউলিই তিমোশেঙ্কো’র (ইউক্রেনীয়: Блок Юлії Тимошенко) অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এবং বর্তমানে তিনি ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি ও তার দল ‘স্লুহা নারোদু’র (ইউক্রেনীয়: Слуга народу) প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রাক্তন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি পেত্রো পোরোশেঙ্কো নিজেই ছিলেন একজন ধনকুবের।

ইউক্রেনীয় ধনকুবেররা যে কেবল ইউক্রেনের রাজনৈতিক দলগুলোরই পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এমন নয়। তারা ইউক্রেনের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও নব্য–নাৎসি সংগঠনগুলোরও শীর্ষ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন। যেমন: ইউক্রেনীয় ধনকুবের কোলোময়স্কি ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী আধা–সামরিক সংগঠন ‘দনিপ্রো–১ রেজিমেন্টে’র স্রষ্টা এবং ‘আইদার’, ‘আজভ’ ও ‘দনবাস’ রেজিমেন্টের মতো নব্য–নাৎসি সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষক। আরেক ইউক্রেনীয় ধনকুবের আরসেন আভাকভ (এককালীন ইউক্রেনীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ইউক্রেনীয় নব্য–নাৎসি সংগঠন ‘আজভ রেজিমেন্টে’র অন্যতম স্রষ্টা এবং তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তার পূর্ণ সমর্থনে ‘আইদার’, ‘দনবাস’, ‘দনিপ্রো’, ‘টর্নেডো’ প্রভৃতি নানাবিধ উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠন সৃষ্টি হয়েছিল। এই সংগঠনগুলোর প্রত্যেকটির বিরুদ্ধে খুন, গুম, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ নানাবিধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে এবং পশ্চিমা মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলোও এই বিষয়ে একমত।

ইউক্রেনীয় ধনকুবের ইহোর কোলোময়স্কি। কোলোময়স্কি ইউক্রেনের নানাবিধ রাজনৈতিক দল ও উগ্র জাতীয়তাবাদী আধা–সামরিক সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন; Source: Konstantin Sazonchik/TASS via The Moscow Times

পুতিনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তিনি কেবল পশ্চিমাপন্থী ইউক্রেনীয় দলগুলোর প্রতিই অসন্তুষ্ট নন, বরং রুশপন্থী হিসেবে পরিচিত ইউক্রেনীয় দলগুলোর প্রতিও তিনি অসন্তুষ্ট। তার বক্তব্য অনুসারে, ‘রুশপন্থী’ হিসেবে পরিচিত ইউক্রেনীয় দলগুলো (যেমন: পার্তিয়া রেহিওনিভ) রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা ও ইউক্রেনের রুশঘেঁষা জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। বস্তুত পুতিনের বক্তব্যে সত্যতা রয়েছে। ইউক্রেনের ইতিহাসে দুইজন রাষ্ট্রপতি (লিওনিদ কুচমা এবং ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ) রুশঘেঁষা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের রুশঘেঁষা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তারা ইউক্রেনকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অঙ্গীভূত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন এবং ইউক্রেনে রুশ প্রভাব সীমিত করার প্রচেষ্টা বজায় রেখেছেন। বস্তুত কুচমার লিখিত একটি বইয়ের শিরোনামই ছিল, ‘ইউক্রেন রাশিয়া নয়’]

ইউক্রেনে কখনোই একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি; সেখানকার নির্বাচনী ও অন্যান্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কেবল বিভিন্ন স্বার্থভিত্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পদের পুনর্বণ্টনের আবরণ হিসেবে, পর্দা হিসেবে কাজ করে। দুর্নীতি, যেটি নিশ্চিতভাবে রাশিয়াসহ অনেক দেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ও একটি সমস্যা, ইউক্রেনে স্বাভাবিক মাত্রার বাইরে চলে গেছে। এটি ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রীয়তা, সম্পূর্ণ ব্যবস্থা ও ক্ষমতার সকল শাখাকে ছেয়ে গেছে এবং ক্ষয় করছে।

উগ্র জাতীয়তাবাদীরা ন্যায়সঙ্গত জনঅসন্তোষের ফায়দা তুলেছে এবং ২০১৪ সালে মাইদান বিক্ষোভকে আচ্ছাদিত করে সেটিকে অভ্যুত্থানের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকেও সরাসরি সহায়তা পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, মার্কিন দূতাবাস কিয়েভের স্বাধীনতা সরণিতে তথাকথিত বিক্ষোভ শিবিরকে সহায়তা করতে প্রতিদিন ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার সরবরাহ করতো। তদুপরি, বিরোধী দলীয় নেতাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি নির্লজ্জভাবে বড় অঙ্কের টাকা, লক্ষ লক্ষ ডলার স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু যেসব মানুষ সত্যিকারের ভুক্তভোগী ছিল, কিয়েভ ও অন্যান্য শহরের রাস্তাগুলোয় ও সরণিগুলোয় সংঘর্ষে নিহতদের পরিবার–পরিজন শেষ পর্যন্ত কত টাকা পেয়েছিল? এই প্রশ্ন না করাই ভালো।

ক্ষমতা দখলের পর জাতীয়তাবাদীরা তাদের বিরুদ্ধে জুলুম, একটি প্রকৃত সন্ত্রাস অভিযান শুরু করে, যারা তাদের অসাংবিধানিক কার্যকলাপের বিরোধিতা করেছিল। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও গণকর্মীদের হয়রানি করা হয় এবং জনসমক্ষে অপদস্থ করা হয়। ইউক্রেনীয় শহরগুলোয় এক সহিংসতার ঢেউ আঘাত হানে, যেগুলোর মধ্যে বেশকিছু বহুল আলোচিত ও শাস্তিবিহীন খুনের ঘটনা ছিল। ওদেসার ভয়ঙ্কর বিয়োগান্তক ঘটনার স্মৃতি মানুষকে কাঁপিয়ে দেয়, যেখানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল, হাউজ অফ ট্রেড ইউনিয়ন্সে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। যে অপরাধীরা এই নৃশংসতা ঘটিয়েছিল তাদেরকে কখনোই শাস্তি দেয়া হয়নি এবং তাদেরকে কেউ খুঁজছেও না। কিন্তু আমরা তাদের নাম জানি এবং তাদেরকে খুঁজে বের করা, শাস্তি দেয়া ও বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আমরা সবকিছু করব।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের কিয়েভে ইউক্রেনীয় বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন জর্জীয় রাষ্ট্রপতি মিখেইল সাকাশভিলির সমর্থকরা তদানীন্তন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি পেত্রো পোরোশেঙ্কোকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে; Source: Volodymyr Petrov/Kyiv Post

[পুতিন ইউক্রেনকে একটি চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। পুতিন অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, দুর্নীতি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা এবং রাশিয়াতেও এই সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তার ভাষ্যমতে, ইউক্রেনে দুর্নীতি স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পুতিনের এই বক্তব্যটিকে বিতর্কিত হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। জার্মানিভিত্তিক বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালে’র ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ইউক্রেন ইউরোপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র, কিন্তু ইউরোপের শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রটি হচ্ছে রাশিয়া। সুতরাং, ইউক্রেনের দুর্নীতির মাত্রা ‘স্বাভাবিকতা অতিক্রম করেছে’ কিনা, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। বস্তুত পুতিন তার ভাষণে ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত করার চেষ্টা করেছেন এবং ইউক্রেনে বিদ্যমান দুর্নীতি সম্পর্কিত বক্তব্যটি তার এই প্রচেষ্টারই অংশবিশেষ।

পুতিনের ভাষ্য অনুসারে, ২০১৪ সালের ইউরোমাইদান বিপ্লব/অভ্যুত্থানের পশ্চাতে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা ছিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উক্ত বিপ্লব/অভ্যুত্থানকে অর্থায়ন করেছিল। পুতিনের এই বক্তব্য সর্বাংশে সত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন খোলাখুলিভাবে উক্ত বিপ্লব/অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিল, মার্কিন রাজনীতিবিদরা সরাসরি কিয়েভে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন, মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর কূটনীতিকরা নিয়মিতভাবে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং তদানীন্তন ইউক্রেনীয় সরকার যেন ইউক্রেনীয় সশস্ত্রবাহিনীকে বিক্ষোভ দমনে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য মার্কিন সরকার ইউক্রেনীয় শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের খোলাখুলিভাবে হুমকি দিয়েছিল। বস্তুত অভ্যুত্থান–পরবর্তী ইউক্রেনীয় সরকারের নেতৃত্বে কারা থাকবে, সেটিও মার্কিন কর্মকর্তারা ঠিক করে দিয়েছিলেন। সুতরাং ২০১৪ সালের বিপ্লব/অভ্যুত্থান ছিল প্রায় সম্পূর্ণরূপে পশ্চিমা–নিয়ন্ত্রিত।

পুতিনের ভাষ্যমতে, ২০১৪ সালের বিপ্লব/অভ্যুত্থানের পর ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা ইউক্রেনীয় জনগণের রুশঘেঁষা অংশের বিরুদ্ধে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমে এই বিষয়টিকে তুলে ধরা হয় না বললেই চলে, কিন্তু বাস্তবে এরকম বহু সংখ্যক ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালের ১৮ জুন রুশপন্থী ইউক্রেনীয় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী সের্গেই দোলগভ মারিউপোলে নিখোঁজ হন। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীরা কিয়েভে রুশপন্থী ইউক্রেনীয় সাংবাদিক সের্গেই সুখোবোককে খুন করে। ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীরা কিয়েভে রুশপন্থী ইউক্রেনীয় রাজনীতিবিদ ও প্রাক্তন আইনপ্রণেতা ওলেগ কালাশনিকভকে খুন করে। ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল রুশপন্থী ইউক্রেনীয় সাংবাদিক ও লেখক ওলেস বুজিনা কিয়েভে ইউক্রেনীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হাতে খুন হন।

ওদেসা হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে ফুল অর্পণের দৃশ্য; Source: Genya Savilov/AFP/Getty Images via The Daily Beast

পুতিন তার ভাষণে ওদেসায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। ২০১৪ সালের ২ মে ইউক্রেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ওদেসায় ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা মাইদানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং ওদেসার হাউজ অফ ট্রেড ইউনিয়ন্সে অগ্নিসংযোগ করে। এর ফলে অন্তত ৪৬ জন রুশপন্থী বিক্ষোভকারী নিহত হয়। ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করেছিল এবং ইউক্রেনীয় সরকার এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য কোনো সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, বরং উল্টো এটিকে রুশদের দ্বারা পরিচালিত একটি ‘উস্কানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে]

মাইদান ইউক্রেনকে গণতন্ত্র ও উন্নতির কাছাকাছি নিয়ে আসেনি। একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর পর জাতীয়তাবাদীরা ও তাদের সমর্থক রাজনৈতিক শক্তিগুলো ইউক্রেনকে ক্রমশ একটি অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যায়, দেশটিকে গৃহযুদ্ধের অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দেয়। আট বছর পরে এসে দেশটি বিভক্ত। ইউক্রেন একটি সূক্ষ্ম আর্থ–সামাজিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করছে।

আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর মতে, ২০১৯ সালে প্রায় ৬০ লক্ষ ইউক্রেনীয়কে – আমি জোর দিতে চাই, কর্মক্ষম জনশক্তির নয়, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫% – কাজের খোঁজে বিদেশে যেতে হয়েছে। তাদের সিংহভাগই নিচু ধরনের কাজ করে। পরবর্তী তথ্যটিও গুরুত্বপূর্ণ: ২০২০ সাল থেকে মহামারীর মধ্যে ৬০,০০০–এর বেশি ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দেশটি ছেড়ে চলে গেছে।

২০১৪ সাল থেকে পানির বিল প্রায় এক–তৃতীয়াংশ বেড়েছে, জ্বালানির বিল বেশ কয়েকবার বেড়েছে এবং বাসাবাড়ির গ্যাসের মূল্য কয়েক ডজন গুণ বেড়েছে। বহু লোকের এসবের মূল্য পরিশোধের মতো অর্থ নেই। তাদেরকে বেঁচে থাকার জন্য আক্ষরিক অর্থে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

ইউক্রেনের জাপোরোঝিয়ে প্রদেশে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত অ্যালুমিনিয়াম প্ল্যান্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেনের সোভিয়েত–নির্মিত বহুসংখ্যক শিল্পকারখানা অনুরূপভাবে পরিত্যক্ত হয়েছে; Source: Ukraine Travel Blog

[পুতিনের বক্তব্য অনুসারে, ২০১৪ সালের ইউরোমাইদান বিপ্লব/অভ্যুত্থানের ফলে ইউক্রেনের পরিস্থিতিতে কোনো উন্নতি ঘটেনি, বরং আরো অবনতি ঘটেছে। উক্ত বিপ্লব/অভ্যুত্থানের পর পূর্ব ইউক্রেনের দনেৎস্ক ও লুগানস্ক প্রদেশদ্বয় ইউক্রেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং এর ফলে ইউক্রেনে কার্যত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, যেটি ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলেছে। ইউরোমাইদান বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ ছিল যে, তদানীন্তন ইউক্রেনীয় সরকার ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যথেষ্ট ইচ্ছুক নয়। কিন্তু উক্ত সরকারের পতন ঘটার আট বছর পরেও ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি।

বস্তুত ইউরোমাইদানের ফলে ইউক্রেনের আর্থ–সামাজিক পরিস্থিতিতে বিশেষ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি, বরং ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি প্রভৃতি সমস্যাগুলোর কোনো কার্যকরী সমাধান অর্জিত হয়নি। ইউরোমাইদানের পূর্ববর্তী সময়ের মতোই ইউক্রেনীয় ধনকুবেররা ইউক্রেনের রাজনীতির প্রকৃত পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। ইউরোমাইদান–পরবর্তী ইউক্রেনের তিন রাষ্ট্রপতি ইউক্রেনকে এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছেন।

ওলেক্সান্দর তুর্চিনভের (২০১৪) অধীনে ইউক্রেনে একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং ইউক্রেনীয় জাতি তীব্রভাবে পরস্পরবিরোধী দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পেত্রো পোরোশেঙ্কোর (২০১৪–২০১৯) অধীনে ইউক্রেনের পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে ২০১৯ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ভলোদিমির জেলেনস্কি (২০১৯–বর্তমান) ইউক্রেনকে দুর্নীতিমুক্ত করার এবং পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘প্যান্ডোরা পেপার্স’ অনুসারে, জেলেনস্কি ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। অনুরূপভাবে, জেলেনস্কি পূর্ব ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের সমাধান করতে পারেননি, বরং তার অধীনে পূর্ব ইউক্রেনে ব্যাপক সামরিকায়ন ঘটেছে এবং ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন দনেৎস্ক ও লুগানস্কের ওপর পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করে]

কী ঘটেছে? এসব কেন হচ্ছে? উত্তর স্পষ্ট। তারা কেবল সোভিয়েত আমলই নয়, রুশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে প্রাপ্ত ঐতিহ্যও ব্যয় এবং আত্মসাৎ করে ফেলেছে। তারা হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে জনগণ নির্ভরযোগ্য উপার্জন করতে পারতো এবং কর আসতো, অংশত রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ফলে। যন্ত্র নির্মাণ, যন্ত্র প্রকৌশল, ইলেক্ট্রনিক্স, জাহাজ ও বিমান নির্মাণ খাতসহ বিভিন্ন খাত হয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নয়তো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। অথচ এমন এক সময় ছিল, যখন কেবল ইউক্রেন নয়, পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন এই কোম্পানিগুলোকে নিয়ে গর্ব করতো।

২০১২ সালে সুইডেনের স্টকহোমের একটি বিমানবন্দরে ইউক্রেনের বিখ্যাত বিমান নির্মাতা কোম্পানি ‘আন্তোনভ’ কর্তৃক নির্মিত ‘আন–২২৫ মৃয়া’ পরিবহন বিমান। ২০১৬ সালের পর থেকে আন্তোনভ নতুন কোনো বিমান নির্মাণ করেনি; Source: Larske/Wikimedia Commons

২০২১ সালে নিকোলায়েভের কৃষ্ণসাগরীয় জাহাজ নির্মাণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মহান একাতেরিনার সময়ে এটির প্রথম পোতাশ্রয় স্থাপিত হয়েছিল। বিখ্যাত উৎপাদক আন্তোনভ ২০১৬ সাল থেকে একটিও বাণিজ্যিক বিমান নির্মাণ করেনি, অন্যদিকে ক্ষেপনাস্ত্র ও মহাকাশ সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি নির্মাতা ইয়ুঝমাশ প্রায় দেউলিয়া হয়ে গেছে। ক্রেমেনচুগ ইস্পাত কারখানাও একই অবস্থায় রয়েছে। এই দুঃখজনক তালিকা চলছে তো চলছেই।

গ্যাস পরিবহন ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণরূপে সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মাণ করেছিল, এবং এখন এটির অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে, এটি ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

[সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে থাকা অবস্থায় ইউক্রেন ছিল সোভিয়েত রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শিল্পায়িত প্রজাতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপের অন্যতম একটি সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয় রাজনীতিবিদরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং ফলশ্রুতিতে ইউক্রেনের শিল্পখাতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বস্তুত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেনে বিশিল্পায়ন (de-industrialization) ঘটেছে এবং ইউক্রেন ইউরোপের দরিদ্রতম রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে]

এই পরিস্থিতি থেকে প্রশ্ন আসে, দারিদ্র‍্য, সুযোগের অভাব এবং হারানো শিল্পগত ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা – এটাই কি সেই পশ্চিমা সভ্যতামুখী সিদ্ধান্ত যেটির স্বর্গীয় চারণভূমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা বহু বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বোকা বানাচ্ছে?

এর ফলাফল দাঁড়িয়েছে বিধ্বস্ত ইউক্রেনীয় অর্থনীতি এবং দেশটির নাগরিকদের ওপর সরাসরি লুণ্ঠন, অন্যদিকে ইউক্রেন নিজে বিদেশি নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়েছে, যেটি কেবল পশ্চিমা রাজধানীগুলো থেকেই নয়, ইউক্রেনের মাটিতে উপস্থিত বিদেশি উপদেষ্টা, এনজিও ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের এক পরিপূর্ণ নেটওয়ার্কের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সকল গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও পদচ্যুতি এবং কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুরু করে পৌরসভা পর্যন্ত সকল স্তরের সকল ক্ষমতার শাখা, এর পাশাপাশি নাফতোগাজ, উক্রেনের্গো, ইউক্রেনীয় রেলওয়ে, উক্রোবরোনপ্রম, উক্রোশতা ও ইউক্রেনীয় সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষসহ রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি ও কর্পোরেশনগুলো, সবকিছুর ওপরেই তাদের সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

ইউক্রেনে কোনো স্বাধীন বিচার বিভাগ নেই। পশ্চিমা বিশ্বের দাবি অনুসারে কিয়েভ কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থাগুলোর, কাউন্সিল অফ জাস্টিস এবং হাই কোয়ালিফিকেশন্স কমিশন অফ জাজেসের সদস্যদের নির্বাচন করার মুখ্য অধিকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করেছে।

তদুপরি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জাতীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ সংস্থা, জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো, বিশেষায়িত দুর্নীতিবিরোধী প্রোসিকিউটরের কার্যালয় এবং উচ্চ দুর্নীতিবিরোধী আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করে। দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে উজ্জীবিত করার মহৎ অজুহাতে এগুলো করা হচ্ছে। ঠিক আছে, কিন্তু ফলাফল কোথায়? দুর্নীতি এমনভাবে বাড়ছে, যেমনটা আগে কখনো হয়নি।

২০২১ সালের একটি ব্যঙ্গচিত্রে ন্যাটোকে ইউক্রেনের ‘পরামর্শদাতা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে; Source: The Economist

ইউক্রেনীয় জনসাধারণ কি জানে যে এভাবে তাদের দেশ পরিচালিত হচ্ছে? তারা কি অনুধাবন করতে পারে যে তাদের দেশ কেবল একটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আশ্রিত রাষ্ট্র নয়, বরং একটি পুতুল সরকারের অধীন উপনিবেশে পরিণত হয়েছে? রাষ্ট্রকে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে। এর ফলে সরকার, যেটি নিজেকে ‘দেশপ্রেমিকদের শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে, আর জাতীয় স্বার্থে কাজ করছে না এবং একাগ্রভাবে ইউক্রেনকে তার সার্বভৌমত্ব হারানোর পথে ঠেলে দিচ্ছে।

[বস্তুত ১৯৯১ সালে ইউক্রেনের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দেশটির পশ্চিমামুখী নীতির কারণে দেশটির ওপর বিদেশি (মূলত মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপীয়) প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের ইউরোমাইদান বিপ্লব/অভ্যুত্থানের পর এই প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হয়েছে। বর্তমানে ইউক্রেনীয় আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার ব্যবস্থার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং ক্ষেত্রবিশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিস্তৃত প্রভাব রয়েছে। তদুপরি, ইউরোমাইদানের পর ইউক্রেনের সশস্ত্রবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, রুশদের দৃষ্টিকোণ থেকে ইউক্রেন কার্যত পশ্চিমা বিশ্বের একটি ‘বর্ধিতাংশে’ রূপান্তরিত হয়েছে। রুশ ও রুশঘেঁষা ইউক্রেনীয়দের দৃষ্টিকোণ থেকে, এগুলোর মধ্য দিয়ে কার্যত ইউক্রেন তার ‘সার্বভৌমত্ব’ হারিয়ে ফেলছে।

অবশ্য ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীরা এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নয়। তাদের দৃষ্টিতে, ইউক্রেনের স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে ‘রাশিয়া/রুশ প্রভাব থেকে ইউক্রেনের স্বাধীনতা’। তাদের মতে, ইউক্রেন যদি রুশ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে, সেটিই হবে ইউক্রেনের প্রকৃত স্বাধীনতা। ইউক্রেনের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে তারা নেতিবাচক হিসেবে নয়, বরং ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং, ইউক্রেনের ‘সার্বভৌমত্বে’র বিষয়ে রুশ ও রুশঘেঁষা ইউক্রেনীয়দের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিকোণের ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান]

This is the third part of a Bengali article which provides a translation of the speech of Russian President Vladimir Putin on 21 February 2022 and includes brief commentary.

Source of the featured image: Getty Images via The BBC

Related Articles