যখন তুরস্ক রুশ বোমারু বিমান ভূপাতিত করেছিল || পর্ব–৪

[৩য় পর্ব পড়ুন]

তুরস্ক রুশ বোমারু বিমান ভূপাতিত করার পর রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যে কেবল প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও প্রচ্ছন্ন সামরিক–মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়, এমনটা নয়। বরং রুশ–তুর্কি সঙ্কট সর্বব্যাপী রূপ ধারণ করে এবং এর প্রতিক্রিয়া সমগ্র অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

রুশ–তুর্কি রাজনৈতিক/কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

তুরস্ক রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর রাশিয়া ও তুরস্ক পরস্পরের বিরুদ্ধে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। তুর্কিরা রুশ বিমান ভূপাতিত করার পরের দিনই রুশ আইনসভার নিম্নকক্ষ ‘রাষ্ট্রীয় দুমা’র সদস্য এবং ‘আ জাস্ট রাশা/স্প্রাভেদলিভায়া রোসিয়া’ (রুশ: Справедливая Россия) দলের সভাপতি সের্গেই মিরোনভের নেতৃত্বে একদল দুমা সদস্য ‘আর্মেনীয় গণহত্যা’কে (Armenian Genocide) অস্বীকার করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য দুমায় প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ওসমানীয় রাষ্ট্রের উগ্র তুর্কি জাতীয়তাবাদী ও বৃহত্তর তুর্কি সম্প্রসারণবাদী ‘কমিটি অফ ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রোগ্রেস/ইত্তিহাদ ভে তেরাক্কি জেমিয়েতি’ (তুর্কি: İttihad ve Terakki Cemiyeti) দলীয় সরকারের নির্দেশে ওসমানীয় রাষ্ট্রে বসবাসকারী ৮-১৫ লক্ষ জাতিগত আর্মেনীয়কে খুন করা হয়, এবং ইতিহাসে এটি ‘আর্মেনীয় গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে।

তুরস্ক বরাবরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে ওসমানীয় রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বিষয়টিকে তারা খুবই স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করে। রুশ আইনসভা কার্যত ১৯৯৫ সালেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মিরোনভের উত্থাপিত প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল: কোনো রুশ নাগরিক আর্মেনীয় গণহত্যা অস্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া। সন্দেহ নেই যে, তুরস্ককে উত্যক্ত করার উদ্দেশ্যেই রুশ আইনসভায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল।

২০১৫ সালের এপ্রিলে আর্মেনীয় গণহত্যা শুরুর ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত স্মারক অনুষ্ঠানে আর্মেনীয় রাষ্ট্রপতি সের্ঝ সার্গসিয়ান, রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন, ফরাসি রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া ওলাদঁ এবং সাইপ্রিয়ট রাষ্ট্রপতি নিকোস আনাস্টাসিয়াডেস; Source: Aleksei Nikolsky/Russian Presidential Press Service/TASS

২৮ নভেম্বর দুমা সদস্য সের্গেই গাভ্রিলভের নেতৃত্বে আরেকদল দুমা সদস্য দুমায় প্রস্তাব উত্থাপন করেন যে, তুরস্কের উচিত ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ‘আয়া সোফিয়া’কে জাদুঘর থেকে অর্থোডক্স গির্জায় রূপান্তরিত করা। উল্লেখ্য, ৫৩৭ সালে তদানীন্তন বাইজান্টাইন/পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল) প্রতিষ্ঠিত ‘আয়া সোফিয়া’ গির্জাটি ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চের বৃহত্তম গির্জা। ১৪৫৩ সালে ওসমানীয় রাষ্ট্র কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় করে এবং আয়া সোফিয়াকে একটি মসজিদে রূপান্তরিত করে। ১৯৩৫ সালে তুর্কি সরকার একে একটি জাদুঘরে পরিণত করে এবং ২০২০ সালে এটি পুনরায় একটি মসজিদে পরিণত হয়।

বস্তুত গাভ্রিলভ যখন রুশ দুমায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন, সেসময় তুর্কি সমাজে আয়াসোফিয়াকে জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হবে কিনা, এই প্রসঙ্গে বিতর্ক চলছিল। এমন সময়ে রুশ দুমায় একে গির্জায় রূপান্তরিত করার প্রস্তাব উত্থাপনের পশ্চাতে রুশ আইনসভা সদস্যদের উদ্দেশ্য ছিল ইচ্ছাকৃতভাবে তুরস্ককে উস্কে দেয়া। উল্লেখ্য, শেষ পর্যন্ত রুশ দুমা আর্মেনীয় গণহত্যা অস্বীকার করাকে অপরাধে পরিণত করা বা আয়া সোফিয়াকে পুনরায় গির্জায় রূপান্তরিত করার দাবি– কোনো প্রস্তাবই অনুমোদন করেনি। কিন্তু এই প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের মধ্য দিয়ে রুশরা তুর্কিদের উত্যক্ত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে।

২৩ ডিসেম্বর তুরস্কের কুর্দিপন্থী ও বামপন্থী দল ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি/হালকলারিন দেমোক্রাতিক পার্তিসি’র (তুর্কি: Halkların Demokratik Partisi, ‘HDP’) সহ–সভাপতি সেলাহাত্তিন দেমিরতাশ রাশিয়া সফর করেন এবং রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় তিনি মন্তব্য করেন যে, তার দল শুরু থেকেই তুরস্ক কর্তৃক রুশ বিমান ভূপাতিত করার বিরোধিতা করে এসেছে এবং তারা কোনোমতেই রুশ–তুর্কি সম্পর্কের অবনতি দেখতে আগ্রহী নন। তিনি রাশিয়ায় ‘এইচডিপি’র একটি প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যালয় খোলারও আগ্রহ প্রকাশ করেন। দেমিরতাশের রাশিয়া সফর ও সেখানে তার প্রদত্ত বক্তব্য তুর্কি সরকারের জন্য উদ্বেগের সৃষ্টি করে, কারণ এইচপিডি তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল এবং তুর্কি আইনসভায় তাদের ৫৬টি আসন রয়েছে।

তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল ‘এইচডিপি’র সহ–সভাপতি সেলাহাত্তিন দেমিরতাশ তুরস্ক কর্তৃক রুশ বিমান ভূপাতিত করার নিন্দা জানিয়েছিলেন; Source: Maksim Shemetov/Reuters/Al-Monitor

বস্তুত স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে মস্কো বরাবরই তুরস্কের কুর্দিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। ১৯৮০–এর দশকে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’র প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তুরস্কভিত্তিক কুর্দি মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘পার্তিয়া কারকেরেন কুর্দিস্তান/পিকেকে’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মস্কো পিকেকে ও অন্যান্য কুর্দিদের প্রতি একচ্ছত্র সমর্থন প্রদানের নীতি থেকে সরে আসে, কিন্তু রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কুর্দিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। বস্তুত তুরস্ককে দ্বিখণ্ডিত করা বা স্বাধীন কুর্দিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি বর্তমানে মস্কোর উদ্দেশ্য নয়। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রয়োজনমাফিক তুর্কি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য তুরস্কের কুর্দিদেরকে ব্যবহার করা। তুরস্ক রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর রুশরা এই নীতিই অবলম্বন করে এবং তুরস্কের (ও সিরিয়ার) কুর্দিদেরকে ব্যবহার করে আঙ্কারার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে।

এইচডিপির সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রদর্শনের পাশাপাশি মস্কো সিরীয় কুর্দিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের মাত্রা বর্ধিত করে। এর অংশ হিসেবে তারা সিরিয়াভিত্তিক কুর্দি দল ‘পার্তিয়া ইয়েকিতিয়া দেমোক্রাৎ/পিওয়াইডি’কে অস্ত্র সরবরাহ করে এবং তাদেরকে যুদ্ধের সময় ‘এয়ার কাভার’ প্রদান করে। ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ‘পিওয়াইডি’ মস্কোয় একটি প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যালয় খোলে এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ কুর্দিশ পাবলিক অ্যাসোসিয়েশন্স’–এর সভাপতি মেরাব শামোয়েভ এটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যা প্রদান করেন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদেরকে এই ঘটনা থেকে দূরে রাখে, কিন্তু এটি স্পষ্ট ছিল যে, রুশ সরকারের অনুমতি ছাড়া পিওয়াইডি কখনো মস্কোয় তাদের কার্যালয় খুলতে পার‍ত না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিরীয় যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তুরস্ক সিরীয় সরকারকে তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু সিরীয় যুদ্ধের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ সিরীয় কুর্দিরা (পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি) সিরিয়ায় তুরস্কের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। তুরস্ক পিওয়াইডি/ওয়াইপিজিকে পিকেকের অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে এবং উভয় সংগঠনকেই ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠন’ হিসেবে বিবেচনা করে। এজন্যই রুশ সরকার পিওয়াইডিকে মস্কোয় কার্যালয় খোলার প্রচ্ছন্ন অনুমতি প্রদান করে এবং এর মধ্য দিয়ে কূটনৈতিকভাবে তুরস্কের বিরুদ্ধে সিরীয় কুর্দিদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

‘পিওয়াইডি’ সদস্যরা মস্কোয় তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যালয় উদ্বোধন করছেন; Source: AFP/Middle East Eye

রুশদের এসব পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুরস্ক ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে শুরু করে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে সংঘটিত ‘ইউরোমাইদান বিপ্লব’/অভ্যুত্থানের পর ইউক্রেনে একটি তীব্র রুশবিরোধী ও পশ্চিমাপন্থী সরকার ক্ষমতাসীন হয় এবং রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখল ও পূর্ব ইউক্রেনে অবস্থিত দনেৎস্ক ও লুহানস্ক প্রজাতন্ত্রদ্বয়ের প্রতি রুশ সমর্থনকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার চরম শত্রুতে পরিণত হয়। তুরস্ক এই সুযোগকে কাজে লাগায় এবং ইউক্রেনে তুর্কি প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করে। ‘সু–২৪এম’ সঙ্কট সৃষ্টির পর তুর্কিদের প্রচেষ্টা আরো বিস্তৃত হয়। ২০১৬ সালের ৮ মার্চ তুর্কি ও ইউক্রেনীয় নৌবাহিনী প্রথম বারের মতো মার্মারা সাগরে যৌথ নৌ মহড়ায় অংশগ্রহণ করে এবং ৯ মার্চ তুর্কি রাষ্ট্রপতি রেজেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান মন্তব্য করেন যে, তুরস্ক রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলকে স্বীকার করে না। অবশ্য ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখলের পরপরই তুরস্ক এই অবস্থান ঘোষণা করেছিল এবং ‘সু–২৪এম’ সঙ্কটের অবসান ঘটার পরেও এই বিষয়ে তুরস্কের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।

রুশদের বিরুদ্ধে তুর্কি ‘সাইবার যুদ্ধ’

‘সু–২৪এম’ সঙ্কট শুরুর পরপরই তুর্কিরা রুশদের বিরুদ্ধে ‘সাইবার যুদ্ধ’ (cyber warfare) শুরু করে দেয়। ২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর ‘তুর্ক হ্যাক টিম’ নামক তুর্কি হ্যাকারদের একটি গ্রুপ রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইট হ্যাক করে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ ওয়েবসাইটটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ‘দ্য বোর্তচিনে সাইবার টিম’ নামক আজারবাইজানি হ্যাকারদের একটি গ্রুপ তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রুশ ওয়েবসাইটগুলোর ওপর সাইবার আক্রমণ পরিচালনা করতে শুরু করে।

৩ জানুয়ারি তারা তদানীন্তন রুশ যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিষয়ক মন্ত্রী নিকোলাই নিকিফোরভের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। ৪ জানুয়ারি তারা মস্কোর ‘লোকোমোতিভ’ ফুটবল ক্লাবের ওয়েবসাইট হ্যাক করে। ১৭ জানুয়ারি তারা ইসরায়েলে অবস্থিত রুশ দূতাবাসের ওয়েবসাইট হ্যাক করে। অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই রুশরা কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সক্ষম হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, সু–২৪এম সঙ্কটের আগে এবং পরে রুশ হ্যাকাররা তুরস্কের বিভিন্ন ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে সাইবার আক্রমণ চালিয়েছে, কিন্তু সু–২৪এম সঙ্কট চলাকালে তারা তুর্কি ওয়েবসাইটগুলোর বিরুদ্ধে সেরকম কোনো আক্রমণ চালায়নি। এসময় তাদের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী ছিল, সেটি স্পষ্ট নয়।

রুশ–তুর্কি ‘সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব’

‘সু–২৪এম’ সঙ্কট আরম্ভ হওয়ার পর সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রুশ–তুর্কি দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে। যেমন: এই সঙ্কট শুরুর পর রাশিয়ার ‘রুদমিনো অল–রাশান স্টেট লাইব্রেরি ফর ফরেন লিটারেচার’ তুর্কি কর্তৃপক্ষকে জানায় যে, তারা রাশিয়ায় নির্মিতব্য ‘রুশ–তুর্কি বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র’ নির্মাণে অর্থায়ন করতে রাজি নয়। রুশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রুশ ফেডারেশনের ৬টি প্রজাতন্ত্র (তাতারস্তান, বাশকোর্তোস্তান, খাকাশিয়া, ইয়াকুতিয়া, আলতাই ও তিভা) তুরস্ককেন্দ্রিক বৃহত্তর তুর্কি জাতিসমূহের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অফ টার্কিক কালচারে’র সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং ‘তুর্কভিশন’ সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

মানচিত্রে ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অফ টার্কিক কালচার’ভুক্ত সদস্য ও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রসমূহ; Source: Jelican9/Wikimedia Commons

ক্রীড়াঙ্গনেও এই সঙ্কটের প্রভাব পড়ে। রুশ ফুটবল ক্লাবগুলোকে তুর্কি ফুটবলারদের নিয়োগ করতে নিষেধ করা হয়। ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ তুরস্কের ইস্তাম্বুলে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি নারীদের ভলিবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে রাশিয়ার ‘দিনামো ক্রাস্নোদার’ ও তুরস্কের ‘গালাতাসারায়’ ক্লাব অংশ নেয়। এসময় তুর্কি দর্শকরা রুশ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে অপমানসূচক মন্তব্য করে ও তাদের ওপর আবর্জনা নিক্ষেপ করে।

রুশ–তুর্কি প্রচারণা যুদ্ধ

তুর্কিরা ‘সু–২৪এম’ বিমানটি ভূপাতিত করার পর রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে তীব্র প্রচারণা যুদ্ধ শুরু হয়। রুশ রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলো বিস্তৃত তুর্কিবিরোধী প্রচারণা শুরু করে, এবং অনুরূপভাবে তুর্কি রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমগুলো ব্যাপক হারে রুশবিরোধী প্রচারণা শুরু করে। কিন্তু তুর্কিদের রুশবিরোধী প্রচারণা যুদ্ধ ছিল তুলনামূলকভাবে অসংগঠিত, এবং তাদের রুশবিরোধী প্রচারণা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি। অন্যদিকে, রুশদের তুর্কিবিরোধী প্রচারণা যুদ্ধ ছিল সুসংগঠিত, এবং তাদের তুর্কিবিরোধী প্রচারণা একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেই বিষয়টি হচ্ছে: আইএসের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘আইএস’ বা ‘ইসলামিক স্টেট’ ১৯৯৯ সালে ‘জামায়াত আল–তাওহিদ ওয়াল–জিহাদ’ নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ২০০৪ সালে গ্রুপটি আন্তর্জাতিক মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘আল–কায়েদা’র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং ২০০৬ সালে ‘দাওলাত আল–ইরাক আল–ইসলামিয়াহ’ নাম ধারণ করে। ২০১৩ সালে গ্রুপটি নিজেদের নাম পরিবর্তন করে ‘আদ–দাওলাহ আল–ইসলামিয়াহ ফিল–ইরাক ওয়াশ–শাম’ নামকরণ করে এবং ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আল–কায়েদা গ্রুপটির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করে। ২০১৪ সালের জুনে গ্রুপটি সর্বশেষ নিজেদেরকে ‘আদ–দাওলাহ আল–ইসলামিয়াহ/ইসলামিক স্টেট’ নামকরণ করে এবং বিশ্বব্যাপী খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কিন্তু মিলিট্যান্ট গ্রুপটি তাদের মাত্রাতিরিক্ত নিষ্ঠুরতার কারণে বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছে এবং এমনকি আল–কায়েদাও তাদের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্র যদি আইএসের ‘সহায়তাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তুর্কিরা রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর তুরস্কে একটি রুশবিরোধী বিক্ষোভের চিত্র; Source: Al Jazeera

‘সু–২৪এম’ সঙ্কট শুরুর পর রুশ প্রচারমাধ্যম তুরস্কের বিরুদ্ধে ঠিক এই কৌশলটিই কাজে লাগায় এবং তুরস্ককে ‘আইএসের সহযোগী’ হিসেবে উপস্থাপন করে। বস্তুত এই অভিযোগ যে কেবল রুশরা উত্থাপন করছিল, এমনটা নয়। পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমে আগে থেকেই এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে আসছিল এবং রুশরা সেটির ভিত্তিতে তাদের প্রচারণা অভিযান শুরু করে। উল্লেখ্য, সেসময় আইএসের অর্থায়নের বড় একটি অংশ আসতো ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে উত্তোলনকৃত তেল রপ্তানির মাধ্যমে। এই তেলের বড় একটি অংশ তারা তুর্কি কোম্পানিগুলোর কাছে বা তুর্কি ভূখণ্ডের মাধ্যমে রপ্তানি করত। বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার মিলিট্যান্ট আইএসে যোগদানের জন্য সিরিয়ায় এসেছিল এবং এদের বড় একটি অংশ সিরিয়ায় প্রবেশ করেছিল তুরস্কের মধ্য দিয়ে। তদুপরি, তুর্কি–সমর্থিত সিরীয় মিলিট্যান্টদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তুরস্ক কর্তৃক সরবরাহকৃত অস্ত্রশস্ত্র আইএসে যোগদান করে। এজন্য তুরস্ক পরোক্ষভাবে আইএসকে সহায়তা করছে, এরকম অভিযোগ উত্থাপিত হতে থাকে।

বস্তুত ২০১৫ সাল নাগাদ সিরিয়ায় তুরস্কের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সিরীয় কুর্দি মিলিট্যান্টরা এবং দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সিরীয় সরকার। সিরিয়ায় তুরস্কের শত্রুদের তালিকায় আইএস ছিল তৃতীয় অবস্থানে। আইএস সিরীয় সরকার ও সিরীয় কুর্দিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং এজন্য পরোক্ষভাবে সিরিয়ায় আইএসের কার্যক্রম তুরস্কের জন্য লাভজনক ছিল। তদুপরি, আইএসের কাছ থেকে সস্তায় তেল ক্রয় করা তুর্কি রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের জন্য লাভজনক ছিল। এজন্য একদিকে তুরস্ক আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং আইএস তুর্কি ভূখণ্ডে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে, অন্যদিকে, তুর্কি–আইএস পরোক্ষ সহযোগিতামূলক সম্পর্কও বজায় থাকে। সুতরাং এদিক থেকে হিসেব করলে, রুশদের প্রচারণার ‘ভিত্তি’ ছিল, এবং তুর্কি–আইএস সম্পর্কের ব্যাপারটিকে তারা নিপুণভাবে তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রচারণা যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর একটি সংবাদ সম্মেলনে ৩০০ জনের বেশি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে রুশ উপ–প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি আন্তোনভ আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্ককে আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দায়ে অভিযুক্ত করেন। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত চিত্রের ভিত্তিতে তিনি প্রমাণ করেন যে, সিরিয়ার আইএস–নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে তুরস্কের বিভিন্ন শহরে তেলবাহী ট্রাকবহর যাতায়াত করছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, তুর্কি রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের পরিবারের সদস্যরা, বিশেষত এরদোয়ানের ছেলে বিলাল এরদোয়ান ও জামাতা বেরাত আলবায়রাক (তদানীন্তন তুর্কি তেলমন্ত্রী) আইএসের অবৈধ তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। উল্লেখ্য, একই সময়ে তুর্কি আইনসভার ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি/জুমহুরিয়েত হালক পার্তিসি’ (তুর্কি: Cumhuriyet Halk Partisi, ‘CHP’) দলীয় সদস্য এরেন এরদেম আলবায়রাকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং এজন্য তাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহে’র দায়ে কারারুদ্ধ করা হয়।

‘সু–২৪এম’ সঙ্কট চলাকালে রুশ–তুর্কি প্রচারণা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তুর্কি সরকার ‘স্পুৎনিক তুর্কিয়ে’র তুরস্ক শাখার প্রধান তুরাল কেরিমভের তুরস্কে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে; Source: Sputnik International

স্বাভাবিকভাবেই রুশদের অভিযোগ তুর্কি সরকারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তদানীন্তন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোলু রুশ সরকারকে ‘সোভিয়েত ধাঁচের মিথ্যা প্রচারণা’ চালানোর দায়ে অভিযুক্ত করেন। তুর্কি রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান রাশিয়াকে আইএসের তেল বাণিজ্যে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং দাবি করেন যে, তার কাছে রুশ–সিরীয় দ্বৈত নাগরিক জর্জ হাসাওয়ি ও রুশ ফেডারেশনের অন্তর্গত কালমিকিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কিরসান ইলুমঝিনভের আইএসের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ‘উইকিলিক্স’ আলবায়রাকের হাজার হাজার ব্যক্তিগত ই–মেইল ফাঁস করে দেয়, এবং এগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আলবায়রাক প্রকৃতপক্ষেই তুর্কি–আইএস তেল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর ফলে রুশ সরকারের দাবি শক্ত ভিত্তি লাভ করে। কিন্তু তুর্কি সরকার আইএসের তেল বাণিজ্যে রুশদের জড়িত থাকার যে প্রমাণ তাদের কাছে আছে বলে দাবি করেছিল, পরবর্তীতে তারা এরকম কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। এর ফলে সামগ্রিকভাবে রুশ–তুর্কি প্রচারণা যুদ্ধে রুশদের প্রচারণা বেশি সাফল্য অর্জন করে এবং তুরস্ক ও পশ্চিমা বিশ্বের (বিশেষত ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর) মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের মাত্রা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

এসবের প্রতিক্রিয়ায় ‘সু–২৪এম’ সঙ্কট শুরুর পর তুর্কি সরকার রুশ প্রচারমাধ্যমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। রুশ বিমানটি ভূপাতিত করার পরপরই তুর্কি সরকার সিরীয় সীমান্তবর্তী হাতায় প্রদেশ থেকে একদল রুশ সাংবাদিককে বহিষ্কার করে। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তুর্কি সরকার রুশ সাংবাদিকদের ভিসা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানায়। ২০১৬ সালের এপ্রিলে তুর্কি সরকার তুর্কি ভূখণ্ডে রুশ রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা ‘স্পুৎনিকে’র তুর্কি শাখা ‘স্পুৎনিক তুর্কিয়ে’র ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয় এবং স্পুৎনিক তুর্কিয়ের সিনিয়র সাংবাদিক ও তুরস্ক শাখার প্রধান তুরাল কেরিমভের তুরস্কে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তুর্কি সরকারের এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল রুশ প্রচারমাধ্যমের তুর্কিবিরোধী প্রচারণার শোধ নেয়া। কিন্তু রুশ প্রচারমাধ্যম তুর্কি সরকারের এই পদক্ষেপগুলোকেও নিজেদের তুর্কিবিরোধী প্রচারণা যুদ্ধে ব্যবহার করে, এবং তুরস্কে প্রচারমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা নেই, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এরকম একটি চিত্র উপস্থাপন করে। যেমন: তুর্কি সরকার কর্তৃক কেরিমভের তুরস্কে প্রবেশে ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস’ ও ‘ইউরোপিয়ান ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস’ তুর্কি সরকারের এই পদক্ষেপের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করে।

Related Articles